আলাপের গোড়াইতে তিনি দুঃখ করিলেন : তাঁর সাথে আলাপ না করিয়া কাগযে বিবৃতি দিলাম কেন? এটা কি বন্ধুর কাজ হইয়াছে? জবাবে আমি বলিলাম : আমাদেরে ঘুণাক্ষরে না জানাইয়া মুসলিম লীগের সংগে তিনি আপোস করিলেন কেন? এটা কি বন্ধুর কাজ হইয়াছে? ঝগড়ার সুরে আরম্ভ করিলাম বটে, কিন্তু পর মুহূর্তেই উভয়েই উচ্চস্বরে হাসিয়া উঠিলাম। শেয়ানে-শেয়ানে কোলাকুলি। কারণ বিলম্ব এড়াইবার জন্যই উভয়ে পরস্পরকে জানাইয়া যার তার কাজ করিয়াছিলাম। আচ্ছা বেশ। এখন কি করা যায়?
সূভাষবাবু অন্তরের দরদ দিয়া যা বলিলেন, তার মর্ম এই : হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছাড়া ভারতের মুক্তি নাই। মুসলিম লীগ মুসলিম জনগণের মন জয় করিয়াছে। জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের দ্বারা কোনও আশা নাই। ফলে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে একটা চীনা দেওয়া উঠিয়া পড়িয়াছে। সে দেওয়ালের জানালা নাই। একটা সুরাখও নাই যার মধ্যে দিয়া মুসলমানদের সাথে কথা বলা যায়। এখানে সুভাষ বাবু আবেগপূর্ণ। ভাষায় বলিলেন : ‘আমি মুসলমানদের সাথে কথা বলতে চাই; তাদের সাথে মিশতে চাই; তাদের একজন হতে চাই। বলুন মনসুর সাব, মুসলিম লীগ ছাড়া আর কার মারফত এটা করতে পারি? আর কোনও রাস্তা আছে কি?’
আমি তাঁর সাথে একমত হইলাম। সত্যই আর কোনও রাস্তা নাই। বলিলাম : ‘কিন্তু আপনে যে সুরাখ বার করছেন ওটা বড়ই ছোট। বড় সুরাখ করেন। জানালা, এমনকি দরজা, বার করেন। সিদ্দিকী ইস্পাহানিরে না ধৈরা স্বয়ং জিন্না সাহেবরে ধরেন। মুসলিম লীগই মুসলমানদের প্রতিনিধি-প্রতিষ্ঠান এটা মানলে জিন্ন সাহেবের সাথে কথা বলাই আপনের উচিৎ।‘
সুভাষ বাবু পরম আগ্রহে টেবিলের উপর দিয়া গলা বাড়াইয়া বলিলেন : ‘আমি কিছুদিন থেকে মনে-মনেই তাই ভাবছিলাম। কিন্তু সেদিন লাহোর ঐ যে ধর্মীয় রাষ্ট্রের কি একটা প্রস্তাব পাস করিয়ে ফেলেছেন তিনি। এরপর নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে আপোসের আশা আমি প্রায় ত্যাগ করেছি।‘
২. লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা
আমি প্রতিবাদ করিলাম। বলিলাম : ‘জিন্না সায়েবের সাথে দেখা না করার আপনের একশ’ একটা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু লাহোর প্রস্তাব তার একটা, একথা বলবেন না। লাহোর প্রস্তাব আপনে পৈড়া দেখছেন?’
সূতাষ বাবু স্বীকার করিলেন তিনি পড়েন নাই, শুধু হেডিং ও রাইটআপ দেখিয়াছেন। পড়িবার কি আছে? পাকিস্তান চাহিয়াছে। পাকিস্তান মানেই থিওক্রাসি। আমি বলিলাম : তাঁর ধারণা ভুল। পাকিস্তান শব্দটাও প্রস্তাবের কোথাও নাই। তিনি বিশ্বাস করিতে চাহিলেন না। আমি যথাসম্ভব প্রস্তাবের ভাষা ‘কোট’ করিয়া লাহোর প্রস্তাবের এইরূপ ব্যাখ্যা দিলাম। প্রথমতঃ ভারতের বর্তমান এগারটি প্রদেশকে রেসিডুয়ারি পাওয়ারসহ পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হইবে। দ্বিতীয়তঃ মাত্র তিন-চারটি কেন্দ্রীয় বিষয় দিয়া একটি নিখিল ভারতীয় ফেডারেশন কায়েম করিতে হইবে। তৃতীয়তঃ এগারটির মধ্যে যে পাঁচটি মুসলিম প্রধান প্রদেশ আছে, তাদের মেজরিটি অর্থাৎ তিনটি প্রদেশ যদি দাবি করে তবে মুসলিম প্রধান পাঁচটি প্রদেশকে নিখিল ভারতীয় ফেডারেশন হইতে আলাদা হইয়া স্বতন্ত্র ফেডারেশন করিবার অধিকার দিতে হইবে।
আমার এই ব্যাখ্যা তিনি মানিলেন বলিয়া মনে হইল না। তিনি লাহোর প্রস্তাবের ফুল টেক্সট দেখিতে চাহিলেন। আমি তা দেখাইতে রাযী হইলাম। সোভিয়েট ইউনিয়নের কনস্টিটিউশনের এমন একটা বিধান আছে বলিয়া তিনি এক কপি রুশ শাসনতন্ত্র যোগাড় করিবার দায়িত্ব নিলেন। আলোচনা পরের দিনের জন্য মুলতুবি হইল। পরের দিন তিনি আমাকে তাঁর ফরওয়ার্ড ব্লক অফিসে নিয়া গেলেন। বৌবাজারের ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন হলের ত্রিতলে তিনি একটি সুষ্ঠু পরিচ্ছন্ন অফিস ইতিমধ্যেই খুলিয়া ফেলিয়াছিলেন। নিজে তিনি রীতিমত নিয়মিতভাবে এই অফিসে হাযিরা দিতেন। তাঁর সুসজ্জিত রুমে প্রবেশ করিয়া তিনি কয়েকখানি বই আনাইলেন। দেখিয়া পুলকিত হইলাম যে শুধু রুশ শাসনতন্ত্র নয়, সুইয়ারল্যান্ড, ইউ. এস, এ, কানডা ইত্যাদি কয়েকটি ফেডারেশনের কনস্টিটিউশনও যোগাড় করিয়াছেন।
রাজনীতি পঞ্চাশবর আমি লাহোর প্রস্তাবের খবরের কাগবে প্রকাশিত ফুলটেক্সট লইয়া গিয়াছিলাম। সেটা উচ্চস্বরে পড়িয়া-পড়িয়া আমার আগের দিনের ব্যাখ্যার সাথে মিল ফেলাইলাম। তিনি সব শুনিয়া বলিলেন : আপনার ব্যাখ্যা যদি ঠিক হয়, তবে তার সবটুকু আমি মেনে নিলাম। এমন কি আমি আরও বেশি যেতেও রাযী। যদি পাঁচটা মুসলিম প্রদেশের মেজরিটি আলাদা ইউনিয়ন করতে চায় তবে তাতে আমি ত রাযী আছিই এমনকি একটা প্রদেশও যদি সিসিড করতে চায়, আমি তাতেও রাযী।
এই কথা বলিয়া রুশ শাসনতন্ত্রের ঐ ধারাটা আমার সামনে মেলিয়া ধরিলেন যাতে প্রত্যেক ইউনিয়ন রিপাবলিককে সিসিড করিবার অধিকার দেওয়া হইয়াছে।
৩. জিন্না-সুভাষ মোলাকাত
আমরা উভয়ে একমত হওয়ায় স্থির হইল যে সুভাষ বাবু জিন্ন সাহেব দেখা চাহিয়া শীঘ্রই তাঁর নিকট পত্র লিখিলেন। বিপুল আশা-উৎসাহের মধ্যে আমি সুভাষ বাবুর নিকট হইতে বিদায় হইলাম। ভারতীয় রাজনৈতিক সংকটের অবসান ও হিন্দু মুসলিম ঐক্যের একটা গোলাবী স্বপের মধ্যে বিচরণ করিতে-করিতে পরবর্তী কয়েকটা দিন কাটাইলাম। মাঝে মাঝে সুভাষ বাবুকে টেলিফোন করিতে লাগিলাম : ‘জিয়া সাহেবের নিকট চিঠি লেখছেন? সপ্তাহ খানেক বা তারও বেশি একই জবাব পাইলাম : লিখিনি আজো, তবে শীগগিরই লিখব।
