১০. চিন্তার নূতন দিগন্ত
কংগ্রেস-লীগ আপোসের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম সমস্যার সমাধান যতই পিছাইয়া যাইতে লাগিল আমি ততই মুসলিম লীগের দিকে হেলিয়া পড়িতে লাগিলাম। আমার কংগ্রেসী নেতারা যতই ‘হিন্দু’ হইতে লাগিলেন, আমি ততই ‘মুসলিম’ হইতে লাগিলাম। আমার এই ‘মুসলিম’ত্বে অবশ্য ধর্মীয় গোড়ামি ছিল না; পর-ধর্ম বিদ্বেষেও ছিল না। ছিল শুধু তীব্র স্বকীয়তা ও আত্মমর্যাদাবোধ। স্বান্ত-চেতনা। হিন্দু ও মুসলমানের মতপার্থক্যটা এই সময় আমার কাছে বুনিয়াদী মানস পার্থক্য বলিয়া প্রতীয়মান হইল। অবস্থা এমন হইল যে, একদিন এক বন্ধু আমার ধর্ম-মত শুনিয়া বলিলেন : তুমি তা হৈলে নাস্তিক।
জবাবে আমি বলিলাম : নাস্তিক হৈলেও আমি মুসলমান নাস্তিক।
আরেকবার আমার আরেক বন্ধু আমার রাজ-নীতিক-অর্থ-নীতিক মত শুনিয়া বলিয়াছিলেন : তুমি ত কমিউনিস্ট।
জবাবে আমি বলিয়াছিলাম : তা কৈতে পার। তবে আমি মুসলমান কমিউনিস্ট।
এই ‘হিন্দু-মুসলিম কমিউনিযম’ সম্বন্ধে একটা মজার গল্প মনে পড়িতেছে। একবার বন্ধুবর কমরেড বংকিম মুখার্জী আফসোস করিয়া আমাকে বলিয়াছিলেন : ‘অক্টার্লনি মনুমেন্টের নিচে শ্রমিক জনসভায় চার ঘন্টা ধর্ম-বিরোধী বক্তৃতা করি। করতালিও পাই। কিন্তু সভাশেষে মুসলিম শ্রমিকরা টিপু সুলতানের মসজিদে এবং হিন্দু শ্রমিকরা কালী মন্দিরে ঢুকে পড়ে। এর কি করি বলুন ত?’
আমি বলিলাম : এটাই আসল সত্য। আমার মনে হয় চল্লিশ কোটি ভারতবাসীর সকলে এবং প্রত্যেকে যেদিন কমিউনিস্ট হৈয়া যাবে সেদিনও তারা হিন্দু কমিউনিস্ট ও মুসলিম কমিউনিস্ট এই দুই দলে বিভক্ত থাকবে।
কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি সম্বন্ধে এমন ধারণা লইয়া আমরা বেশিদিন রাজনৈতিক অস্পষ্ট পরিবেশের মধ্যে থাকিতে পারিলাম না। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজের অজ্ঞাতসারে মুসলিম লীগের মতবাদে দীক্ষিত হইয়া যাইতে লাগিলাম। হক সাহেবের মতবাদ এ বিষয়ে আমাকে অনেকখানি প্রভাবিত করিল। অথচ কিছুদিন আগেও আমি মনে করিতাম হক সাহেবের নিজস্ব কোন রাজনৈতিক মতবাদ নাই। বাংলার মুসলিম সমাজের যাতে ভাল হয়, সেটাই তার মতবাদ, চাই সেটা যা-কিছুই হউক। আমাকেও যেন ধীরে ধীরে এই রোগে পাইয়া বসিল। তাই বন্ধুরা যখন আমাকে বিদ্রূপ করিয়া ‘মিঃ এটাও সত্য এটাও সত্য’ বলিতেন, তখন অন্তর দিয়া দুঃখিত হইতাম না। জবাবে শুধু হাসিয়া বলিতাম : ফ্যানাটিক বা ডগমেটিক না হৈয়া র্যাশনালিস্ট হওয়ার ওটাই শাস্তি।
১৩. পাকিস্তান আন্দোলন
পাকিস্তান আন্দোলন
তেরই অধ্যায়
১. সুভাষ বাবুর ঐক্যচেষ্টা
১৯৪০ সাল। এপ্রিল মাস। এক বিস্ময়কর ঘটনা। সাবেক কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সুভাষ বাবু কলিকাতা কংগ্রেস ও কলিকাতা মুসলিম লীগের মধ্যে এক চুক্তি ঘটান। সেই চুক্তির ভিত্তিতে তাঁরা কলিকাতা কর্পোরেশনের সাধারণ নির্বাচন করেন। প্রায় সবগুলি আসনই তাঁরা দখল করেন। কিছুদিন আগে হক মন্ত্রিসভা কলিকাতা মিউনিসপ্যাল আইন সংশোধন করিয়া কর্পোরেশনের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করিয়াছিলেন। মোট ৯৩টি নির্বাচিত সীটের মধ্যে ২২টি মুসলমানের জন্য রিযার্ভ করা হইয়াছিল। মহাত্মাজীর সাথে বিরোধ করিয়া কংগ্রেস ত্যাগ করাতেও সুভাষ বাবুর জনপ্রিয় মোটেই কমেনাই,বরঞ্চ বাড়িয়াছে। বস্তুতঃ এই সময়ে সুভাষ বাবু বাংলার তরুণদের এক রকম চোখের পুতুলি। আর ওদিকে কলিকাতা মুসলিম লীগও মুসলিম ভোটারদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এই দুই পক্ষের মৈত্রী ভোটারদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ সৃষ্টি করিল। নির্বাচনে জয়জয়কার। মুসলিম লীগ নেতা আবদুর রহমান সিদ্দিকী মেয়র হইলেন। স্বয়ং সুভাষ বাবু তাঁর নাম প্রস্তাব করিলেন। মেয়র ছাড়া পাঁচজন অভায়মনের মধ্যে দুইজন হন মুসলিম লীগের। এ ছাড়া শর্ত হইল যে, পর্যায়ক্রমে প্রতি তিন বছরে মুসলিম মেয়র হইবেন। মুসলিম লীগের জন্য এটা সুস্পষ্ট বিজয়। কংগ্রেস নেতাদের পক্ষে মুসলিম লীগকে মুসলমানদের প্রতিনিধি-প্রতিষ্ঠান রূপে মানিয়া নেওয়ার এটা প্রথম পদক্ষেপ। অপরদিকে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের এটা পরম পরাজয়। কংগ্রেস সাম্প্রদায়িকতার সাথে আপোস করিলে জাতীয়তার আশা থাকিল কই? কাজেই আমরা জাতীয়তাবাদী মুসলিম লীগ-বিরোধী মুসলমানরা সুষকুর উপর খুব চটিলাম। ডাঃ আর. আহমদ, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আমি সুষ বাবুর এই কার্যের তীব্র নিন্দা করিলাম। খবরের কাগযে এক যুক্ত বিবৃতি দিলাম। সুষ বাবু এ বিষয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে আমাদেরে চায়ের দাওয়াত দিলেন। সূতাবাবুর বাড়িতে চায়ের দাওয়াত রাখা আমাদের জন্য নূতন নয়। অধ্যাপক কবির ‘দৈনিক কৃষকে’র ম্যানেজিং ডিরেকটর, ডাঃ আর. আহমদ ডিরেক্টর ও আমি তার এডিটর। সুষ বাবু কৃষক’র একজন পৃষ্ঠপোষক। কংগ্রেসের মেম্বর না হইয়াও আমরা তিনজনই কংগ্রেসী রাজনীতিতে সুভাষ বাবুর সমর্থক। এ অবস্থায় উক্ত বিবৃতির আলোচনার জন্য আমাদেরে চা খাইতে ডাকিয়া পাঠান সুভাষ বাবুর পক্ষে নূতন কিছু ছিল না। অন্যায় ছিল না। তবু আমার বন্ধুদ্বয় সুভাষবাবুর দাওয়াত রাখিলেন না। এতই গোস্বা হইয়াছিলেন তাঁরা কাজেই আমাকে একাই যাইতে হইল। আমি যথসময়ে সুভাষ বাবুর এলগিন রোডস্থ বাসভবনে গেলাম। বন্ধুদ্বয়ের না আসার বানাওট কৈফিয়ৎ দিলাম। সুভাষ বাবু মুচকি হাসিলেন। তিনি আসল কারণ বুঝিলেন। আমরা দুইজনে আলাপে বসিলাম। সুভাষ বাবু পাক্কা মেহমানদার। আমরা কয়েক তরি মিঠাই ও বহু কাপ চা খাইলাম। আমার জন্য এক টিন সিগারেট আনাইলেন। নিজে তিনি সিগারেট খাইতেন না।
