১৯৪০ সালের মার্চ মাস ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটা চিরস্মরণীয় ঐতিহাসিক, গুরত্বপূর্ণ মাস। এই মাসে মিঃ জিন্নার সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ গৃহীত হয়। আর বিহারের অন্তর্গত রামগড় নামক স্থানে মাত্র আধ মাইলের ব্যবধানে মওলানা আবুল কালাম আযাদের সভাপতিত্বে কংগ্রেসের অধিবেশন এবং সুভাষ বাবুর সভাপতিত্বে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী কংগ্রেসের (ফরওয়ার্ড ব্লক) সম্মিলনী হয়। কংগ্রেস প্রস্তাবে বলা হয়, চলতি যুদ্ধ বৃটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থে পরিচালিত হইতেছে। ভারতের স্বাধীনতা স্বীকার না করা পর্যন্ত কংগ্রেস এ যুদ্ধে সহযোগিতা করিতে পারে না। সুভাষ বাবুর সম্মিলনীতে সোজাসুজি সরকারের যুদ্ধ-প্রচেষ্টার বিরোধিতা করিবার সিদ্ধান্ত করা হয়।
১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ হক সাহেবের প্রস্তাবে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় মুসলমানদের রাজনৈতিক চিন্তাধারাও নূতন দিগন্তের দিকে আকৃষ্ট হয়। এটাই মুসলিম লীগের সর্বপ্রথম রাজনৈতিক পঠিটিভ পদক্ষেপ। লাহোর প্রস্তাবই মুসলিম ভারতের রাজনৈতিক আদর্শকে গোটা ভারতের রাজনৈতিক দাবির সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ করিয়া তুলে। মুসলিম লীগ তার ভারতের স্বাধীনতা বিরোধী থাকে না। হইয়া উঠে স্বাধীনতার দাবিদার। এদিকে হক মন্ত্রিসভার দ্বারা সালিশী বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে বাংলার কৃষক-খাতকের অর্থনৈতিক জীবনে একটা আর্থিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। এইভাবে কৃষক-প্রজা সমিতির মূল দাবিগুলি আস্তে আস্তে মুসলিম লীগ কর্তৃক গৃহীত হওয়ায় স্বতন্ত্র শ্রেণী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কৃষক-প্রজা সমিতির বাঁচিয়া থাকার একমাত্র রেইনডেটর যুক্তি ছিল শ্লোগান হিসাবে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদের দাবিটা। এ দাবির পিছনে জন মতের যে বিপুলতা দুইদিন আগে বিদ্যমান ছিল, প্রজাস্বত্ব আইন ও মহাজনি আইন পাস হওয়ার এবং সালিশী বোর্ড স্থাপনের পর সে বিপুলতা অনেকখানি হ্রাস পাইল স্বাভাবিক কারণেই। হক মন্ত্রিসভা এই সময় কার্যতঃ মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা হইয়া যাওয়ায় এবং প্রজা-খাতকদের কল্যাণকর এই সব আইন-কানুন এই মন্ত্রিসভার দ্বারাই সাধিত হওয়ায় মুসলিম জন-মত প্রায় সম্পূর্ণরূপে মুসলিম লীগের পক্ষে চালিয়া গেল।
৯. শেষ চেষ্টা
এইভাবে এই মুদ্দতটা হইয়া গেল আমার জন্য চরম বিভ্রান্তির যুগ। বস্তুতঃ আমার চিন্তারাজ্য এমন গোলমাল আর কখনো ঘটে নাই। চিন্তার অস্পষ্টতাহেতু মতের দৃঢ়তা আর আমার থাকিল না। সব কথায় এবং সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই আমি কিছু কিছু ভাল এবং কিছু কিছু মন্দ দেখিতে লাগিলাম। বলিতে লাগিলাম, কৃষক-প্রজা পার্টির এইটুকু কংগ্রেসের সেইটুকু আর মুসলিম লীগের ঐটুকু ভাল। ফলে আমার বন্ধুরা এই সময় আমার না দিলেন : ‘মিঃ এটাও সত্য ওটাও সত্য।‘ প্রকৃত অবস্থাও হইয়া উঠিয়াছিল তাই। তেজস্বী দৃঢ়তা ও স্পষ্টতার জন্য ‘কৃষকের’ সম্পাদকীয় গুলির যে সুনাম ছিল তা আর থাকিল না। অস্পষ্টতা ও দুর্বলতা ঢাকিবার জন্য নাকি তাতে ফুটিতে লাগিল ন্যায়শাস্ত্রের কচকচি। চিন্তায় দৃঢ়তা না থাকিলে লেখায় দৃঢ়তা আসিবে কোথা হইতে? অথচ কৃষক-প্রজা পার্টিকে বাঁচাইয়া রাখিতে হইলে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদের দাবিটাকে জোরদার করিতেই হইবে। এই উদ্দেশ্যে এই সময়ে আমরা তিন বন্ধু (থ্রি-মাস্কিটিয়ার্সই বলা যাইতে পারে) অধ্যাপক হুমায়ুন কবির, নবাবযাদা হাসান আলী ও আমি, কংগ্রেসী বামপন্থী, কিষাণ সভা ও কমিউনিস্টদের সাথে যোগাযোগ করিতে লাগিলাম। এই উপলক্ষ্যে মিঃ নীহারে দত্ত মজুমদার, কমরেড বংকিম মুখার্জী, কমরেড ভবানী সেন, কমরেড এম. এন. রায়, এমনকি স্বয়ং সুভাষ বাবুর সংগে দেন-দরবার চালাইলাম। কমিউনিস্ট বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র কমরেড রায় ছাড়া আর কারও সংগে অন্ততঃ আমার মতের মিল হইত না। বন্ধু হুমায়ুন কবির বোধ হয় আমার চেয়ে বেশি উত্যক্ত হইয়াছিলেন। এ ব্যাপারে একটা বড় মজার ঘটনা না বলিয়া পারিতেছি না। আমরা উভয়ে কমিউনিস্ট বন্ধুদের সাথে এই সময় ঘনিষ্ঠভাবে মিলামিশা করিতেছি। কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রতি এই সময়ে আমরা উভয়ে আস্থা হারাইয়াছি। কমিউনিস্ট বন্ধুদের সাথে আলোচনা করিয়া আমরা উভয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম যে, কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া আর কোন পার্টি দিয়া ভারতের স্বাধীনতা উদ্ধার হইবে না। আমাদের মনের গতিক যখন এই, এমনই একদিন আমরা ইডেন গার্ডেনে ক্রিকেট খেলা দেখিতে-দেখিতে এবং চীনাবাদাম খাইতে খাইতে এই সিদ্ধান্ত করিলাম যে, ভারতের স্বাধীনতার খাতিরে আমরা অগত্যা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিব। কিন্তু কমিউনিস্ট নেতৃত্বে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরদিনই আমরা ভারত ছাড়িয়া চলিয়া যাইব। কারণ কমিউনিস্ট শাসনের রেজিমেন্টেড ইন্টেলেকচুয়াল জীবন আমরা সহ্য করিতে পারি না। কমিউনিস্ট শাসন সম্পর্কে আমাদের তৎকালীন এই ধারণা ঠিক না হইতে পারে, কিন্তু দেশের স্বাধীনতার খাতিরে আমরা কতদূর ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিলাম এতে সেটা বুঝা যাইবে। সংগে সংগে এটাও বুঝা যাইবে যে, কমিউনিস্ট মানে স্টালিনী, শাসন সম্পর্কে তৎকালে আমাদের ধারণা খুব ভাল ছিল না।
