হক সাহেবের সাথে মুসলিম লীগের বিরোধের কোনও লক্ষণ দেখা গেল না পনর দিন চলিয়া গেল।
৭. শামসুদ্দিনের পদত্যাগ
হক সাহেব শেষ পর্যন্ত তাঁর কথা রাখিলেন, অর্থাৎ একটি শর্ত পূরণ করিলেন না। কিন্তু আমি হক সাহেবের কথামত কাজ করিতে পরিলাম না। শামসুদ্দিনের সাথে গোপন আলাপে আমি হয়ত তাঁকে আভাসেইগতে হক সাহেবের মনের কথা বুঝিতে দিয়াছিলাম। ভাই শামসুদ্দিন পদত্যাগ করিতে প্রথমে অনিচ্ছা প্রকাশ করিলেন। মন্ত্রী থাকার সুবিধার কথাও অনেক আলোচনা হইল। কৃষক-প্রজা পার্টির শর্তসমূহ নিশ্চিতরূপেই কৃষক-প্রজার স্বার্থের অনুকূল। প্রতমতঃ শামসুদ্দিন সাহেব মন্ত্রী থাকিয়া গেলে ঐগুলি ক্রমে ক্রমে পূর্ণ হইবার আশা থাকে। পদত্যাগ করিয়া ফেলিলে সে আশা থাকে না। দ্বিতীয়তঃ ইতিমধ্যে কৃষক-প্রজা পার্টির মুখপত্ররূপে দৈনিক ‘কৃষক’ বাহির করিয়াছিলাম। আমিই ওটার সম্পাদক। শামসুদ্দিন মন্ত্রী থাকিলে কাগজটা চালান সহজ হইবে। মন্ত্রী না থাকিলে কাগজ চালান খুবই কঠিন, হয়ত অসম্ভব হইবে। তৃতীয়তঃ ইতিমধ্যে ময়মনসিংহ জিলার টাংগাইল মহকুমার ভেংগুলা গ্রামে নিখিলবংগ কৃষক-প্রজা-সম্মিলনীর আয়োজন করা হইয়াছে। নবাবযাদা হাসান আলী অভ্যর্থনা সমিতির সেক্রেটারি ও আমি নিজে উহার চেয়ারম্যান। কৃষিমন্ত্রী হিসাবে শামসুদ্দিন সাহেব ঐ সম্মিলনী উদ্বোধন করিবেন। এসব কথা ঘোষণা ও প্রচার করা ইয়াছে। এই সময় তিনি পদত্যাগ করিলে কর্মীদের উৎসাহ উদ্যম দমিয়া যাইবে। সম্মিলনীর সাফল্য ব্যাহত হইবে। ঐ সংগে মন্ত্রিত্ব না ছাড়িবার প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া ও কুফলগুলির কথাও বিবেচনা করা হইল।
সমস্ত বিষয় ধীরভাবে বিবেচনা করিয়া অবশেষে মৌঃ শামসুদ্দিন ১৯৩৯ সনের ১৭ই ফেব্রুয়ারি এক সুদীর্ঘ বিবৃতিতে আদ্যোপান্ত সমস্ত বিষয় বর্ণনা করিয়া মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করেন। কোনও পার্লামেন্টারি দল স্বীয় মন্ত্রীকে কল ব্যাক করা এবং কর্মসূচির ভিত্তিতে কোন মন্ত্রীর পদত্যাগ করা বাংলা ও ভারতের রাজনীতিতে ছিল উহাই প্রথম। সকলে মিলিয়া আমরা শামসুদ্দিন সাহেবের এই সাহসী পদত্যাগে ও স্বার্থত্যাগে তাঁকে ধন্যধন্য করিলাম।
৮. শেষ কৃষক-প্রজা সম্মিলনী
নির্ধারিত তারিখে (২০শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৯) ময়মনসিংহ জিলার টাংগাইল মহকুমার অন্তর্গত তেংগুলা গ্রামে নিখিল বংগ কৃষক-প্রজা সম্মিলনীর অধিবেশন বসিল। আশা ছিল কৃষিমন্ত্রী হিসাবে শামসুদ্দিন সাহেবকে লইয়া আমরা ভেংগুলা নিখিল বংগ কৃষক-প্রজা সম্মিলনী করিব। আমাদের বরাতে তা আর হইল না। তবু সম্মিলনীর সৌষ্ঠব ও সাফল্যের কোনও নি হইল না। নবাবযাদা হাসান আলী অভ্যর্থনা সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি হিসাবে সম্মিলনীর সাফল্যের জন্য শারীরিক পরিশ্রম ও অসংকোচে অর্থ ব্যয় করিতে কোনও কৃপণতা করিলেন না। অজ পাড়াগাঁয়ে নিখিল বংগীয় সম্মিলনীর এমন সুন্দর প্যাণ্ডাল সুউচ্চ মঞ্চ দুই ডজন লাউডস্পিকারসহ একাধিক মাইক্রোফোন, সমাগত নেতৃবৃন্দের থাকা-খাওয়া এমন সুবন্দোবস্ত ইতিপূর্বে, এবং দেখা গেল এর পরেও, আর কখনও হয় নাই। ডেলিগেট ও দর্শকসহ প্রায় লক্ষ লোকের সমাগম হইয়াছিল বলিয়া সকলে অনুমান করিয়াছিল। সভাপতি হিসাবে মওলানা আবদুল্লাহিল বাকী সাহেব খুব সারগর্ত সুচিন্তিত অভিষণ দিয়াছিলেন। ভূতপূর্ব মন্ত্রী মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী ও মৌঃ শামসুদ্দিন সম্মিলনীতে বিপুলভাবে সম্বধিত হইয়াছিলেন। হক সাহেবের বিরুদ্ধে যাওয়ায় এবং মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করায় উক্ত নেতৃদ্বয় ও কৃষক-প্রজা সমিতি কিছুমাত্র জনপ্রিয়তা হারাইয়াছেন মনে হইল না। বরঞ্চ দুইটি ঘটনা হইতে মনে হইয়াছিল যে গণ-মনে কৃষক-প্রজা সমিতির প্রতি যথেষ্ট টান তখনও অটুট রহিয়াছে। একটি ঘটনা এই যে কলিকাতা হইতে নেতৃবৃন্দ আসিবার কালে পিংনা স্টিমার স্টেশনের স্থানীয় ম্যারেজ রেজিস্টারের নেতৃত্বে কতিময় খায়েরখাহ ইউ.বি.প্রেসিডেন্ট নেতৃবৃন্দকে কালা নিশান দেখাইবার চেষ্টা করিয়া বিফল হন। দ্বিতীয় ঘটনা এই যে করটিয়ার জনাব মঊদ আলী খান পন্নি (নবাব মিয়া) এক দল লোক লইয়া আমাদের সম্মিলনীতে গন্ডগোল বাধাইতে আসিতেছিলেন। পথেজনসাধারণ তাঁদের বাধা দেওয়ায় তাঁরা মধ্য পথহইতে ফিরিয়া যান।
ইহাই ছিল নিখিল বংগ কৃষক-প্রজা সম্মিলনীর শেষ অধিবেশন। প্রকাশ্য অধিবেশন ত আর হয়ই নাই। সমিতির কাউন্সিলের বৈঠকও এর পর হয় নাই। কৃষক-প্রজা পার্টিই পার্লামেন্টারি ব্যাপারাদি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিত। বড় জোর সমিতির ওয়ার্কিং কমিটি ডাকা হইত। প্রতিষ্ঠান হিসাবে কৃষক-প্রজা সমিতি নির্জীব ও নিষ্ক্রিয় হইয়া পড়িবার প্রধান কারণ ছিল এই যে, খোদ কৃষক-প্রজা আন্দোলনই তার তীক্ষ্ণতা ও তীব্রতা হারাইয়া ফেলিয়াছিল। ঢিমা-তেতালা-ভাবে হইলেও হক মন্ত্রিসভা কৃষক-প্রজা ও মুসলমানদের জন্য যথেষ্ট ভাল কাজ করিয়াছিলেন এবং করিতে ছিলেন। ১৯৩৮ সালে সালিশী বোর্ড স্থাপন, ১৯৩৯ সালের প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪০ সালের মহাজনি আইন, প্রাথমিক শিক্ষা আইন অনুসারে স্কুলবোর্ড গঠন, কলিকাতা কর্পোরেশন আইন সংশোধন করিয়া পৃথক নির্বাচন প্রবর্তন, মাধ্যমিক শিক্ষা বিল আনয়ন ইত্যাদি কাজ করিয়া ও করিতে চাহিয়া মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে হক মন্ত্রিসভা দোষে-গুণে সবচেয়ে ভাল মন্ত্রিসভা বলিয়া জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাছাড়া হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ ও নেতৃবৃন্দ হক মন্ত্রিসভার যে সব সমালোচনা নিন্দা ও প্রতিবাদ করিতেন, তার প্রায় কোনটাই জনগণের স্বার্থে করা হইত না। প্রায় সবগুলিই করা হইত হিন্দু বা কায়েমী স্বার্থের খাতিরে। এই পরিবেশে কৃষক-প্রজা পার্টির প্রকৃত জনস্বার্থমূলক সরকার-বিরোধিতাও ভুল বুঝা হইত। কৃষক-প্রজা পার্টি কংগ্রেসীদের সাথে হাত মিলাইয়া এই মন্ত্রিসভারই পতন ঘটাইতে চায়। মুসলিম গণ মনে এই সন্দেহ বদ্ধমূল হওয়ায় তাদের মুখে ভাল কথা শুনিতেও জনসাধারণ রাযী ছিল না। ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধ বাধায় এবং জাপান প্রায় ভারত দখল করে-করে অবস্থা আসিয়া পড়ায় সভা সমিতির ও প্রচারণা প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়ে।
