৬. দুর্জ্ঞেয় হক সাহেব
কিন্তু হক সাহেব আমাকে ডাকিয়া ফিরাইলেন। আমি মওলানা সাহেবকে বিদায় দিয়া একা তাঁর ঘরে গেলাম। হক সাহেব আমাকে বসাইয়া রাখিয়া সেক্রেটারিয়েটে যাইবার সাজ-পোশাক পরিলেন। তারপর আমাকে লইয়া গাড়িতে উঠিলেন। সোজা গেলেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ। প্রধানমন্ত্রীর কামরায় ঢুকিয়াই দেখিলাম নবাব হবিবুল্লাহ সহ কয়েকজন মন্ত্রী বসিয়া আছেন। আমার সংগে যরুরী কথা আছে বলিয়া তিনি অল্প কথায় সব কয়জন মন্ত্রীকে বিদায় করিলেন। একে একে মন্ত্রীরা সব বাহির হইয়া গেলে হক সাহেব নিজে চেয়ার ছাড়িয়া উঠিলেন। প্রথমে সামনের বড় দরজাটা, তার পর অন্যান্য দরজা এবং শেষ পর্যন্ত সবগুলি জানালা নিজ হাতে বন্ধ করিলেন। ঠিক মত বন্ধ হইয়াছে কি না, ছিটকানিগুলি লাগিয়াছে কিনা, টিপিয়া-টিপিয়া দেখিলেন। আমি অবাক বিস্ময়ে বাংলার প্রধানমন্ত্রী বিশাল-বপু শেরে-বাংলা ফযলুল হক সাহেবের কার্যকলাপ দেখিতে লাগিলাম। আমার মত পদ-মর্যাদাহীন নগণ্য একটা লোকের সাথে যরূরী আলাপ করিবার জন্যই এত সাবধানতা অবলম্বন করিতেছেন, এটা বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। তবে কেন, কি উদ্দেশ্যে তিনি এত পরিশ্রম করিতেছেন? আমার কৌতূহল সীমা ছাড়াইয়া যাইতে লাগিল।
অবশেষে তিনি ফিরিয়া টেবিলের দিকে আসিলেন। কিন্তু নিজের চেয়ারে না বসিয়া আমার পাশের একটা চেয়ার টানিয়া আরও কাছে আনিয়া তাতে বসিলেন। তার পরও অতিরিক্ত সাবধানতা হিসাবে আরেক বার ডাইনে-বাঁয়ে তাকাইয়া ছোট গলায় বলিলেন : দেখ আবুল মনসুর, আজ যে কথা কইবার লাগি তোমারে এখানে লৈয়া আসছি, সেটা এতই গোপনীয় যে উপরে আরা ও নিচে তুমি আমি ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না। আর ওয়াস্তে ওয়াদা তুমি একথা কেউরে কইতে পারবা না। মরুবির কথা। আমি আর কি করিতে পারি। ওয়াদা করিলাম। তিনি আরেক টানে চেয়ারটা আমার আরও কাছে আনিয়া তীর বেলচার মত বিশাল হাতে আমার ডান হাতটা ধরিয়া ফেলিলেন। তারপরই দুই হাতে আমার হাতটা চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন : ‘শর্ত-টর্তের কথা ভুইলা যাও। আমি ওর একটাও পূরণ করতে পারব না। পারব না মানে করব না। ঐ সব শর্ত যদি আমি পূরণ করি, তবে কৃষক-প্রজা পার্টি ন্যায়তঃ কোয়ালিশন পার্টির অংগ হইয়া যাইতে বাধ্য। কিন্তু আমি তা চাই না। আমি চাই কৃষক-প্রজা পার্টি অপযিশনেই থাকুক। মুসলিম লীগওয়ালাদের সাথে আমার সম্পর্ক খুবই খারাপ। কখন কি হয় কওয়া যায় না। হৈতে পারে শীগগির আমাকে রিযাইন করতে হৈব। সে সিচুয়েশনে আমার একটা জাম্পিংগ্রাউও থাকার দরকার। বুঝলা ত?
আমি আর কি বুঝিব? বিস্ময়ে আমার ভালুজিত লাগিয়া গিয়াছিল। গলা শুকাইয়া গিয়াছিল। পা অবশ হইয়া আসিয়াছিল। মাথা তো তো করিতেছিল। কাজেই জবাব দিতেছিলাম না। তিনি আমার হাতে একটা যবর চাপ দেওয়ায় আমি চমকিয়া উঠিলাম। অনেক কষ্টে বলিলাম : তবে যে শামসুদ্দিনের পদত্যাগ কতেই হৈব।
আমার হাত হইতে নিজের ডান হাতটা আমার কাঁধে তুলিলেন। বলিলেন : ‘না সে পদত্যাগ করতে পারে না; তারে কিছুতেই পদত্যাগ করায়ো না। আসল কথা কি জান, আমি কোয়েলিশন পার্টিতে মাইনরিটি নই। কিন্তু ক্যাবিনেটে আমি মাইনরিটি। শামসুদ্দিন মন্ত্রী থাকলে আমার জোর বাড়ে। তুমিষুদ্দিনকে আমি পুরাপুরি বিশ্বাস করি না। তবু শামসুদ্দিন ক্যাবিনেটে থাকলে তুমিষুদ্দিন আমার পক্ষে ভোট দিব। কিন্তু সে বার হৈয়া গেলে তুমিষুদ্দিন খাজাদের সাথে যোগ দিব।‘
গোড়াতে হক সাহেবের এই অসাধু প্রস্তাবে আমি চাটয়া গিয়াছিলাম। কিন্তু ক্রমে তাঁর অসুবিধা উপলব্ধি করিলাম। তার যুক্তির সারবৃত্তান্ত আমি বুঝিলাম। তবু বন্ধুবর শামসুদ্দিনকে ওয়াদা খেলাফের অপরাধে অপরাধী করিতে এবং কৃষক-প্রজা পার্টির নির্দেশ অমান্য করায় উদ্বুদ্ধ করিতে মন মানিল না। বলিলাম : ‘সার, এটা হয় না। শামসুদ্দিন পার্টি ম্যান্ডেট অমান্য কৈরা যদি মন্ত্রিত্ব আঁকড়াইয়া থাকে, তবে তাঁর সুনাম নষ্ট হৈব, তার রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটব।’
হক সাহেব ধাক্কা মারিয়া আবার হাতটা ছাড়িয়া দিয়া গর্জিয়া উঠিলেন। বলিলেন : ওসব বাজে কথা আমার কাছে কইও না। আমি যদি শামসুদ্দিনের পিছনে দাঁড়াই তবে সে যাই করুক না কেন, তার রাজনৈতিক জীবন নষ্ট হবার পারে না। তুমি গিয়া তারে কও, আমি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ভার নিলাম।
আমি খুবই বিভ্রান্ত হইয়া হক সাহেবের নিকট হইতে বিদায় নিলাম। কিন্তু আসল কথা। কার, কাছে বলিলাম না। সমিতির সভাপতি মওলানা বাকী সাহেবের নিকট হইতে মেরা আগেই রিপোর্ট পাইয়াছিলেন, হক সাহেব শীঘ্রই শর্ত পূরণ করিতেছেন। কাজেই আমার আর নূতন কি কথা থাকিতে পারে? ফলে আমাকে কেউ, বিশেষ কিছু জিগাস করিলেন না। মওলানা সাহেব পার্টি হাউসে থাকিতেন না, নিজের বাসায় থাকিতেন। কাজেই পরদিন সভার আগে তার সাথে আমার দেখা হইল না। পরদিন সভায় স্বয়ং সভাপতি সাহেবই হক-মোলাকাতের বর্ণনা দিলেন। তিনি বলিলেন : হক সাহেব শীঘ্রই শর্তগুলি অন্ততঃ তার বেশির ভাগ, পূর্ণ করিবেন ওয়াদা করিয়াছিলেন। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট তারিখ দেন নাই। দীর্থ আলোচনার পর ঐদিন হইতে পনর দিন পরে পদত্যাগ করিতে শামসুদ্দিন সাহেবকে নির্দেশ দিয়া প্রস্তাব গৃহীত হইল। আমি পনর দিনের জায়গায় একমাস সময় দেওয়ার প্রস্তাব দিলাম। ইতিমধ্যে তিনমাসের বেশি সময় অতিবাহিত হইয়াছে এই যুক্তিকে আমার এক মাসের প্রভাব গ্রাথ হইল। সভাশেষে মওলানা সাহেব একা আমার সাথে কথা বলিলেন। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজিকার সভায় আমার অল্পভাষিতা মওলানা সাহেবকে চিন্তাযুক্ত করিয়াছে সে কথা তিনি বলিলেন। প্রসংগ ক্রমে আগের দিন হক সাহেবের সাথে আমার আর কি আলাপ হইল তাও জিগাস করিলেন। আমি অনেক দ্বিধা-সন্দেহ কাটাইয়া খুব সাবধানে অল্প কথায় হক সাহেবের প্রস্তাবের মূল কথাটা বলিলাম। ঐ সাথে এর সুবিধা ও যুক্তিটাও বলিলাম। মওলানা বাকী সাহেব ছিলেন তীবুদ্ধি দূরদর্শী রাজনীতিজ্ঞ। তিনি চট্ করিয়া কথাটা ধরিয়া ফেলিলেন। বলিলেন : ‘হক সাহেবের কথায় জোর আছে। এ কথা যদি সতায় আপনি বলিতেন তবে প্রস্তাব অন্য রকম হইত। যাক এখন আর সময় নাই। যা হইবার ভালই হইয়াছে। হক সাহেব যদি লীগের সহিত আংগিয়া আসেন, তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মত এই যে, তাঁকে আমাদের গ্রহণ করা উচিৎ।‘
