৫. হক-নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য
এমন নেতা যেদিন এক পকেটের কৃষক-প্রজা পার্টি এবং আরেক পকেটে মুসলিম লীগ লইয়া মাঠে নামিলেন, এবং দুদিন আগে-কওয়া কথার বিপরীত কথা বলিতে লাগিলেন, জনসাধারণ সেদিনও তাঁর কথা মানিয়া লইল। ডাল ভাতের যুক্তি দিয়া দুদিন আগে তিনি মুসলিম লীগের ‘মুসলমান ভাই ভাইর’ যে কথাটাকে একটা হাস্যকর ভন্ডামি বলিয়া উড়াইয়া দিয়াছিলেন এবং জনসাধারণও উহাকে বিদ্রূপ করিয়াছিল, দুই দিন পরে সেই হাস্যকর কথাকেই তিনি জনপ্রিয় সত্যে পরিণত করিলেন। মুসলিম লীগ নেতাদের মুখে যেটা শুনাইত অবিশ্বাস্য হাস্যর উক্তি, হক সাহেবের মুখে সেটাই শুনাইত ঘোরতর সত্য কথারূপে। তিনি যেদিন মাঠে নামিয়া বলিলেন : প্রজা-সমিতিও দরকার, মুসলিম লীগও দরকার, তখন জনসাধারণও তাই বিশ্বাস করিল। আমরা কৃষক-প্রজা পার্টির ঝাণ্ডা খাড়া রাখিবার চেষ্টা করিয়া হক সাহেবের স্থলে মওলানা আব্দুল্লাহিল বাকীকে সভাপতি করিলাম। কৃষক-প্রজা সমিতির সংগঠনে মনও দিলাম। কিন্তু হক সাহেবের জনপ্রিয়তার সংগে সরকারী শক্তির যোগ হওয়ায় তার দুর্বার স্রোতের মুখে আমরা ভাসিয়া গেলাম।
আচার্য রায় ঠিকই বলিয়াছিলেন : হক সাহেব খাঁটি মুসলমানও বটে, তিনি খাঁটি বাংগালীও বটে। অনাস্থা প্রস্তাবে জিতিয়াও তিনি অল্পদিনেই বুঝিলেন একদিকে মুসলিম সংহতি প্রচারের দ্বারা অপরদিকে কৃষকপ্রজা পার্টিকে ধ্বংস করিয়া দুইদিক হইতেই তিনি বাংলার নেতৃত্ব অবাংগালীর হাতে তুলিয়া দিতেছেন। তিনি নিজে যাইতেছেন মুসলিম লীগের দিকে; আর তাঁর দুঃখের দিনের সহকর্মীদের ঠেলিয়া দিতেছেন তিনি কংগ্রেসের দিকে। এ দুইটার নেতৃত্বই বাংলার বাইরে। নিজে প্রধানমন্ত্রী হইয়াও মন্ত্রিসভার মধ্যে তিনি মাইনরিটি হইয়া পড়িয়াছেন এটা তিনি সহজেই বুঝিতে পারিলেন।
এটা তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন বিশেষভাবে প্রজাস্বত্ব আইন পাস করার সময়। কোয়েলিশন পার্টিতে সচ্ছল মেজরিটি থাকায় আইন পরিষদে বিলটি পাস হইল বটে কিন্তু লাট সাহেব উক্ত আইনের দস্তখত দিতে গড়িমসি করিতে লাগিলেন। উক্ত আইনের বড় লাটের অনুমোদন লাগিবে বলিয়াও লাটসাহেব মত প্রকাশ করিলেন। শোনা যায় স্বয়ং মন্ত্রীদের কারো-কারো কথায় লাট সাহেব ঐ রূপ করিয়াছিলেন। অবশেষে হক সাহেব পদত্যাগের হুমকি দিলে লাট সাহেব প্রজাস্বত্ব আইনে দস্তখত দেন। তাই হক সাহেব সাবধান হইবার চেষ্টা করিলেন। তিনি প্রজা নেতাদের সংগে আপোস করিয়া মন্ত্রিসভার ভিতরে অধিকতর শক্তিশালী হওয়া দরকার বোধ করিলেন। এ দরকার যরুরী হইয়া পড়িয়াছিল। ১৯৩৮ সালের অক্টোবর মাসে মৌঃ তমিমুদ্দিনের নেতৃত্বে একদল সদস্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রজা পার্টি নামে দল করিয়াই ইতিমধ্যে কোয়েলিশন পার্টি হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছিলেন। তাই হক সাহেব মৌ শামসুদ্দিন ও মৌঃ তমিযুদ্দিন উভয়কে মন্ত্রী করিয়া কৃষক-প্রজা পার্টি ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রজা পার্টি উভয় দলের সহিত মিটমাট করার প্রস্তাব দেন। উক্ত দুই পার্টির যুক্ত বৈঠকে কতিপয় শর্ত পেশ করা হয়। প্রধান মন্ত্রী সব শর্ত মানিয়া নেন। ইতিমধ্যে কৃষক-প্রজা। পার্টির দৈনিক মুখপত্ররূপে ‘কৃষক’ বাহির হইল। আমি তাঁর সম্পাদকতার ভার নিলাম। ফলে আমি কলিকাতার স্থায়ী বাশো হইলাম। তাতে পার্লামেন্টারি পলিটিকসে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়াইয়া পড়িলাম। সকলের চেষ্টায় ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ ও মৌঃ তমিযুদ্দিন খাঁ হক মন্ত্রিসভায় প্রবেশ করিলেন। কৃষক-প্রজা সমিতির বিনা অনুমতিতে মৌঃ শামসুদ্দিন সাহেব মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়াছেন, এই অভিযোগে সমিতির কাউন্সিলের এক রিকুইযিশন সভায় অধিবেশন দেওয়া হইল। ২৩শে ডিসেম্বর হইতে তিন দিন ধরিয়া এই সভার অধিবেশন চলিল। অবশেষে হক সাহেব এই সভায় যোগদান করিলেন। হক সাহেবের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত কৃষক-প্রজা সমিতি ১২টি শর্তে শামসুদ্দিন সাহেবের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ অনুমোদন করিল। নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ঐ সব শর্ত পূর্ণ করিতে না পারিলে হক সাহেব নিজেই পদত্যাগ করিবেন প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় বিক্ষুব্ধ কৃষক-প্রজা নেতৃবৃন্দ ও এম. এল. এ. গণ শান্ত হইলেন।
নির্ধারিত দিন আসিল, গেল। কিন্তু হক সাহেবের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখা হইল। ১২টি শর্তের একটিও পূর্ণ হইল না। ফলে কৃষক-প্রজা সমিতির ওয়ার্কিং কমিটি ও কৃষক-প্রজা পার্টির যুক্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হইল। শামসুদ্দিন সাহেবের বক্তব্য শুনিয়া ঐ ১২টি শর্তকে দুই ভাগে ভাগ করা হইল। তিনটিকে আশু পূরণের দাবি করা হইল। এই আশু শর্ত তিনটি পূরণের জন্য আরও পনর দিন সময় দেওয়া হইল। প্রস্তাবে বলা হইল এটাই শেষ কথা : এর পর আর সময় দেওয়া হইবে না। এই প্রস্তাবকে চরমপত্র হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে দিবার জন্য সমিতির প্রেসিডেন্ট মওলানা আবদুল্লাহ হিল বাকী ও আমাকে লইয়া একটা ডিপুটেশন গঠিত হইল।
তদনুসারে মওলানা সাহেব ও আমি হক সাহেবের ঝাউতলায় বাড়িতে গেলাম। তিনি পরম সমাদরে আমাদেরে অভ্যর্থনা করিলেন এবং শর্ত পূরণ করিতে না পারার অনেকগুলি যুক্তিপূর্ণ কারণ প্রদর্শন করিলেন। তার মধ্যে লাটের সাথে জমিদার মন্ত্রীদের গোপন ষড়যন্ত্রের কথাই বেশি। আমার ত বটেই স্বয়ং মওলানা সাহেবের দিলটাও নরম হইয়া গেল। হক সাহেব দুচার দিনের মধ্যে সবগুলি না হউক অন্ততঃ তিনটা আশু শর্ত পূরণ করিতে পারিবেন বলিয়া আশ্বাস দিলেন। আমরা আশ্বস্ত হইয়া বিদায় হইলাম।
