গণতন্ত্রে অপযিশনের কর্তব্য ও অবদান এটাই। অপযিশনের চাপ ও সমালোচনাই হক মন্ত্রিসভাকে এই সব ভাল কাজে বাধ্য করিয়াছিল। কিন্তু সবটুকু কৃতিত্ব হক মন্ত্রিসভাই পাইল। অপযিশন এক বিন্দু ধন্যবাদ পাইল না! হক মন্ত্রিসভা যিলাবাদে দেশের আকাশ-বাতাস মুখরিত হইল। পক্ষান্তরে অপযিশনের ভাগ্যে জুটিল নিন্দা। অমন ভাল মন্ত্রিসভার যারা বিরোধিতা করে, তারা দেশ-হিতৈষী হইতেই পারে না। অপযিশনের এই পরোক্ষ লোকসান ছাড়া আরও দুইটা প্রত্যক্ষ লোকসান হইল। এক কৃষক-প্রজা পার্টি দুই টুকরা হইয়া গেল। ৫৮ জন মেম্বরের মধ্যে ২৮ জন মাত্র মেম্বর লইয়া আইন পরিষদের মধ্যে কৃষক-প্রজা-পার্টি গঠিত হইল। বাকী ৩০ জন হক সাহেবের সমর্থক রূপে কোয়ালিশন পার্টির মেম্বর রহিয়া গেলেন। দুই হক সাহেব কৃষক-প্রজা সমিতির সভাপতিত্বে ইস্তফা না দিয়াই প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতিত্ব গ্রহণ করায় হক সাহেবের সমর্থক কৃষক-প্রজা মেধররা তাঁদের স্বাত্ম রক্ষার বা নিজস্ব কৃষক-প্রজা-সমিতি চালাইবার কাজে হক সাহেবের পদ-মর্যাদার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পাইলেন না। সংগঠনের বিশেষ চেষ্টাও হক সাহেব করিলেন না। অথচ কৃষক-প্রজা-সমিতির সভাপতিত্বও ছাড়িলেন না। এত দ্বন্দ্ব কলহের মধ্যেও হক সাহেবের সহিত আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালই ছিল। পার্টির নেতাদের অনুরোধে একদিন আমি তাঁকে মুসলিম লীগ ও কৃষক-প্রজা-সমিতি উভয়টার সভাপতি থাকার মত স্ববিরোধী কাজ না করিয়া একটা হইতে পদত্যাগ করিতে অনুরোধ করিলাম। তিনি সুস্পষ্ট আন্তরিকতার সাথে জবাব দিলেন যে, মুসলিম বাংলাকে বাঁচাইতে হইলে মুসলিম লীগও করিতে হইবে, কৃষক-প্রজা-সমিতিও চালাইতে হইবে। তাঁর এই সুস্পষ্ট অসংগত কথার সমর্থনে তিনি শক্তিশালী যুক্তিও দিলেন। তিনি বলিলেন : বাংলার ক্ষেত্রে প্রজা-আন্দোলন ও মুসলিম-আন্দোলন একই কথা। মুসলিম লীগ ক যেমন ভারতীয় মুসলমানের জন্য দরকার কৃষক-প্রজা সমিতি করা তেমনি বাংগালী মুসলমানের জন্য দরকার। তিনি কৃষক-প্রজা-সমিতির সভাপতিত্ব ছাড়িয়া দিয়া এটাকে কংগ্রেস-নেতাদের হাতে তুলিয়া দিতে পারে না। তেমনি মুসলিম লীগের সভাপতিত্ব ছাড়িয়া দিয়া ওটাকে খাজা-গজাদের হাতে তুলিয়া দিতে পারেন না।
৪. কৃষক-প্রজা আন্দোলনের ভূমিকা
সে সব যুক্তি অনুসারে যদি হক সাহেব কাজ করিতেন তবে হয়ত একদিন তাঁর মত সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইত। কিন্তু তা হয় নাই। তাঁর সমর্থক কৃষক-প্রজা মেম্বরদের অস্তিত্ব আস্তে-আস্তে মুসলিম লীগের তলে চাপা পড়িয়া গেল। স্বয়ং হক সাহেব মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ায় কৃষক-প্রজা সমিতির ঐ অংশ কার্যতঃ মুসলিম লীগের মধ্যে মার্জ হইয়া গেল। পক্ষান্তরে ঐ একই অবস্থা-গতিকে কৃষক প্রজা সমিতির আমাদের অংশ আস্তে আস্তে কার্যতঃ কংগ্রেসের শাখা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইয়া গেল।
পরবর্তী দুই-তিন বছরের মধ্যেই বাংলার কৃষক-প্রজা পার্টির অস্তিত্ব লোপ পাইল। এই জন্যই অনেক রাষ্ট্র বিজ্ঞানী হক সাহেবকে বাংলার ম্যাকডোনান্ড বলিয়া থাকেন। অনেকের মতে মিঃ রামযে ম্যাকডোনান্ডই নিজ হাতে লেবার পার্টি গঠন করিয়াছিলেন। তিনি নিজ হাতেই তা ভাংগিয়া গিয়াছেন, হক সাহেবও বাংলার প্রজা-পার্টির যুগপৎভাবে সৃষ্টিকর্তা ও সংহার-কর্তা। বিলাতের লেবার পার্টি আবার পূনর্জন্ম লাভ করিয়াছে এবং অধিকতর শক্তিশালী হইয়াই জন্মিয়াছে। বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি এবারের মত চূড়ান্তভাবে মরিয়াছে। লেবার পার্টির পুনর্জন্মের কারণ তার উদ্দেশ্য এখনও সফল হয় নাই; ইংলন্ডে সমাজবাদ আজও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। বাংলার কৃষক-প্রজা পার্টির আদর্শ সমাজবাদের মত সুদূরপ্রসারী কর্মপন্থা ছিল না। এর আদর্শও খুব বিপ্লবাত্মক হইলেও সেটা ছিল সীমাবদ্ধ। ‘লাংগল যার মাটি তার’ এটা কৃষক-প্রজা পার্টির বামপন্থী দলেরই শ্লোগান ছিল। নেতারা এতে বিশ্বাস করিতেন না। নেতাদের দৃষ্টি ছিল অন্যদিকে। বাংলার প্রজা-আন্দোলন একটা মুসলিম-আন্দোলন বটে। আচার্য রায় ঠিকই বলিয়াছিলেন, কৃষক-প্রজা নেতা হক সাহেব মাথার চুল হইতে পায়ের নখ পর্যন্ত মুসলমান। তাঁর নেতৃত্ব কাজেই নিজ কৃষক-নেতৃত্ব ছিল, ছিল মুসলিম নেতৃত্ব। প্রজা-পার্টির অভিযোগে শুধু অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি ছিল, সামাজিক মর্যাদার দাবিও ছিল আমার নিজের বেলা যেমন জমিদারের কাঁচারিতে মুসলমান প্রজাদের বসিবার আসনের এবং সম্মানজনক সোধনের দাবি হইতেই আন্দোলন শুরু হইয়াছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবিকল তাই হইয়াছিল। কংগ্রেসের এবং কিষাণ সভার বন্ধুরা বাংলার প্রজা-আন্দোলনকে মুসলমান জোতদারদের আন্দোলন বলিতেন। তাঁদের এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল না। কৃষক-প্রজা আন্দোলন যে সময় খুবই জনপ্রিয় আন্দোলন কৃষক-প্রজা-সমিতি যখন খুবই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সেদিনেও বর্গাদারদেদখলী স্বত্ব দেওয়ার প্রশ্নে অনেক প্রজা নেতাই ছাঁৎ করিয়া জ্বলিয়া উঠিতেন। সার আব্দুর রহিম, মৌলবী আবদুল করিম, খান বাহাদুর আবদুল মোমিন প্রভৃতি বড়-বড় মুসলিম নেতার প্রজা-সমিতির কর্মকর্তা থাকা হইতেই প্রজা-সমিতির মধ্যকার রূপ বোঝা যায়। সোজা কথায় প্রজা আন্দোলন ছিল সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আন্দোলন। সামন্ত-রাজদের বিপুল সংখ্যাধিক লোক হিন্দু হওয়ায় মুসলমানদের মধ্যবিত্তেরা এই সামন্ততন্ত্রের কোনও সুবিধা না পাওয়ায় মুসলমানদের মধ্যে প্রজা-আন্দোলনের এতটা জনপ্রিয় হইয়াছিল। সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলমান শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ক্রোধের কারণ এই হইতেই বোঝ যাইবে যে হিন্দু সামন্ত-রাজদের চাকুরি-বাকুরি ত দূরের কথা, যে কজন মুসলমান সামন্ত ছিলেন তাঁদের চাকুরিগুলিও মুসলমানরা পাইত না। চাকুরি-বাকুরি ছাড়াও সামন্ত-রাজেরা মামলা-মোকদ্দমা আমোদ-প্রমোদ বিলাস-বাসনে যে অজস্র টাকা ব্যয় করিতেন, তাও হিন্দুরা পাইত। কাজেই বাংলার এজা-আন্দোলন মূলতঃ এবং প্রধানতঃ হিন্দু সামন্ত-তন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলিম মধ্যবিত্তের আন্দোলন। এই আন্দোলনে সমাজবাদী ও সাম্যবাদী বামপন্থী এক দল কর্মী ছিলেন বটে, এবং তাঁদের চেষ্টায় প্রজা-আন্দোলন বাধ্য হইয়া কৃষক আন্দোলনের আকৃতি প্রকৃতিও কিছুটা পাইয়াছিল বটে, কিন্তু স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক কারণেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পান নাই। মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের মধ্যে হক সাহেবই ছিলেন একমাত্র গণ-নেতা ম্যান-অব-দি মাসে। তিনি বিপুল কর্মী সুচতুর টেকনিশিয়ান রাজনৈতিক ম্যাজিশিয়ান ও কৌশলী যোদ্ধা ছিলেন। তিনি জনগণের ভাষায় জনগণের যুক্তি দিয়া জনগণকে নিজের কথা বুঝাইতে পরিতেন। তাঁর কথায় ও কাজে ইমোশন ছিল। ঈর বুকে দরদ ছিল। কাজেই এ দরদী ভাব প্রবণ নেতাকে ভাবালু জনসাধারণ অতি সহজেই বুঝিতে পারিত।
