জবাবে আমি হক সাহেবের বিশ্বাস ভংগ ও হক মন্ত্রিসভার অকর্ম ও কুকর্মের লম্বা ফিরিস্তি দিলাম। আচার্য রায়ের মন জয় করিবার মতলবে হক সাহেবের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগও আনিলাম। আচার্য রায় ধৈর্যের সাথে সব কথা শুনিলেন। বিশাল মোচের নিচে তিনি মুচকি হাসিতে থাকিলেন। আমার কথা শেষ হইলে তিনি তাঁর শীর্ণ হাতটি উচা করিয়া বলিলেন : “তুমি যা বললে সবই রাজনীতির কথা। আমি রাজনীতির কথা বলছি না। আমি বলছি বাংগালী জাতির ভবিষ্যতের কথা। সমস্ত রাজনীতিক সত্যের উপর আরেকটা বড় সত্য আছে। সেটা বাংগালী জাতির অস্তিত্ব। বাংগালী জাতির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নির্ভর করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের উপর। ফযলুল হক এই ঐক্যের প্রতীক। আমি কংগ্রেসীদের ভারতীয় জাতীয়তা বুঝি না। আমি বুঝি বাংগালীর জাতীয়তা। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠা করতে পারে একমাত্র ফযলুল হক। ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাংগালী। সেই সংগে ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান। খাঁটি বাংগালীত্বের সাথে খাঁটি মুসলমানত্বের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। ফযলুল হক আমার ছাত্র বলে এ কথা বলছি না। সত্য বলেই এ কথা বলছি। খাঁটি বাংগালীত্ব ও খাঁটি মুসলমানত্বের সময়ই ভবিষ্যৎ বাংগালীর জাতীয়তা। ফযলুল হক ঐ সময়ের প্রতীক। এ প্রতীক তোমরা ভেংগে না। ফযলুল হকের অমর্যাদা তোমরা করো না। শোন মনসুর আমি বলছি, বাংগালী যদি ফযলুল হকের মর্যাদা না দেয়, তবে বাংগালীর বরাতে দুঃখ আছে।”
কথাগুলি আচার্য রায় আমার চেয়ে সমবেত অধ্যাপক ও ছাত্রদের উদ্দেশ্য করিয়াই বলিয়াছিলেন বেশি। তাঁর কথাগুলি কোনও ব্যক্তির মুখ হইতে আসিতেছিল না। আমার মনে হইতেছিল কথাগুলি ভবিষ্যৎ বাণীর মতই বাহির হইতেছিল কোন গায়েবী ‘অরেকলের’ মুখ হইতে। আমি ভিতরে ভিতরে একেবারে মুষড়াইয়া গেলাম। মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে কাজ করিবার উৎসাহ উদ্যম একেবারে হিম হইয়া গেল। আচার্য দেবকে কি একটা কৈফিয়ৎ দিয়া আমি ধীরে ধীরে বাহিরে আসিলাম। সারা রাস্তায় আমার কানে ও মনে আচার্য রায়ের কথাগুলি ঝংকৃত হইতে থাকিল। আজও এই ত্রিশ বছর পরেও সেই সব কথা আমার মনে ঝংকৃত হইতেছে। এটা কি ছিল দার্শনিক মানব প্রেমীর ভাবাবেগ? না, বিজ্ঞানীর বাস্তব-দর্শন? যখনই দেশ ও জাতির কথা, জনগণের কথা, ভাবিতে চাই তখনই এই দুই মহাপুরুষের মুখ আমার চোখে ভাসিয়া উঠে। কি করিতে গিয়া কি করিয়াছিলাম! আচার্য রায়ের নির্দেশ পার্টি নেতাদের কাছে। বলিয়াছিলাম বোধ হয়। কিন্তু কেউ বোধ হয় কানে তুলেন নাই।
৩. হক মন্ত্রিসভার কৃতিত্ব
আচার্য রায়ের মত শ্রদ্ধেয় ও প্রভাবশালী বিজ্ঞানীর এই অভিমত আমার মত অনেক হিন্দু নেতাকেও নিশ্চয়ই প্রভাবিত করিয়াছিল। যা হোক, কলিকাতার মুসলিম জনমত আমাদের বিরুদ্ধে একেবারে ক্ষিপ্ত হইয়া ফাটিয়া পড়িয়াছিল। অবশ্য একথাও ঠিক তারা যে যতটা ক্ষিপ্ত হইয়াছিল, ডিমনস্ট্রেশন হইয়াছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। শহীদ সাহেবের মত সংগঠনী প্রতিভা মিছিল-প্রসেশন দিয়া একেবারে কলিকাতা মাথায় তুলিয়া লইয়াছিলেন। এমনি এক উত্তেজিত সংঘবদ্ধ জনতা অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আমাকে আক্রমণ করিয়া আহত করিয়াছিল। আহত অবস্থায় আমরা পার্শবর্তী বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। ক্ষিপ্ত জনতা সে বাড়ি ঘেরাও করিল। অল্পক্ষণ পরেই হক সাহেব, নবাব হবিবুল্লাহ ও সার নাযিমুদ্দিন আসিয়া আমাদিগকে জনতার হাত হইতে রক্ষা করেন। আমাদের মধ্যে অকৃতজ্ঞ কেউ কেউ বলিতে লাগিলেন : ‘উহারাই আমাদের পিটাইবার জন্য আগে লোক পাঠাইয়া দিয়াছেন এবং পরে আমাদের রক্ষা করিতে আসিয়াছেন।‘ কৃষক-প্রজা পার্টির মেম্বারদের পক্ষে কলিকাতার রাস্তা-ঘাটে চলাফেরা বিপজ্জনক হইয়া পড়িল। অনাস্থা প্রস্তাব আলোচনার জন্য আইন পরিষদের বৈঠকের একদিন আগে হইতেই সমস্ত অপযিশন মেম্বরকে আইন পরিষদের দালানে স্থান দেওয়া হইল। এত করিয়াও আমরা হারিয়া গেলাম। হক মন্ত্রিসভা টিকিয়া গেল।
অনাস্থা-প্রস্তাবের ফলে একটি লাভ ও দুইটি অনিষ্ট হইল। লাভ হইল এই যে দেশের কিছু কাজ হইল। যে মন্ত্রিসভা বিশেষ কিছু কাজ না করিয়া প্রায় বছর কাল সময় কাটাইয়াছিল, তারাই ঝট পট করিয়া কতগুলি ভাল কাজ করিয়া ফেলিল। ১৯৩৮ সালের মধ্যেই সালিশী বোর্ড স্থাপন শেষ হইল। ১৯৩৯ সালের মধ্যে কৃষক প্রজার দাবি মত প্রজাস্বত্ব আইন পাস হইল ও মুসলিম লীগের দাবি মত কলিকাতা মিউনিসিপাল আইন সংশোধন করিয়া কর্পোরেশনে পৃথক নির্বাচন প্রথা প্রবর্তন করা হইল। ১৯৪০ সালের মধ্যে মহাজনি আইন পাস হইয়া গেল। সালিশী বোর্ড প্রজাস্বত্ব আইন ও মহাজনি আইনে বাংলার কৃষক-প্রজা ও কৃষি-খাতকদের জীবনে এক শুভ সূচনা হইল। তারা কার্যতঃ আসন্ন মৃত্যুর হাত হইতে বাঁচিয়া গেল। ফলে হক মন্ত্রিসভার এই দুই-তিনটা বছরকে বাংলার মুসলমানদের জন্য সাধারণভাবে, কৃষক প্রজা-খাতকদের জন্য বিশেষভাবে, একটা স্বর্ণ যুগ বলা যাইতে পারে।
এই কৃতিত্বের বেশির ভাগ প্রাপ্য সাধারণভাবে অপযিশনের বিশেষভাবে কৃষক প্রজা মেম্বর ও কর্মীদের। মেম্বররা ঐ অনাস্থা প্রস্তাব না দিলে এবং কর্মীরা বাইরে আন্দোলন না করিলে এই সব কাজ অত সহজে হইত না। মুসলিম লীগ মন্ত্রীদের মধ্যে এক শহীদ সাহেব ছাড়া আর সবাই ছিলেন জমিদার। তাঁদের চেষ্টায় বা ষড়যন্ত্র হক সাহেব প্রধানমন্ত্রী হইয়াও অসহায়। সামসুদ্দিন সাহেব গোড়াতেই বাদ পড়ায় এবং নওশের আলী সাহেব অল্পদিনের মধ্যে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করিতে বাধ্য হওয়ায়, এবং অবশেষে হক সাহেব মুসলিম লীগে যোগ দেওয়ায় বাংলার এই মন্ত্রিসভা সত্য-সত্যই জমিদার সমর্থিত মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা হইয়া গিয়াছিল। কৃষক-প্রজার জন্য সত্যিকার কোনও কাজ হওয়া এই মন্ত্রিসভার দ্বারা কার্যত অসম্ভব ছিল। তেমন অবস্থায় এই অনাস্থা প্রস্তাবই মন্ত্রিসভার টনক নড়াইয়াছিল।
