কৃষক-প্রজা পার্টির কৃষক সমাজের পুঞ্জীভূত অভিযোগের সংগে কংগ্রেসের রাজনৈতিক বন্দী-মুক্তির প্রশ্নটা যোগ দিল। শহরে-মফস্বলে, রাস্তা-ঘাটে, হাটে বাজারে হক মন্ত্রিসভার নিন্দায় আকাশ-বাতাস মুখরিত হইতে লাগিল। কৃষক-প্রজা নেতা হক সাহেবের মন্ত্রিসভাকে জমিদার-মন্ত্রিসভা আখ্যা দেওয়া হইল। কথাটা সত্যও বটে। কারণ দশজন মন্ত্রীর মধ্যে ছয় জনই জমিদার। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৮ সালের এপ্রিলে বাজেট সেশনেই হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়া হইল। আশা করা গিয়াছিল হক মন্ত্রিসভার পতন অবশ্যম্ভাবী।
কিন্তু এই অনাস্থা প্রস্তাবই হক মন্ত্রিসভার শাপে বর হইল। ইহাতে মন্ত্রিসভার অন্তর্বিরোধই যে শুধু দূর হইল তা নয়, অন্ততঃ মুসলিম জনমতের মোড় ঘুরিয়া গেল। একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। মরহুম হাকিম মসিহুর রহমানের সাহেবের পুত্র হাকিম শামসুযযামানের ধর্মতলাস্থ ডিসপেনসারি আমাদের আড্ডা ছিল। এই খানে বসিয়া আমরা হক মন্ত্রিসভার মুন্ডপাত করিতাম। হাকিম সাহেব স্বয়ং হক সাহেবের নিন্দায় সবচেয়ে বেশি গলায় ছিলেন। অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়ার পর তার সাফল্যের চেষ্টায় আমি কলিকাতায় আসিয়াছি। বরাবরের অভ্যাস মত হাকিম সাহেবের ডিসপেনসারিতে গেলাম। হাকিম সাহেব আমাকে দেখামাত্র বলিলেন : হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়া কৃষক-প্রজা পার্টি ঘোরর অন্যায় কাজ করিয়াছে। আমাকে অবিলম্বে এ কাজে পার্টিকে বিরত করিতে হইবে। আমি বিস্মিত হইয়া চলিলাম : আপনে এটা কি কইতেছেন? হক মন্ত্রিসভার নিন্দায় আপনে ত আমার চেয়ে অনেক বেশি যান। হাকিম সাহেব কিছুমাত্র অপ্রস্তুত না হইয়া বলিলেন : ‘ঠিক। এখনও তা করি। হক মন্ত্রিসভাকে আমি চাবুক মারতে চাই। কিন্তু আপনারা যে চাবুক ফেলে বন্দুক ধরেছেন।’
এই একটি মাত্র কথার মধ্যে হক মন্ত্রিসভার প্রতি মুসলিম জনমত প্রতিবিম্বিত হইয়াছে। ট্রেন-বাসের যাত্রীরা চা-খানার আলাপীরা এই কথাই বলিয়াছে। হক সাহেবের মন্ত্রিসভা আদর্শ মন্ত্রিসভা নয়, এ কথা সত্য কিন্তু এটা ভাংগিলে এর চেয়ে ভাল মন্ত্রিসভা হইবে না। যা হইবে তা এর চেয়ে খারাপ হইবে। তা হইবে পুরাপুরি। জমিদার মন্ত্রিসভা এই ধারণা জনসাধারণের মধ্যে সার্বজনীন হইয়া পড়িয়াছিল। তর্ক করিলে বলা হইত ও ‘হক মন্ত্রিসভা কৃষক-প্রজার কোন হিত করিতেছে না ঠিক, কিন্তু অহিতও কিছু করিতেছে না। এটাও কম কথা নয়’ এটাই ছিল সাধারণভাবে মুসলিম জনমত।
২. আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের ভবিষ্যদ্বাণী
হিন্দু জনমতের এক অংশ যে হক মন্ত্রিসভার সমর্থক তার প্রমাণ পাইলাম আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের দরবারে। আমি আচার্য রায়ের একজন অনুরক্ত ভক্ত ছিলাম। বিজ্ঞানের এক হরফ না জানিয়াও আমি আচার্য রায়ের একজন স্নেহের পাত্র ছিলাম। কলিকাতা ছাড়ার পরেও আমি সুযোগ পাইলাম আচার্য রায়ের বিজ্ঞান কলেজস্থ আস্তানায় হাযির হইতাম। ৯২ নং আপার সার্কুলার রোডস্থ বিজ্ঞান-কলেজের বিশাল ইমারতের পিছন দিককার একটি কামরাই ছিল এই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর বাসস্থান। একটি দড়ির খাঁটিয়াই ছিল তাঁর শয়ন-শয্যা। এতে তিনি অর্ধশায়িত থাকিয়া ভক্তগণকে উপদেশ দিতেন। খাঁটিয়ার সামনে মেঝেয় পাতা থাকিত একটা বিশাল শতরঞ্জি। সর্বোচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী ভক্তেরা এই শতরঞ্জিতে বসিয়াই তাঁর কথা শুনিতেন। আমিও তাঁদের মধ্যে বসিয়া গুরুদেবের উপদেশ শুনিতাম। আচার্য রায়ের কাজ ও চিন্তা-ধারার একটা দিক আমাকে মোহবিষ্ট করিয়াছিল। আচার্য রায় ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর মতই নির্বিলাস ‘প্লেইন লিভিং হাই থিংকিং’-এর চিন্তা-নায়ক। তবু আচার্য রায়ের নৈকট্য ও সান্নিধ্য আমার কাছে যেমন অনির্বচনীয় আকর্ষণীয় ছিল, মহাত্মাজীর নৈকট্যও তেমনি ছিল না। মহাত্মাজীর কঠোর বৈরাগ্যের দরবারের আবহাওয়ার মধ্যেও যেন এটা কৃত্রিম রাজকীয়তা বোঝার মত আমার বুকে পীড়া দিত। আচার্য রায়ের দরবারে এই কৃত্রিমতা আমি অনুভব করিতাম না। তার বদলে আমি যেন কল্পনায় প্রাচীনকালের মুনি-ঋষির তপোবনের শান্ত-শীতলতায় ডুবিয়া যাইতাম। তাঁর মত লোকের স্নেহ পাইবার কোনও যোগ্যতা বা অধিকার আমার ছিল না। তবু আমার প্রতি তাঁর অতিরিক্ত নেহাদর তাঁর অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বস্ত ছাত্রকেও বিস্মিত করিয়া দিত। অন্য কেউ তাঁকে যে কাজে– রাযী কইতে পারেন নাই, আমি তাঁকে অনেকবার তেমন কাজে রাযী করাইয়াছি। অসুস্থতাহেতু তিনি যে সব সভায় যাওয়া বাতিল করিয়াছেন, তার অনেক গুলিতে আমি গিয়া তাঁকে ধরিয়া আনিয়াছি। ১৯৩০ সালে আলবার্ট হলে নয়রুল-অভ্যর্থনার সভা ছিল এমনি একটি উপলক্ষ্য। উদ্যোক্তাদের সকলের এবং বিজ্ঞান কলেজের অধ্যাপকদের সমবেত চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আমি গিয়া আচার্য রায়কে ধরিয়া আনি। তিনি আমার কাঁধে তর করিয়া সভায় যোগ দেন।
১৯৩৮ সালে এপ্রিল মাসে আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশনে হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে কৃষক-প্রজা পার্টির পক্ষ হইতে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করা হয়। কংগ্রেস দল এক বাক্যে তা সমর্থন করে। দেশময় হৈ চৈ। কলিকাতা গরম। রেলে-ট্রামে হোটেল চাখানায় তুমুল বাদবিতন্ডা। এই সময় আমি একদিন আচার্য রায়ের দরবারে হাযির। আমাকে দেখিয়াই তিনি বলিলেন : ‘শোন মনসুর, আমি রাজনীতি বুঝি না। রাজনীতিক ব্যাপারে নাকও গলাই না কিন্তু আমার অনুরোধ হক মিনিস্ট্রির বিরুদ্ধে তোমরা যে অনাস্থা দিয়েছে, অবিলম্বে তা প্রত্যাহার কর।‘
