৮. বাস্তববাদী জিন্নাহ
এই সার্বিক বিভ্রান্তি-বিরোধের অন্ধকার যুগে যে একজন মাত্র লোক বাস্তববাদীর দৃষ্টিকোণ হইতে সকল অবস্থায় হিন্দু-মুসলিম আপোসের কথা বলিয়াছিলেন, তিনি ছিলেন মিঃ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর মৈত্রী প্রচেষ্টার যে বিশেষ দিকটা তৎকালে আমরা বুঝিতে পারি নাই এবং পরবর্তীকালে পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছিল, তা এই যে তিনি শুধু মুসলমানদের অধিকারের কথা বলেন নাই, তাদের দায়িত্বের কথাও বলিয়াছেন। আরও স্পষ্ট ভাষায় বলিতে গেলে বলিতে হয় তিনিই একমাত্র মুসলিম নেতা যিনি মুসলমানদের বিদেশ-মুখিতা হইতে স্বদেশমুখী করিয়াছেন। কংগ্রেসের বাইরে তিনিই একমাত্র মুসলিম নেতা যিনি মুসলমানদের ইংরেজ বিরোধিতায় কংগ্রেসের পাশাপাশি রাখিয়াছিলেন। নিজেদের অধিকারের জন্য হিন্দুদের বিরুদ্ধে লড়িবার সংগে সংগে দেশের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার জন্য ইংরাজের সহিত সংগ্রামে তিনিই মুসলমানদের আগাইয়া নিয়াছেন। জিন্না সাহেবের এই রাষ্ট্রদর্শনের সবটুকু ব্যক্তিগতভাবে আমি তখনও বুঝি নাই, একথা সরলভাবে স্বীকার করিতেছি। এই কারণে আমি কখনও-কখনও তাঁর ভক্ত সমর্থকও যেমন ছিলাম, আবার কখনও কখনও তেমনি কঠোর সমালোচকও ছিলাম। যে সময় এবং যে কাজে তাঁর সমর্থন করিয়াছিলাম, তাও করিয়াছি তাঁর খাতিরে নয় কংগ্রেসের খাতিরে। অর্থাৎ যে-যে। কাজে কংগ্রেসের সাথে তাঁর মিল ছিল, যখন-যখন তিনি কংগ্রেসের নীতির সমর্থন করিয়াছিলেন, কংগ্রেসের সাথে সাথে সংগ্রাম করিয়াছেন, যখন-তখন তিনি মুসলিম .নাইট-নবাব ইত্যাদি খেতাবধারীকেইংরাজের পো-ধরা বলিয়া গাল দিয়াছেন, তখন–তখন আমি পরম উৎসাহে তার সমর্থন করিয়াছি। পক্ষান্তরে যখন তিনি কংগ্রেসের বিরোধিতা করিয়াছেন, তখন আমিও তাঁর বিরোধিতা করিয়াছি। লাখনৌ-প্যাকট গ্রহণ হইতে শুরু করিয়া সাইমন কমিশন বয়কট ও ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে হিন্দু প্রধান প্রদেশগুলিতে কংগ্রেস-লীগ নির্বাচনী মৈত্রী পর্যন্ত সব কাজই আমার আন্তরিক সমর্থন পাইয়াছে। পক্ষান্তরে ১৯২১ সালে যখন তিনি কংগ্রেসের খিলাফত ও অসহযোগ নীতির প্রতিবাদে কংগ্রেস ত্যাগ করেন তখন আমি তাঁর উপর মনে মনে ক্রুদ্ধ হইয়া উঠি। খিলাফত আন্দোলনকে যখন তিনি অবস কিউরেন্টিস্ট ধর্মীয় গোড়ামি আখ্যা দেন, আর রাজনীতিতে ধর্ম আমদানির দোষারোপ করেন, তখন আমি তার মুসলমানী ঈমানেই সন্দেহ করিয়া বসি এবং তিনি যে শিয়া সেকথাও স্মরণ করি। পক্ষান্তরে তিনি যখন গান্ধীজীর হরিজন অস্পৃশ্যতা ও গো-রক্ষা নীতিকে অবস্ কিওরেন্টিস্ট ধর্মীয় গোড়ামি বলিয়া নিন্দা করেন এবং রাজনীতিতে ধর্মের আমদানির বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন তখন আমার বিশ্বাস ও মতবাদে একটা প্রচন্ড ঝকি লাগে। জিন্না সাহেবের অভিমতের একটা দাম আছে বলিয়াও আমার মনে হয়। কিন্তু এটাই যে সেকিউলারিযম বা ধর্ম-নিরপেক্ষ রাজনীতি তখনও তা বুঝি নাই।
মোট কথা, এই যুগের রাজনীতির মধ্যে তেসরা দশকের আগেরও চৌথ দশকের শেষ দিকে কয়েক বছর ছাড়া জিন্না সাহেবের ব্যক্তিগত নেতৃত্ব দেখিতে কুয়াশাচ্ছন্ন থাকা সত্ত্বেও আসলে কিন্তু তা ছিল না। গান্ধীজী ও আলী ভাইর চান-সুরুজের মত প্রখর চাকচিক্যপূর্ণ সর্বগ্রাসী ব্যক্তিত্ব ও দৈত্যের মত দুঃসাহসিক নেতৃত্ব দেশবাসীর হৃদয় এমনভাবে জয় করিয়াছিল যে জিন্না সাহেবকে এই মুদতে কিছুদিনের জন্য দেশে ও বিদেশে রাজনৈতিক নির্বাসন যাপন করিতে হইয়াছিল। কিন্তু পরবর্তী কালের ইতিহাস প্রমাণ করিয়াছে যে, এই যুগেও তিনি তাঁর চির জীবনের স্বপ্নসাধ হিন্দু মুসলিম আপোসের ভিত্তিতে ভারতীয় রাজনীতিতে একটা সুস্থতা আনিবার চিন্তাতেই নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু আমি তৎকালে অত গভীরে তলাইয়া দেখি নাই। তার কয়েকটি কারণ ছিল। আমি বাংলার রাজনীতিকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করিতাম, ভারতীয় রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করিতাম না। ওটাকে বরং আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ মনে করিতাম। বাংলায় মুসলিম মেজরিটি ছিল বলিয়াই বোধ হয় আমি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধী ছিলাম। জমিদারি উচ্ছেদকে বাংলার গণ-মুক্তির বুনিয়াদ ও কৃষক-প্রজা সমিতিকে বাংলার ভবিষ্যৎ জাতীয় প্রতিষ্ঠান মনে করিতাম। জিন্না সাহেব এই দুইটা মৌলিক ব্যাপারেই ভিন্নমত পোষণ করিতেন। তাঁর রাজনীতিও ছিল স্বভাবতঃই নিখিল ভারতীয়।
১২. কৃষক-প্রজা পার্টির ভূমিকা
কৃষক-প্রজা পার্টির ভূমিকা
বারই অধ্যায়
১. হক মন্ত্রিসভায় অনাস্থা
হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে কৃষক-প্রজা-কর্মীদের অসন্তোষের ফলে ক্রমে সকল শ্রেণীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিল। মন্ত্রীদের অন্তর্বিরোধের বিভিন্ন খবর সংবাদপত্রে বাহির হইতে লাগিল। শেষ পর্যন্ত মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী সাহেবের সহিত মন্ত্রিসভার বিরোধ বাধিল। কিন্তু নওশের আলী সাহেব পদত্যাগ করিতে অস্বীকার করায় হক সাহেব নিজেই পদত্যাগ করিয়া নওশের আলীকে বাদ দিয়া পুনরায় দশজন মন্ত্রীর মন্ত্রিসভা গঠন করেন ১৯৩৭ সালে অক্টোবর মাসে। ফলে হক সাহেব ছাড়া তাঁর মন্ত্রিসভায় কৃষক-প্রজা পার্টির কেউ রহিলেন না। এইভাবে বৎসরাধিক কাল চলিয়া গেল। কৃষক-প্রজার কোন কাজই হইল না। ক্লাউড কমিশন গঠন করিয়া জমিদারি উচ্ছেদের প্রশ্নটা শিকায় তুলা হইল। এমনকি ১৯৩৫ সালে পাস-করা প্রাথমিক শিক্ষা আইন ও ১৯৩৬ সালের পাস-করা কৃষি-খাতক আইনটি পর্যন্ত প্রয়োগ করা হইল না।
