এই ঘটনাটিই ঘটে ১৯৩৭ সালে হক মন্ত্রিসভা গঠনের সময়। এই কারণেই আমি এ সম্পর্কিত খুটিনাটি বিবরণ দেওয়া দরকার মনে করিয়াছি। হক মন্ত্রিসভা গঠনের সময় বাংলার কংগ্রেসের নেতৃত্ব ঐ অবাস্তব ও অদূরদশী মনোভাব গ্রহণ করার ফলে হক সাহেব তথা প্ৰজাপার্টির মুসলিম লীগের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। এর পরে হক সাহেবের তথা গোটা মুসলিম বাংলার লীগে যোগদান করা এবং প্রজাপার্টির মৃত্যু ঘটা ঐতিহাসিক ঘটনা-স্রোতেই অনিবার্য হইয়া পড়িয়াছিল। বস্তুতঃ বাংলার নিজস্ব রাজনীতির অবসান ঐদিনই ঘটিয়াছিল।
হিন্দু-মুসলিম-সম্পর্কের এই তিক্ততার জন্য শুধু হিন্দুদেরেই দায়ী করিলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হইবে। ১৯২৮ সালে বাংলার হিন্দু-মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক সভায় সার আবদুর রহিম ও ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের মধ্যে যে কথা কাটাকাটি হইয়াছিল সেদিক পাঠকদের দৃষ্টি আবার আকর্ষণ করিতেছি। ঐ সভায় ডাঃ রায় বলিয়াছেন : ‘মুসলমানরা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয় না; শুধু প্রতিনিধিত্ব ও চাকরি-বাকরিতে অংশ চায়। সার আবদুর রহিম অবশ্যই সে কথার জবাব দিয়াছিলেন। কিন্তু একটু ধীরভাবে বিচার করিলে স্বীকার করিতে হইবে, ডাঃ রায়ের ঐ অভিযোগ ভিত্তিহীন ছিল না। বস্তুতঃ আইন সভায় প্রতিনিধিত্ব ও সরকারী চাকুরিতে মুসলমানদের দাবি-দাওয়া মানিয়া লওয়ার ব্যাপারে হিন্দু-নেতৃত্বের কৃপণতার ও শাির যথেষ্ট কারণ ছিল। ডাঃ রায়ের কথাটা তাঁর ব্যক্তিগত মত ছিল না। ওটা ছিল সাধারণভাবে হিন্দুদের এবং বিশেষভাবে কংগ্রেসের নেতৃত্বের অভিযোগ। এমন যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তিনি পর্যন্ত বলিয়াছেন : ‘দেশকে ভাল না বাসিয়া দেশের স্বার্থে কোনও কাজ না করিয়া মুসলমানরা শুধু ফললাভে সিংহের ভাগ বসাইতে চায়।‘ ‘সিংহের ভাগ’ কথাটা অতিশয়োক্তি কিন্তু মোটের উপর কথাটা সত্য। ঐতিহাসিক যত কারণ ও পারিপার্শ্বিক যত যুক্তিই থাকুক না কেন, এই যুগের বাস্তব অবস্থা ছিল এই যে মুসলমানরা সাধারণভাবে ও শিক্ষিত সম্প্রদায় বিশেষভাবে নিজেদের মাতৃভূমিকে আপন দেশ মনে করি না। তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কামে-কাজে এটা মনে হওয়া মোটই অযৌক্তিক ছিল না যে মুসলমানরা নিজের দেশের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম, দেশগুলিকেই বেশি আপন মনে করে। প্রথমতঃ মুসলমানদের কোনও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক চিন্তা-ধারা ছিল না। যদি কিছু থাকিয়া থাকে সেটা ছিল প্যানইসলামিযম। ‘মুসলিম হায় হাম সারা জাহী হামরা’ই যেন ছিল তাদের সত্যকার রাষ্ট্র-দর্শন। ১৯২০-২১ সালে খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলন যে ভারতীয় মুসলমানদের একটা অভূতপূর্ব। গণ-আন্দোলনে পরিণত হইয়াছিল, সেটা খিলাফত ও তুর্কী সাম্রাজ্যের জন্য যতটা ছিল, ভারতের স্বরাজ্যের জন্য ততটা ছিল না। এটা হাতে-নাতে প্রমাণিত হইল দুই বছরের মধ্যে। ১৯২৩ সালে কামাল পাশা যখন খলিফাঁকে দেশ হইতে তাড়াইয়া খিলাফতের অবসান ঘোষণা করিলেন, তখনই ভারতের মুসলমানদের উৎসাহে ভাটা পড়িল। খিলাফত কমিটি মরিয়া গেল, মুসলমানরা কংগ্রেস ছাড়িয়া দিল। এতে তারা এটাই বুঝাইল যে খিলাফতই যখন শেষ হইয়া গেল, তখন দেশের স্বাধীনতায় তারা আর ইন্টারেস্টেড নয়।
৭. মুসলিম রাজনীতির বিদেশ-মুখিতা
এটার না হয় রাজনৈতিক কারণ ছিল। কিন্তু জন-সেবার মধ্যে ত কোনও রাজনীতি আসিবার কথা নয়। সেখানেও মুসলমানদের মনোভাব ছিল বিদেশ-মুখী। মুসলমানদের মধ্যে ধনী ও দানশীল লোকের খুব বেশি অভাব ছিল না। কিন্তু সারা ভারতে মুসলমানদের ব্যক্তিগত দানে একটা হাসপাতাল বা কলেজ স্থাপনের নযির নাই। সমস্ত দানশীলতা এদের মসজিদ নির্মাণে সীমাবদ্ধ। ওটাও নিশ্চয়ই মুসলিম জনতার সুবিধার জন্য ততটা ছিল না যতটা ছিল সওয়াব হাসিল করিয়া নিজে বেহেশতে যাইবার উদ্দেশ্যে। নৈসর্গিক বিপদ-আপদেও তারা অর্থ-সাহায্য যে না করিতেন তা নয়। কিন্তু সেটাও দেশে নয় বিদেশে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হইতেই বলিতেছি। এই বাংলাতেই মুসলিম প্রধান এলাকাতে যদি বন্য-মহামারী হইত, তবে তার রিলিফের কাজেও হিন্দুদাতাদের উপরই নির্ভর করিতে হইত; মুসলমান দাতারা থলির মুখ খুলিতেন না। হাজারের মধ্যে একটা নযির দেই। উত্তর বাংলার এক বিশাল এলাকার বন্যা হইয়া প্রায় আশি লক্ষ লোক বিপন্ন হইল। ইহাদের বিপুল মেজরিটি ছিল মুসলমান। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের নেতৃত্বে সংকট-ত্রাণ সমিতির প্রায় কোটি টাকা চাঁদা তুলিয়া বহুদিন পর্যন্ত এই এলাকায় রিলিফ চালাইল। এই সমিতির বেঘসেবক হিসাবে কাজ করিয়া আমরা কলিকাতার ধনী মুসলমানদের নিকট উল্লেখযোগ্য কোনও চাঁদা পাই নাই। কিন্তু এর কিছুদিন পরে তুরস্কের আনাতোলিয়ার ভূমিকম্পের দুর্গতের রিলিফের জন্য মোহাম্মদ আলী পার্কের এক জনসভাতেই তিন লাখ টাকা চাঁদা উঠাইয়াছিল। ফলে হিন্দু প্রতিবেশী ত দূরের কথা কোন নিরপেক্ষ বিদেশী পর্যটকেরও এই সময়ে মুসলমানদের ব্যবহারে মনে হইত এরা ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভালমন্দের চেয়ে মধ্য প্রাচ্যের মুসলিম জাহানের ভাল-মন্দের কথাই বেশি চিন্তা করে। এই ভাব-গতিক দেখিয়া হিন্দু নেতৃবৃন্দের এমন সন্দেহ হওয়াও বিচিত্র বা অযৌক্তিক ছিল না যে মুসলমানদের দাবি-দাওয়া-মত চাকরি-বাকরি দিলেও তারা ভারতের রাজনৈতিক অধিকারের জন্য লড়িবার বদলে ইংরাজ সরকারকেই সমর্থন করিবে। এটা আরও বেশি সম্ভব মনে হইত এই জন্য যে এই মুদতে মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব মোটের উপর ছিল নাইট-নবাব ও খান বাহাদুরদের হাতে। এরা বিশ্বাস করিতেন এবং খোলাখুলি বক্তৃতা বিবৃতিতে বলিতেনও যে যতদিন এদেশে ইংরাজ আছে ততদিনই আমরা বাঁচিয়া আছি। ইংরাজ চলিয়া যাওয়ার সাথে সাথে হিন্দুরা আমাদেরে শেষ করিয়া ফেলিবে। হিন্দু নেতা সরকারী কর্মচারী ও উকিল মোখতারাদি ব্যবসায়ী এবং সর্বোপরি জমিদার-মহাজনদের অদূরদশী ব্যবহারে মুসলমানের এই সন্দেহ আরও দৃঢ় হইত। বাস্তবে প্রমাণিত হইত। মোট কথা ভারতের মুসলমানরা এই যুগে ছিল কার্যতঃ একটা দেশহীন ধর্মসম্প্রদায় মাত্র। নিজের দেশকে অবস্থা-বৈগুণ্যে এরা হিন্দুর দেশ মনে করিত। কেউ কেউ এই ‘দারুলহর্ব’ ছাড়িয়া পশ্চিমে ‘দারুল ইসলামে’ হিজরত করিবার কথাও ভাবিতেন। কাজেই এই ‘হিন্দুর দেশ’ হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা বা অর্থনৈতিক উন্নতির কথা তাঁরা ভাবিতে যাইবেন কেন? এই দেশ যে তাঁদের, এই দেশ শাসন করিবার অধিকার ও এই দেশের কল্যাণ সাধনের দায়িত্ব যে তাঁদের, তাঁদেরই ভাইয়েরা যে কৃষক-মদুর হিসাবে দেশের খোরাকি ও অন্যান্য সম্পদ সৃষ্টি করিতেছে মাথার ঘাম পায় ফেলিয়া, একথা যেন তাঁদের মনেই পড়িত না। কাজেই দেশগপ্রাণ, দেশের জন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তৃত, পরাধীনতার জ্বালায় দগ্ধ এবং স্বাধীনতা-সংগ্রামেলিও হিন্দুরা যদি মুসলমান নেতাদের দেশপ্রেমে সন্দেহ করিয়া থাকে, তবে তাদের দোষ দেওয়া যায় না।
