৫. প্রজা আন্দোলনের স্বরূপ
এটা বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। কারণ ব্যাপারটা অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজ জীবনের সকল খুটিনাটিতেও এই পার্থক্য পবিত, প্রকটিত ও প্রতিফলিত হইয়াছিল। বাংলার মুসলমানদের নিজের আন্দোলন বলিতে ছিল একমাত্র প্রজা-আন্দোলন। তিতুমীর পীর দুদু মিয়া ও ফকির আন্দোলনের ঐতিহাসিক পুরাতন নযির টানিয়া না আনিয়াও বলা যায়, বাংলার প্রজা-আন্দোলন খিলাফত-স্বরাজ আন্দোলনেরই দশ বছর আগেকার আন্দোলন। আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা হইতেই বলিতে পারি, এ আন্দোলন গোড়ায় ছিল মুসলমানদের সামাজিক মর্যাদার দাবি। শুধু হিন্দু জমিদাররাই মুসলমান প্রজাদিগকে তুই-তুংকার করিয়া অবজ্ঞা করিতেন এবং তাঁদের কাঁচারিতে ও বৈঠকখানায় এদের বসিতে আসন দিতে অস্বীকার করিতেন, তা নয়। তাঁদের দেখাদেখি তাঁদের আমলা-ফয়লা তাঁদের আত্মীয়স্বজন, তাঁদের ঠাকুর-পুরোহিত, তাঁদের উকিল-ডাক্তাররাও মুসলমানদের নিজেদের প্রজা ও সামাজিক মর্যাদায় নিম্নস্তরের লোক মনে করিতেন। এটা জমিদারপ্রজার স্বাভাবিক সাধারণ সম্পর্ক ছিল না। ছিল হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক। কারণ একদিকে বামন-কায়েত প্রজারা জমিদারের কাছারি বৈঠকখানায় বসিতে পাইত। অন্যদিকে বর্ণ হিন্দুর কাছে অমন নিগৃহিত হইয়াও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু তালুকদার বা ধনী মহানজরাও মুসলমানদের সাথে বর্ণহিন্দুদের মতই ব্যবহার করিত।
এইভাবে ব্যবহারিক জীবনে বাংলার হিন্দু ও মুসলমানরা ছিল দুইটি পৃথক সমাজ, ভিন্ন জাত ও স্ব সম্প্রদায়। এদের মিশ্রণে এক সম্প্রদায় ছিল কল্পনাতীত। বিরাট ধর্মীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না। হিন্দুর দিক হইতেও না মুসলমানের দিক হইতেও না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন যে এই দুই সম্প্রদায়ের স্বান্ত বজায় রাখিয়া হিন্দু-মুসলিম ফেডারেশন করিতে চাহিয়াছিলেন, সেটা মুসলমানের চেয়ে হিন্দুর মনের দিকে কম চাহিয়া নয়। এটাই ছিল রাজনৈতিক বাস্তববাদ। অধিকাংশ হিন্দুনে দেশবন্ধুর এই বাস্তব দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন না বলিয়াই তাঁর অবর্তমানে বাংলার মুসলমানরা কংগ্রেস ছাড়িয়া প্ৰজা-পার্টি গঠন করিয়াছিল। সকল দলের সকল মতের এমনকি পরস্পর বিরোধী মতের মুসলমানরা যে ১৯২১ সালে সার আবদুর রহিমের নেতৃত্ব প্রজা-সমিতি গঠন করেন এবং কংগ্রেসী-অকংগ্রেসী জেল-খাটা প্রমহী ও খেতাবধারী মডারেটরা এক পার্টিতে মিলিত হইতে পারেন, এটা বাহির হইতে বিশ্বয়কর মনে হইলেও আসলে তা ছিল না। এক বছর আগে বাংলার আইন পরিষদে কংগ্রেসী হিন্দু মেষরাই প্রজাস্বত্ব বিলের ভোটাভুটিতে এই সাদায়িক কাতারবন্দি এলাইনমেন্ট করিয়া সেই পথ প্রদর্শন করিয়াছিলেন। সে বিলে কংগ্রেসী-অকশ্রেণী প্রজা-জমিদার সব হিন্দু জমিদারের পক্ষে এবং কংগ্রেসী-অকংগ্রেসী প্রজা-জমিদার সব মুসলমান প্রজার পক্ষে ভোট দিয়াছিলেন। তাই প্রজা-সমিতি নামে ও রপে অসাম্প্রদায়িক হইলেও উপরোক্ত কারণে উহা ছিল আসলে বাংলার মুসলিম প্রতিষ্ঠান। বক্তৃত প্রজা-সমিতি গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা মওলানা মোহামদ আকরম খাঁ আমাদেরে বলিয়াই ছিলেন : “হিন্দুরা যেমন অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেস নামে হি-প্রতিষ্ঠান চালায়, আমরাও তেমনি অসাম্প্রদায়িক প্রজা-সমিতি নামে মুসলিম প্রতিষ্ঠান চালাইব।” দশ বছর পরে তারই স্থান দখল করে মুসলিম লীগ খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক নামে ও দাবিতে। হিন্দুদের অনেকেই যে প্রজা-আন্দোলনকে আসলে সাম্প্রদায়িক আন্দোলন বলিতেন, সেটা নিতান্ত মিথ্যা অভিযোগ ছিল না। আগেই বালিয়াছি, এই মুদতে বাংলার আর্থিক সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর আগাগোড়াই এমন দুই-জাতি-ভিত্তিক ছিল যে এজী-খাত নামের চুলে ধরিয়া টান দিলে মুসলমান নামের মাথাটি আসিয়া পড়িত। অপর পক্ষে জমিদার-মহাজনের নামের টানে হিন্দুরাও কাতারবন্দি হইয়া যাইত। প্রজা-আন্দোলনের ডাকে যে কাতারবন্দিটা হইত, তা ছিল এই কারণেই মুসলমান জনসাধারণের আর্থিক ও সামাজিক মুক্তি চেষ্টা, সামাজিক মর্যাদার দাবি। প্রজা আন্দোলনকে যে অনেকে কৃষক-বিরোধী জোতদার আন্দোলন বলিয়া নিন্দা করিতেন, তাঁদের কথাও একেবারে ভিত্তিহীন ছিল না। প্রজা-আন্দোলন সত্যসত্যই কৃষক আন্দোলন ছিল না। লাংগল যার মাটি তার যিকিরটা তখনও উঠে নাই। ১৯৩৩ সালে বাংলা সরকারের প্রচারিত এক প্রশ্নাবলীর উত্তরে ময়মনসিহ প্রজা-সমিতির কার্যকরী কমিটির সভায় উপস্থিত বত্রিশজন মেম্বরের মধ্যে মাত্র তিনজন বর্গাদারকে দখলী স্বত্ব দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়াছিলেন। অন্যান্যেরা শুধু বিরুদ্ধে ভোটই দেন নাই, তীব্র ও ক্রুদ্ধ প্রতিবাদও করিয়াছিলেন।
৬. প্রজা বনাম কৃষক-প্রজা
আসলে ব্যাপার এই যে বাংলার অধিকাংশ জিলায় প্রজা মানেই কৃষক, কৃষক মানেই প্রজা। তাঁদের শতকরা আশিজন নিজের হাতে নিজের জমিতে হালচাষও করেন। কিছু জমি বর্গাও দেন। এঁদের বিপুলসংখ্যক মেজরিটির পরিবারপিছে দশ একরের বেশি জমি নাই। কাজেই তাঁদের জোতদার বলা যায় না। এদের প্রকৃত নাম কৃষক প্রজা। এই জন্যই ১৯৩৬ সালে নিখিল বংগ প্রজা সমিতির নাম বদলাইয়া যখন কৃষকপ্রজা রাখা হয়, তখন কোনও বিপ্লবী পরিবর্তনের কথা কারও মনে পড়ে নাই। কালক্রমে গণআন্দোলনের প্রসারে ও সার্বজনীন ভোটাধিকারের রাস্ত্রীয় প্রয়োগে এই কৃষক-প্রজা সমিতিই একদিন ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিকসহ বাংলার জনগণের প্রকৃত গণপ্রতিষ্ঠান হইত যদি না নিখিল ভারতীয় সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক অন্যদিকে মোড় ফিরাইত। এটা শুধু মুসলমান দিকের কথা নয়, হিন্দুর দিকের কথা। গণতন্ত্রের বিকাশের প্রসারের সংগে সংগে হিন্দুরা যখন বুঝিতে পারেন যে স্বায়ত্তশাসিত বা স্বাধীন বাংলার গণতান্ত্রিক রাষ্টপরিচালনায় হিন্দু রাষ্ট্রীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূঞ্জিত অধিকার বিপন্ন হইবে, সেই দিন হইতেই তারা বাংলার মুসলিম মেজরিটির আওতা হইতে নিখিল ভারতীয় হিন্দু মেজরিটির আশ্রয়ে চলিয়া গেলেন। বাংলাদেশ ভারতের প্রদেশ হইল। বাংগালী জাতি ভারতীয় জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশমাত্র হইয়া গেল। এদিকে না গিয়া বাংলার কংগ্রেস যদি বাস্তববাদী দৃষ্টিভংগি লইয়া প্ৰজাপার্টির সহিত সহযোগিতা করিত, তবে ভারতের না হউক বাংলার রাজনীতি অন্যরূপ ধারণ করিত। বাংলার কংগ্রেস তথা বংলার হিন্দু নিখিল ভারতীয় হইয়া পড়ায় বাংলার মুসলমানদের নিখিল ভারতীয় না হইয়া উপায়ান্তর ছিল না।
