দৃষ্টিকোণের এই মৌলিক পার্থক্য হেতু হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সবচেয়ে বাস্তবদশী মুসলিম প্রবক্তা জিন্না সাহেবকে হিন্দু নেতারা ভুল বুঝিয়াছিলেন। মুসলিম নেতাদের মধ্যে একমাত্র মিঃ জিন্নাই রাজনৈতিক সংগ্রামে হিন্দু-মুসলিমকে ও কংগ্রেস-লীগকে খুব কাছাকাছি রাখিয়া চলিয়াছেন। সাম্প্রদায়িক আপোসে হিন্দু নেতৃত্বের অনমনীয় মনোভাবের মুখেও তিনি কংগ্রেসের সাথে একযোগে মুসলিম লীগকে দিয়া সাইমন কমিশন বয়কট করাইয়াছেন। রাউভটেবল কনফারেন্সে ভারতবাসীর রাষ্ট্রীয় দাবি-দাওয়া ও ডোমিনিয়ন স্টেটাসের পক্ষে কঠোর ইংরাজ বিরোধী বক্তৃতা করিয়াছেন। ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস লীগে নির্বাচনী মৈত্রী করিয়াছেন। বাংলা পাঞ্জাব সিন্ধু সরহদ্দ প্রভৃতি মুসলিম মেজরিটি প্রদেশ জিন্না সাহেবের এই লীগ-কংগ্রেস নির্বাচনী-মৈত্রী মানিয়া লয় নাই সত্য, কিন্তু যুক্তপ্রদেশ বোম্বাই মাদ্রাজ প্রভৃতি মুসলিম মাইনরিটি প্রদেশে সে চুক্তি ফলপ্রসূ হইয়াছিল। তথাপি কংগ্রেস ঐসব প্রদেশে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিবার সময় মুসলিম লীগের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব মানিয়া লইতে অস্বীকার করিল। নির্বাচনের আগে ও পরে কংগ্রেসের এই দুই রকম মতকে জিন্না সাহেব বিশ্বাস ভংগ মনে করেন। ফলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে তাঁর আজীবন আস্থা একরূপ ভাংগিয়া যায়। কিন্তু তাতেও জিন্না সাহেব তাঁর আসল ভূমিকা হইতে মুহূর্তের জন্য বিচ্যুত হন নাই! সেকথাটা একটু পরে বলিতেছি।
৪. বাংগালী জাতীয়তা বনাম ভারতীয় জাতীয়তা
হিন্দু-নেতৃত্বের অনমনীয় মনোভাবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্রদর্শিত পথ হইতে তাঁদের অদূরদর্শী বিচ্যুতিতে কিভাবে রাজনীতির মোড় ফিরিয়াছিল, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমি লাভ করিয়াছি বাংলার রাজনীতিতে। বাংলার রাজনীতি ভারতীয় রাজনীতি হইতে ছিল বেশকিছু পৃথক ও স্বতন্ত্র। নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে হিন্দুরা যে নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক শাসন চাহিতেন, বাংলার বেলা তা চাহিতেন না। বাংগালী হিন্দুরা বাংলায় মেজরিটি শাসন ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন উভয়টারই বিরোধী ছিলেন। এটা ছিল অবশ্য হিন্দুদের সাম্প্রতিক মনোভাব। উনিশ শতকের শেষে বিশ শতকের গোড়ার দিকে হিন্দু কবি সাহিত্যিক ও রাষ্ট্র নেতারা ‘বাংগালী জাতিত্ব’ ‘বাংলার বিশিষ্ট’ ‘বাংলার কৃষ্টি’ ‘বাংলার স্বাতন্ত্র’ ইত্যাদি প্রচার করিতেন। অনেকে বিশ্বাসও করিতেন। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় ভোটাধিকার প্রসারে বাংলার রাষ্ট্রীয় অধিকার মেজরিটি মুসলমানের হাতে চালিয়া যাইবে এটা যে দিন পরিষ্কার হইয়া গেল, সেই দিন হইতেই হিন্দুর মুখে বাংগালী জাতিত্বের কথা, বাংলার কৃষ্টির কথা আর শোনা গেল না। তার বদলে ‘ভারতীয় জাতি’ ‘ভারতীয় কৃষ্টি’ ‘মহাভারতীয় মহাজাতি’ ও ‘আৰ্য সভ্যতার’ কথা শোনা যাইতে লাগিল। এর কারণও ছিল সুস্পষ্ট। শেরে-বাংলা ফজলুল হক একদা বলিয়াছিলেন : ‘পলিটিকস অব বেংগল ইয় ইন রিয়েলিটি ইকনমিক্স অব বেংগল। বাংলার অর্থনীতিই বাংলার আসল রাজনীতি। খুব সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিপর্যয়ে বাংলার গোটা মুসলমান সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে অধঃপতিত জাতিতে পরিণত হয়। ধর্ম ও কৃষ্টির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম দুইটা স্বতন্ত্র সমাজ আগে হইতেই ছিল। অর্থনীতিতে মুসলমানদের এই অধঃপতনে জীবনের সকল স্তরে হিন্দু ও মুসলমান সুস্পষ্ট দৃশ্যমান দুইটা পৃথক জাতি হইয়া গেল। পরিস্থিতিটা এমন হৃদয়বিদারক ছিল যে কংগ্রেসের নিষ্ঠাবান কর্মী হইয়াও আমি কংগ্রেস সহকর্মীদের সামনে জনসভায় কঠোর ভাষায় এই পার্থক্যের কথা বলিয়া হিন্দু বন্ধুদের বিরক্তি ভাজন হইতাম। আমি বলিতাম : বাংলার জমিদার হিন্দু প্রজা মুসলমান বাংলার মহাজন হিন্দু খাতক মুসলমান; উকিল হিন্দু মক্কেল মুসলমান; ডাক্তার হিন্দু রোগী মুসলমান; হাকিম হিন্দু আসামী মুসলমান; খেলোয়াড় হিন্দু দর্শক মুসলমান; জেইলার হিন্দু কয়েদী মুসলমান ইত্যাদি ইত্যাদি। এইভাবে আমি তালিকা বাড়াইয়া যাইতাম। যতই বলিতাম ততই উত্তেজিত হইতাম। ততই তালিকা বাড়িত। হাজারবার কওয়া এই কথাগুলিই তীব্রতম কর্কশ ভাষায় বলিয়াছিলাম ১৯৩৩-৩৪ সালে ময়মনসিংহের এক রিলিফ কমিটির বৈঠকে। সেবার ব্রহ্মপুত্র নদীতে বন্যা হইয়া দুকুল ভাসিয়া গিয়াছিল। বন্যা-পীড়িত দুর্গতদের জন্য অন্যান্যদের মত বার এসোসিয়েশনের পক্ষেও একটা রিলিফ কমিটি করা হয়। বেশ টাকা উঠিয়াছিল। প্রায় সব টাকাই হিন্দুরাই দিয়াছিলেন। মুসলমানদের দান খুবই নগন্য। এই তহবিলের টাকা বন্টনে এক সভায় সমিতির প্রেসিডেন্ট রায় বাহাদুর শশধর ঘোষের সাথে আমার তর্ক বাধে। তিনি আমাকে স্মরণ করাইয়া দেন যে চাঁদাদাতারা প্রায় সবাই হিন্দু। আর যায় কোথায়? আমি গর্জিয়া উঠিলাম। আমার হাজার-বার-কওয়া ঐসব কথা মুখস্থ বলিয়া গেলাম এবং উপসংহার করিলাম : অতএব বাংলার দাতা হিন্দু ভিক্ষুক মুসলমান। রায় বাহাদুর ও সমবেত মেম্বরদেয়ে আমি স্মরণ করাইয়া দিলাম বাংলার হিন্দুদের যার ঘরে যত টাকা আছে সব টাকা মুসলমানের। মুসলমান চাষী-মজুরের মাথার-ঘাম পায়ে ফেলিয়া-রোযগারকরা টাকায় হিন্দুরা সিন্দুক ভরিয়াছে, দালান ইমরাত গড়িয়াছে; গাড়ি-ঘোড়া দৌড়াইতেছে। রায় বাহাদুরের নিজের টাকা ব্যাংক ও বাড়ির কথাও উত্তেজনার মুখে বলিয়া ফেলিলাম। রায় বাহাদুরসহ উপস্থিত সকলে হতভম্ব হইয়া গেলেন। কিন্তু রায় বাহাদুর ছিলেন বিচক্ষণ সুচতুর জ্ঞানী লোক। তিনি রাগ গোপন করিলেন। বিতরণের পন্থা হিসাবে আমার প্রস্তাবটা মানিয়া লইলেন, আসন্ন ঝড় কাটিয়া গেল। ব্যাপারটার মধুর উপসংহার হইল।
