২. সাম্প্রদায়িক মিলনের দুই রূপ
এইসব ঘটনা হইতে দুইটা সত্য প্রকট হইয়া উঠে। এক, ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্ব স্বত্ত্ব সত্তা বজায় রাখিয়া হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের চেষ্টা করিয়াছেন। এক শ্রেণীর উদারপন্থী হিন্দু নেতা মুসলিম দাবি-দাওয়া মানিয়া লইয়া সাম্প্রদায়িক ঐক্যের সদিচ্ছা প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু অধিকাংশ হিন্দু মতের চাপে তাঁরা পিছাইয়া গিয়াছেন। দুই, এই ঐক্যচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণ এই যে ঐক্যবাদী মুসলিম নেতৃত্ব ও ঐক্যবাদী হিন্দু-নেতৃত্বের মধ্যে একটা মৌলিক বিরোধ ছিল। মুসলিম নেতৃত্ব চাহিয়াছিলেন দুই স্ব সত্তার মধ্যে রাজনৈতিক মিলন বা ফেডারেশন। পক্ষান্তরে হিন্দু-নেতৃত্ব চাহিয়াছিলেন সার্বিক মিশ্রণ বা ফিউশন। একমাত্র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনই তাঁর উদার দূরদৃষ্টি বলে হিন্দু-মুসলিম-ঐক্যের বাস্তব রূপ দেখিতে পাইয়াছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম-ঐক্যের পক্ষে দরদী ভাষায় প্রাণস্পর্শী বাগিতায় বলিয়াছিলেন : ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্য অর্থ সংমিশ্রণ নয়, মিলন। ফিউশন নয় ফেডারেশন। দুইটি স্বতন্ত্র সত্তাবিশিষ্ট সম্প্রদায় রাজনৈতিক কারণে ও উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হইবে মাত্র; মিশিয়া এক সদায় হইয়া যাইবেন না। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য অর্থ যদি দুই সম্প্রদায়ের মিশ্রণে এক সম্প্রদায় হওয়ার কথা হইত, তবে আমি সে ঐক্যের কথা বলিতাম না।‘ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ছিলেন নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব হিন্দু। নিজের ধর্মমতে তাঁর অটুট প্রাণ-ভরা আস্থা ছিল। সে আস্থায় কোনও দ্বেষ ছিল না। ছিল শুধু ভালবাসা। তাই দেশবাসী মুসলমানের ধর্মের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ছিল তাঁর। নিজের বাপকে যে সন্তান শ্রদ্ধা করে, পরের বাপের প্রতি সেকদাচ অশ্রদ্ধা দেখাইতে পারেনা। ইহাই ছিল দেশবন্ধুর জীবনদর্শন। নিষ্ঠাবান হিন্দু হইয়াও হিন্দু-মুসলিম এঁকে কেমন করিয়া আন্তরিক বিশ্বাস করা যায়, দেশবন্ধু ছিলেন তার আদর্শ নিদর্শন। দেশবন্ধু পরে আমি আর একজন মাত্র বাংগালী হিন্দু নেতার মধ্যে এই গুণ দেখিয়াছি। ইনি ছিলেন সুভাষ বাবুর জ্যেষ্ঠ সহোদর মিঃ শরৎ বসু। তিনি দেশবন্ধুর মতই নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন। পূজা-অর্চনায় বিশ্বাস করিতেন। নিজের ধর্ম-মরে জন্য যে কোনও ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিলেন। এমন ধর্ম-নিষ্ঠ হিন্দু শরতবাবু মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় প্রাপ্যাধিকার মানিয়া লইতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ও সংকোচ বোধ করিলে না।
কিন্তু অধিকাংশ হিন্দু নেতা চাহিতেন হিন্দু-মুসলমানে মিশ্রণ। তাই বলিয়া এঁরা সকলে দেশবন্ধু ও শরৎবাবুর মত নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন না। হিন্দুধর্মের প্রতি তাঁদের কোনও আস্থা ছিল না, তা নয়। হিন্দু-মুসলিম দুই সামাজিক পৃথক সত্তার স্থলে মিশ্রিত এক সম্প্রদায় হওয়ার অর্থে তাঁরাও না-হিন্দু-না মুসলমান কোনও নয়া সম্প্রদায় বুঝিতেন না। তাঁরা বুঝিতেন মাইনরিটি মুসলমান সমাজ বিপুল বেগবান হিন্দু সম্প্রদায়ে ‘হইবে লীন’। যেমন ক্ষুদ্র জলাশয়ের জল মহাসমুদ্রে লীন হয়। এটাকে তাঁর অন্যায় বা অসম্ভব মনে করিতেন না। ধর্মে পৃথক হইয়াও যখন ব্রাহ্ম-খৃষ্টান বৌদ্ধ জৈন-পার্শি-গুর্গা-শিখেরা মহান হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত থাকিতে বাধে নাই, তখন মুসলমানের বাধিবে কেন?
মুসলিম নেতৃবৃন্দ স্পষ্টতঃই এমন ঐক্যে বিশ্বাস করিতেন না। মুসলিম নেতারা এটাকে নিছক একটা রাজনৈতিক ঐক্য হিসাবে দেখিয়াছেন। সামাজিক ঐক্য হিসাবে দেখিবার উপায় ছিল না। হাজার বছর মুসলমানরা হিন্দুর সাথে একদেশে একত্রে বাস করিয়াছে। হিন্দুদের রাজা হিসাবেও, হিন্দুদের প্রজা হিসাবে। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই হিন্দু-মুসলমানে সামাজিক ঐক্য হয় নাই। হয় নাই এইজন্য যে হিন্দুরা চাহিত আর্য-অনাৰ্য্য শক-হন যে ভাবে মহাভারতের সাগরতীরে লীন হইয়াছিল, মুসলমানরাও তেমনি মহান হিন্দু সমাজে লীন হইয়া যাউক। তাদের শুধু ভারতীয় মুসলমান থাকিলে চলিবে না, ‘হিন্দু-মুসলমান’ হইতে হইবে। এটা শুধু কংগ্রেসী বা হিন্দু-সভার জনতার মত ছিল না, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথেরও মত ছিল।
৩. অবাস্তব দৃষ্টিভংগি
এই কারণে ১৯২০ হইতে ১৯৪০ সাল এই বিশ বছরে ভারতীয় রাজনীতির হিন্দু-মুসলিম আপোস চেষ্টা প্রধানতঃ যুক্ত বনাম পৃথক নির্বাচন প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই নির্বাচনের প্রশ্নটাকে হিন্দুরাজনীতিক নেতৃত্ব কিরূপ গুরুত্বপূর্ণ মনে করিতেন সেটা প্রমাণিত হয় তফসিলী হিন্দুদের পৃথক-নির্বাচনাধিকার স্বীকৃতির বিরুদ্ধে মহাত্মাজীর আমরণ অনশন-ব্রতে। ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদে মুসলমানদের মত তফসিলী হিন্দুদেরও পৃথক নির্বাচন দেওয়া হইয়াছিল। ১৯৩২ সালের আগস্ট মাসে যখন এই এওয়ার্ড ঘোষণা করা হয়, তখন মহাত্মাজী পুণা জেলে বন্দী। সেখান হইতেই তিনি সেপ্টেম্বর মাসে এই ব্যবস্থার প্রতিবাদে আমরণ অনশন-ব্রত গ্রহণ করেন। তফসিলী নেতৃবৃন্দ শুধুমাত্র মহাত্মাজীর জান বাঁচাইবার জন্য আসন সংরক্ষিত যুক্ত নির্বাচন প্রথা মানিয়া লন। বৃটিশ সরকারও ত্বরিতে এই প্রস্তাব মানিয়া লইয়া এওয়ার্ড সংশোধন করেন। মহাত্মাজী অনশন ভংগ করেন। লক্ষণীয়, মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের প্রতিবাদে মহাত্মাজী অনশন করেন নাই। কারণ সুস্পষ্ট। প্রথমতঃ মুসলমানদের পৃথক নির্বাচন অধিকার আগে হইতে স্বীকৃত ছিল। দ্বিতীয়তঃ গান্ধীজী মুসলমানদের পৃথক সত্তা স্বীকার করিতেন। সুতরাং দেখা যাইতেছে, পৃথক নির্বাচনকে হিন্দু-নেতৃবৃন্দ বরাবরই এই নযরে দেখিয়া আসিয়াছেন। মুসলিম নেতৃত্বও কাজেই অন্য ন্যরে দেখেন নাই। এই কারণেই মুসলিম নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলী ভাই, ডাঃ আনসারী, মাওলানা আযাদ প্রভৃতি যাঁরা বরাবর যুক্ত নির্বাচন সমর্থন করিয়াছেন, তাঁরা অবিমিশ্র যুক্ত নির্বাচন চান নাই। ‘মোহাম্মদ আলী ফরমুলা’ নামে মওলানা মোহাম্মদ আলীর প্রস্তাবিত যে নির্বাচন পদ্ধতি একবার আলোচনার বিষয়বস্তু হইয়াছিল, তাতেও দুই স্তরে নির্বাচন হওয়ার প্রস্তাব ছিল। প্রথম স্তরে শুধু মুসলিম ভোটাররা আসন-সংখ্যার চেয়ে বেশি প্রার্থী নির্বাচন করিবে। ঐ নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্য হইতেই দ্বিতীয় স্তরে হিন্দু মুসলমান যুক্ত ভোটে মেম্বর নির্বাচিত হইবেন। পদ্ধতিগত-মত-বিরোধে শেষ পর্যন্ত এই স্কীমও পরিত্যক্ত হয়। নির্বাচন প্রথার প্রশ্নকে হিন্দু নেতৃবৃন্দ এমন গুরুত্ব দিতেন বলিয়াই প্রতিনিধিত্ব ও সরকারী চাকুরির হারের বেলা তাঁরা নিতান্ত বানিয়া-নীতিতে দরকষাকষি করিয়াও একটু-একটু করিয়া ডোর ছাড়িয়াছেন। কিন্তু কিছু বেশি আসনের বদলে নির্বাচনের বেলা এক ইঞ্চি টলেন নাই। লাখনৌ প্যাটে স্বতন্ত্র নির্বাচন মানিয়া লইয়া যে সব হিন্দু-নেতা ভুল করিয়াছিলেন, হিন্দুরা কোনদিন তাঁদের ক্ষমা করেন নাই। তেমন ভুলের পুনরাবৃত্তি করিতেও তাঁরা রাযী ছিলেন না।
