চিন্তিত হইলাম তার চেয়ে বেশি। কৃষক-প্রজা-পার্টি ও কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সাথে মন্ত্রিসভার একটা সংঘাত ক্রমেই আসন্ন হইয়া আসিতেছে, তা স্পষ্টই দেখিতে পাইলাম।
১১. কালতামামি
কালতামামি
এগারই অধ্যায়
১. রাজনীতির দুই দিক
আমার নিজের দেখা রাজনীতির একটা যুগ এইখানে শেষ হইল। এক সালের হিসাব-নিকাশকে আমরা বলি সাল তামামি। একটা কালের হিসাব-নিকাশকে তাই কাল ভামামি বলিতে চাই। ইংরাজীতে যাকে বলা হয় রিট্রোসপেক্ট। কাল মানে এখানে একটা যুগ যুগ এখানে বার বছরের যুগ বা দশ বছরের ডিকেন্ড নয়। এটা একটা এরা, একটা যমানা, একটা আমল। জাতির ইতিহাসে ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ এক বিশেষ ধরনের ঘটনাবলীর একটা মুদ্দত। একটা পিরিয়ড। এই ঘটনাপুঞ্জ প্রধানতঃ রাজনীতিক।
এই রাজনীতির দুইটা দিক : একটা ভারতীয়, অপরটা বাংগালী। ভারতীয় রূপে এই রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মাইল খুটি এই কয়টি : খিলাফত ও স্বরাজ আন্দোলন। গান্ধীজী ও আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে সারা ভারতে একটা অপূর্ণ গণ-বিপ্লব। অভাবনীয় হিন্দু-মুসলিম মিলন। জিন্নার কংগ্রেস ত্যাগ। আন্দোলনের ব্যর্থতা। আকস্মিক অবসান। সাম্প্রদায়িক দাংগা। জিন্নার হিন্দু-মুসলিম-আপোস চেষ্টা। কংগ্রেসের অনমনীয় মনোভাব। গোল টেবিল বৈঠক। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন। কংগ্রেস ও লীগ কর্তৃক উহার প্রাদেশিক অংশগ্রহণ ও কেন্দ্রীয় অংশ বর্জন। কংগ্রেস কর্তৃক ছয়টি, মুসলিম লীগ কর্তৃক পাঁচটি প্রদেশে মন্ত্রিত্ব। ১৯১৬ সালের লাখনৌ প্যাকট নামে পরিচিত কংগ্রেস মুসলিম লীগ চুক্তি আমার দেখা রাজনীতির মধ্যে পড়ে না। কারণ ওটার সংগে আমার যে সাক্ষাৎ পরিচয় নাই, শুধু তাই নয়। ঐ সময়ে আমার কোনও রাজনৈতিক চেতনাই ছিল না। তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র মাত্র। ওটা যে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বিশ্বযুদ্ধের খবরের ভিড়ের মধ্যে তাও আমার মনে হয় নাই। কিন্তু, আমার দেখা রাজনীতির মধ্যেও উপরে তার যে একটা ইমপ্যাক্ট, একটা প্রভাব ছিল তা আমি পরে বুঝিয়াছিলাম।
রাজনীতির বাংগালী রূপে প্রজা-আন্দোলন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টা, তাঁর বেংগল প্যাক্ট, কলিকাতা কর্পোরেশনে তার প্রয়োগ শুরু, দেশবন্ধুর আকস্মিক মৃত্যু, কংগ্রেসের প্রজা-স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ, বেংগল প্যাট বাতিল, মুসলমানদের কংগ্রেস ত্যাগ ও প্রজা-সমিতি গঠন ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য মাইল খুঁটি। ১৯০৫ সালে পূর্ব-বাংলা ও আসাম প্রদেশের সৃষ্টি ও ১৯১১ সালে তা বাতিল আমার দেখা রাজনীতিতে পড়ে না। কিন্তু আমার দেখা রাজনীতির উপর তার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ইমপ্যাক্ট হইয়াছিল, তৎকালীন মুসলিম সমাজের মনোভাব হইতে তা স্পষ্ট বুঝা যাইত। তাদের চিন্তার প্রভাব আমার নিজের পরবর্তীকালের রাজনৈতিক চিন্তায়ও কম পড়ে নাই। সেটা অবশ্য বুঝিয়াছিলাম অনেক দিন পরে।
এতকাল পরে পিছন দিকে তাকাইয়া একজন রাজনৈতিক কর্মী লেখক ও সাংবাদিক হিসাবে আমার যা মনে পড়ে, তার সারমর্ম এই যে ভারতের মুসলমানরা আগা-গোড়াই একটা রাজনৈতিক স্বতন্ত্র সত্তা হিসাবেই চিন্তা ও কাজ করিয়াছে। এটা তারা খিলাফত যুগের ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই’ বলার সময়েও যেমন করিয়াছে, সাম্প্রদায়িক দাংগার সময় ‘মারি অরি পারি যে প্রকারে’ বলার সময়ও তেমনি করিয়াছে। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের পত্তন, ১৯১৫ সালের লাখনৌ প্যাক্ট, ১৯২৩ সালের বেংগল প্যাকট, ১৯২৮ সালে কলিকাতা কংগ্রেস হইতে ওয়াক-আউট, ১৯২৯ সালে সর্বদলীয় মুসলিম কনফারেন্স, জিন্নার চৌদ্দ-দফা রচনা, ১৯৩০-৩৩ সালে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে যোগদানও ইত্যাদি সব-তাতেই মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তা-ধারার এই দিকটা সুস্পষ্টরূপে ধরা পড়িয়াছে। কি কংগ্রেসের সাথে দেন দরবারে কি বৃটিশ সরকারের নিকট দাবি দাওয়ায়, এই কথাই বলা হইয়াছে। কি কংগ্রেসী মুসলিম নেতা আলী ভাই-আনসারী-আজমল খাঁ, কংগ্রেস বিরোধী নাইট নবাব সবাই এ ব্যাপারে মূলতঃ একই সুরে কথা বলিয়াছেন। কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও তারও আগে গোপাল কৃষ্ণ গোখেল-দাদাভাই নওরোযীর মত বাস্তববাদী উদার নেতা অনেক ছিলেন। তা না থাকিলে লাখনৌ প্যাকট হইত না। পরবর্তীকালে মিঃ সিঃ রাজা গোপালাচারির মত বাস্তববাদী দূরদশী হিন্দু নেতা না থাকিলে রাঁচি কনফারেন্সে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ সম্পর্কে ‘না গ্রহণ না বর্জন’ প্রস্তাবও গৃহীত হইত না। মুসলমানদের সাথে আপোস ও সহযোগিতা করিতে এঁরা অনেকদূর অগ্রসর হইতে রাযী ছিলেন। তাই তুর্কী সাম্রাজ্য ভাগ করিয়া ইংরাজ ফরাসী–গ্রীসের মধ্যে বন্টন করিয়া নেওয়ার প্রতিবাদে মুসলিম ওলামারা যখন শেখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে তর্কেমমাওয়ালাত (অসহযোগিতা) আন্দোলন ও আলী ভাই-র নেতৃত্বে ১৯২০ সালে খিলাফত আন্দোলন শুরু করেন, তখন এই আন্দোলনের মধ্যে প্যানইসলামিযমের বীজ আছে জানিয়া গান্ধীজীর নেতৃত্বে হিন্দুরা খিলাফত আন্দোলনকে নিজের করিয়া লন। খিলাফত আন্দোলনকে ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তির ধর্মীয় আন্দোলন বলিয়া মিঃ জিয়ার মত মুসলিম নেতা যেখানে ঐ আন্দোলনে যোগ দেন নাই, সেখানে হিন্দু নেতৃবৃন্দ অতি সহজেই এই আন্দোলন হইতে দূরে থাকিতে পারিতেন। কিন্তু তাঁরা তা করেন নাই। কারণ এরা হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে সত্যই বিশ্বাসী ছিলেন এবং খিলাফতকে মুসলমানের ধর্মীয় দাবি বলিয়া বিশ্বাস করিতেন। মহাত্মা গান্ধী ১৯২০ সালে তাঁর ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ নামক ইংরাজী সাপ্তাহিকে লেখেনঃ ‘হিন্দু-মুসলিম একতা ছাড়া ভারতের কোনও মুক্তি নাই। গান্ধীজীর আগেও গোখেল-দাদাভাই হিন্দু-মুসলিম একতার উপর খুবই জোর দিয়াছিলেন। কিন্তু হিন্দু নেতৃবৃন্দের মধ্যে গান্ধীজীই সর্ব প্রথম হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে ভারতের মুক্তির অপরিহার্য শর্ত ‘সাইন-কোয়া-ন’ রূপে পেশ করেন। অবশ্য তাঁরও আগে জিয়া সাহেব বলিয়াছিলেনঃ ‘হিন্দু-মুসলিম একতা ছাড়া ভারতের মুক্তি নাই। কিন্তু মাইনরিটি মুসলমানের মুখেও মেজরিটি হিন্দুর মুখে কথাটার তাৎপর্য অনেক বেশ কম। হিন্দু নেতৃবৃন্দের মধ্যে একমাত্র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনই কথাটাকে কাজে প্রয়োগ করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু নিখিল ভারতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধতায় দেশবন্ধুর অরকাল স্থায়ী রাজনৈতিক জীবনে তা সফল হয় নাই। তাঁর অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুর পর দেশবন্ধুর অনুসারী বাংলার হিন্দু নেতৃবৃন্দ নিজেরাই দেশবন্ধুর বেংগল প্যাকট বাতিল করিয়া ভারতীয় হিন্দু-নেতৃত্বের সাথে এক কাতারে দাঁড়ান।
