৫. নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভংগ
যাহোক শেষ পর্যন্ত স্থির হইল মন্ত্রি-বেতনের প্রশ্নটা কোয়ালিশন পার্টি মিটিং-এ দেওয়া হইবে। আমি এম, এল, এ. না হওয়া সত্ত্বেও এ্যাডভাইযারি বোর্ডের মেম্বর হিসাবে আমাকে পার্টি মিটিং ডাকা হইবে। আমি সানন্দে এই সিদ্ধান্ত মানিয়া লইলাম। কারণ আমি জানিতাম সকল দলের মেম্বরদের বিপুল সংখ্যাধিক্য লোক মন্ত্রি-বেতন হাজার টাকার পক্ষপাতী। কিন্তু পার্টি মিটিং-এর দিন আমি নিরাশ হইলাম। কারণ কৌশলী মন্ত্রীরা মেম্বারদের জন্য আড়াইশ টাকা বেতনের প্রস্তাব করিলেন এবং মেম্বরও মন্ত্রি-বেতনটা একই প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত করিলেন। তাতে মন্ত্রীদের বেতন আড়াই হাজার এবং প্রধান মন্ত্রীর জন্য অতিরিক্ত পাঁচশ টাকার ব্যবস্থা হইল। রকম সর্বসম্মতিক্রমে অর্থাৎ নেমক (বিনা প্রতিবাদে) প্রস্তাবটি পাস হইয়া গেল।
কৃষক-প্রজা কর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া শুরু হইল। চারিদিকেই নৈরাশ্য দেখা দিল। মন্ত্রিসভা গঠনে কৃষক-প্রজা সমিতির সুস্পষ্ট পরাজয় ঘটিয়াছে, এ ধারণা ক্রমে বন্ধমূল হইল। ইতিমধ্যে পরোক্ষ নির্বাচনে অধ্যাপক হুমায়ুন কবির সাহেবকে ব্যবস্থাপক সভার (উচ্চ পরিষদ) মেম্বর করিতে পারায় আমাদের একটু সুবিধা হইল। কৃষক-প্রজা কর্মীরা আমরা সবাই একমত ছিলাম যে আমাদের পক্ষ হইতে হক সাহেবের উপর ন্যর রাখা কর্তব্য। প্রথমতঃ ইউরোপীয় দল মুসিলম লীগ নেতারা এবং হিন্দু জমিদাররা হক সাহেবকে বাধ্য হইয়া প্রধানমন্ত্রী মানিয়া লইলেও তলেতলে তাঁকে ডিসক্রেডিট করিবার চেষ্টা তাঁরা চালাইয়া যাইতেছেন। দ্বিতীয়তঃ, হক সাহেব কখন কি করিয়া বসেন, তার ঠিক নাই। এ অবস্থায় হক সাহেবের সহিত ঘনিষ্ঠ ও তাঁর বিশ্বস্ত দু-এক জন কৃষক-প্রজা-নেতার সর্বদাই হক সাহেবের সংগে সংগে থাকা দরকার। শামসুদ্দিন সাহেব স্বভাবতঃই কাজ করিতে রাযী না হওয়ায় অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও নবাবযাদা হাসান আলীর উপর এই দায়িত্ব পড়িল।
সমিতির সেক্রেটারী শামসুদ্দিন সাহেবকে মন্ত্রী না করা হইছে কৃষক-প্রজা কর্মীদের মধ্যে যে অসন্তোষ ধূমায়িত হইতেছিল, মন্ত্রী-বেতন আড়াই হাজার ও মেম্বর-বেতন আড়াই শ’ রায় কর্মীদের মধ্যে সে অসন্তোষ আরও বাড়িয়া গেল। শেষ পর্যন্ত জমিদারি উচ্ছেদের প্রশ্নটাকে শিকায় তুলিয়া যখন ফ্লাউড কমিশন নিয়োগ করা হইল, তখন কর্মীদের অসন্তোষ প্রকাশ্য ক্রোধে পরিণত হইল। আমি স্বস্তির সংগে ময়মনসিংহ বসিয়া ওকালতি করিতে পরিলাম না। হক সাহেব আমাদের কথা রাখেন না দেখিয়া ‘দুত্তোর যা-ইচ্ছা তাই হোক’ বলিয়া রাজনীতি হইতে হাত ধুইয়াও ফেলিতে পরিলাম না। কেবলি মনে হইত, হক সাহেবের নেতৃত্বকে সফল করা এবং তাঁকে দিয়া কৃষক-প্রজা সমিতির নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করার দায়িত্ব আমার কম নয়। এই সব চিন্তা করিয়া অবসর পাইলেই, এমনকি অনেক সময় ওকালতি ব্যাঘাত করিয়াও, কলিকাতা ছুটিয়া যাইতাম। এতে মণ্ডকেলরা অসন্তুষ্ট হইতেন। আমার ব্যবসার অনিষ্ট হইত। কিন্তু আমি এটা উপক্ষো করিতাম। কারণ পাঁচ-সাত বছরের আমার এই অভিজ্ঞতা হইয়াছে যে স্বয়ং মণ্ডলেরাই এ সম্পর্কে দুই অবস্থায় দুই রকম কথা বলেন। একজন আসিয়া শুনিলেন আমি সেই রাত্রের ট্রেনেই অন্যত্র মিটিং করিতে যাইতেছি। পরদিনই তাঁর কেসের শুনানি। তিনি চিৎকার করিয়া বলিলেন : ‘আপনে যাইতেছেন সভা করতে; আমার কেসের তবে কি হৈব?’ আমি বলিতাম, ‘আমি হাকিমেরে কৈয়া রাখছি। দরখাস্ত দিলেই টাইম দিবেন।‘ তাতেও মওক্কেল সন্তুষ্ট হইতেন না। নিজের স্বার্থের কথা বাদ দিয়া আমার হিতের চিন্তা করিতেন। বলিতেন : ‘এভাবে কেবল সভা কৈরা বেড়াইলে আপনের ওকালতি চলব কেমনে?’ আমি হাসিয়া বলিতাম : ‘এর পর আর সভা-সমিতি না কৈরা শুধু ওকালতিই করব। কথা দিয়া ফেলছি বৈলাই আজ যাইতেছি।‘ কয়েকদিন পরে ঐ ভদ্রলোকই এক সভার আয়োজন করিয়া বিজ্ঞাপনে আমার নাম ঘোষণা করিয়া আমাকে নিতে আসিয়াছেন। আমি মাথা নাড়িয়া বলিলাম : ‘অসম্ভব, আমি যাইতে পারব না। কাল আমার খুব বড় মামলা আছে।‘ ভদ্রলোক বিস্মিত হইয়া বলিলেন : ‘ওঃ আপনেও শেষ পর্যন্ত টাকা চিনছেন? আপনেও যদি আর দশ জনের মতই টাকা রোযগারে ধাওয়া করেন, তবে প্রজা-আন্দোলন চাংগে তুইলাই যান। মামলার কপালে যাই থাকুক, আমাদের সভায় আপনের যাইতেই হৈব। আপনে না গেলে ঐ অঞ্চলের জনসাধারণ আমারে মাইরা ফেলব, আপনেরেও ছাড়ব না।‘ সুতরাং আমি মামলা মুলতবির ব্যবস্থা করিয়া সভা করিতে যাইতাম।
এইভাবে আমি কৃষক-প্রজা পার্টির পার্লামেন্টারি রাজনীতির সাথেও সম্পর্ক রাখিতে বাধ্য হইতাম। কলিকাতা যাতায়াত করিতাম। এতে আমার ওকালতির ব্যাঘাত, আর্থিক ক্ষতি ও পরিবারের কষ্ট হইত, বুঝতাম। কিন্তু উপায়ন্তর ছিল না। নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখিবার গরযেই তা করিতে হইত। প্রধান মন্ত্রী হক সাহেব আমার কথা রাখেন না, এ কথা এ জিলার কেউ বিশ্বাস করি না। তাদের ধারণা আমি হক সাহেবের উপদেষ্টা। আমার বুদ্ধি ছাড়া তিনি কখনও কোনও কাজ করেন না। হক সাহেবের এমন আস্থা আমি হারাইয়াছি, রাজনৈতিক চালে মুসলিম লীগের কাছে হারিয়া গিয়াছি, ময়মনসিংহের ভোটাররা কৃষক-প্রজা পার্টিকে ভোট দিয়া ভুল করিয়াছে, এসব কথা স্বীকার করিতেও আত্ম-সম্মানে কেমন বাধিত। পক্ষান্তরে বড়-বড় কথা বলিয়া ধাপ্লা দিয়া কৃষক-প্রজার ভোট নিয়াছি, এ কথাও বলা যায় না, কারণ কথাটা সত্য নয়। কাজেই বলিতে হয় হক সাহেব ঠিকই আছেন। মুসলিম লীগের জমিদার মন্ত্রীরা হিন্দু-জমিদার মহাজন মন্ত্রীদের সাথে জোট পাকাইয়া হক সাহেবকে কোন্ঠাসা করিয়াছেন। কথাটা যে একদম মিথ্যা নয়, তার প্রমাণও হাতে কলমে পাইলাম। আমার ‘নয়া পড়া’ নামে একটি শিশুপাঠ্য বই পাঁচ বছর ধরিয়া পাঠ্য থাকার পর আরবী-ফারসী শব্দের ‘আথিশয্য-দোষে’ বাদ গেল হক সাহেবের প্রধান মন্ত্রী-শিক্ষা মন্ত্রিত্বের আমলে। তিনি চিৎকার হৈ চৈ করিয়া ছাত ফাটাইয়াও প্রতিকার করিতে পারিলেন না। আমি আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হইলাম। দুঃখিত হইলাম। কিন্তু সহ্য করিলাম। রিযনেবল হইলাম।
