৪. উপদেষ্টা বোর্ড
যা হোক, বক্তাদের উত্তাপ শেষ পর্যন্ত কমিয়া গেল। ধীর-স্থিরভাবে আলোচনা শুরু হইল। মন্ত্রিসভা বয়কট করা বুদ্ধিমানের কাজ হইবে না। তাতে হক সাহেবেকে জমিদারদের হাতে অসহায় অবস্থায় ছাড়িয়া দেওয়া হইবে, এ বিষয়ে আমরা একমত হইলাম। অতএব মন্ত্রিসভার উপর কড়া নযর রাখিয়া ইহার সহিত সহযোগিতা করিয়া যাওয়াই সাব্যস্ত হইল। সুষ্ঠভাবে এই কাজ করিবার উদ্দেশ্যে মন্ত্রিসভার একটা উপদেষ্টা বোর্ড গঠনের দাবি করা হইল। এই উপদেষ্টা বোর্ড গঠনে এবং তাতে প্রজ সমিতির মেজরিটির ব্যবস্থা করায় হক সাহেবকে রাযী করার ভার আমার উপর দেওয়া হইল। এইভাবে ভালয়-ভালয় সেদিনকার উত্তেজনাপূর্ণ সতার কাজ শেষ হইল।
হক সাহেবের ধারণা হইয়াছিল যে তাঁর পত্রের মর্ম অনুযায়ী আমিই সেদিনকার সতাটা সামলাইয়াছিলাম। কাজেই তিনি অতি সহজেই আমার প্রস্তাবে রাখী হইয়াছিলেন এবং মন্ত্রিসভাকে রাযী করিয়াছিলেন। সকল দলের ইলেকশনী ওয়াদার ভিত্তিতে একটি সাধারণ কর্মপন্থা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে শীঘ্রই একটি উপদেষ্টা বোর্ড গঠিত হইল। ইহাতে ছয়জন সদস্য থাকিলেন। এতে মুসলিম লীগের পক্ষে থাকিলেন নবাব বাহাদুর হবিবুল্লাহ, সার নার্যিমুদ্দিন ও মিঃ শহীদ সুহরাওয়াদী। কৃষক-প্রজা পার্টির তরফে থাকিলেন হক সাহেব, সৈয়দ নওশের আলী এবং আমি। প্রস্তাব হইল মন্ত্রিসভা এই উপদেষ্টা বোর্ডের প্রস্তাব কার্যকরী করিতে বাধ্য থাকিবেন। ফলে মন্ত্রী ও এম.এল.এরা এই বোর্ডকে ‘সুপার ক্যাবিনেট’ আখ্যা দিলেন।
ইতিমধ্যে বন্ধুদের চেষ্টায় এবং হক সাহেবের সহায়তায় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা হইল। অটো-ভ্যাক্সিন চিকিৎসায় আমি সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করিলাম। মন্ত্রিসভার কাজ পুরাপুরি শুরু হইবার আগেই উপদেষ্টা বোর্ডের সভা হওয়া দরকার। সে মতেই ইহার বৈঠক দেওয়া হইল এবং আমি মফস্বলের লোক বলিয়া আমার সুবিধার খাতিরে দিনের-পর-দিন ইহার বৈঠক চালাইবার ব্যবস্থা হইল। প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, মহাজনি আইন প্রণয়ন, কৃষিখাতক আইন অনুসারে সালিশী বোর্ড গঠন, প্রাথমিক শিক্ষা আইন কার্যকরী। করণ প্রভৃতি যরুরী প্রশ্নগুলি সম্বন্ধে সর্বসম্মত কর্মসূচী গৃহীত হইয়া গেল। কিন্তু দুইটি বিষয়ে একমত হইতে না পারায় দিনের পর দিন উহার আলোচনা পিছাইয়া যাইতে। লাগিল এর একটি জমিদারি উচ্ছেদ, অপরটি মন্ত্রি-বেতন। জমিদারি উচ্ছেদে মুসলিম। লীগ প্রতিনিধিরাও রাযী ছিলেন বটে, কিন্তু বিনা-ক্ষতিপূরণে তাঁরা কিছুতেই রাযী হইতেছিলেন না। আর মন্ত্রি-বেতন প্রশ্নে তাঁরা প্রজা-সমিতির নির্বাচনী ওয়াদা কিছুতেই গ্রহণ করিতেছিলেন না। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে কৃষক-প্রজা সমিতির নির্বাচনী ওয়াদায় ছিল মন্ত্রীরা এক হাজার টাকার বেশি বেতন নিতে পারিবেন। জমিদারি উচ্ছেদ সম্পর্কে আলোচনা লম্বা করা সম্ভব। কিন্তু মন্ত্রি-বেতনের আলোচনায় বিলম্ব করা যায় না। কারণ মাস গেলেই মন্ত্রীদের বেতন লইতে হইবে। কাজেই শেষ পর্যন্ত একদিন মন্ত্রি-বেতনের আলোচনা শুরু হইল। আমি প্রস্তাব দিলাম এবং সৈয়দ নওশের আলী সমর্থন করিলেন, মন্ত্রীরা এক এক হাজার টাকা বেতন পাইবেন। এই আলোচনায় একটি অপ্রিয় ঘটনা ঘটিয়াছিল এবং এই অপ্রিয় ঘটনা হইতেই পরবর্তীকালে জনাব শহীদ সাহেবের সহিত আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সেজন্য ঘটনাটি ঘোট হইলেও এখানে তার উল্লেখ করিতেছি। এক হাজার টাকা মন্ত্রি বেতনের নৈতিক ও অর্থনৈতিক যুক্তির বিরুদ্ধে লীগ-নেতাদেরও কিছু বলিবার ছিল না। তাঁদের একমাত্র যুক্তি ছিল, মাত্র এক হাজার টাকায় মন্ত্রীদের চলা অসম্ভব। সুতরাং প্রস্তাবটি অবাস্তব। লীগ নেতাদের এই যুক্তির জবাবে আমি বলিয়াছিলাম যে মন্ত্রীরা বিনা-তাড়ায় বাড়ি পাইবেন, বিনা-খরচে গাড়ি পাইবেন, ভ্রমণে টি এ. ডি.এ.পাইবেন, বিনা খরচে চাপরাশী আরদালী পাইবেন। সুতরাং হাজার টাকা বলিতে গেলে মন্ত্রীদের নিট আয় থাকিবে। অতএব টাকার অপ্রতুলতার যুক্তি ঠিক নয়। প্রস্তাবটা কাজেই অবাস্তব নয়।
আমার প্রস্তাবের সমর্থনে কংগ্রেসের পাঁচশ টাকা মন্ত্রি-বেতনের এবং অন্যান্য দেশের মন্ত্রি-বেতনের দু’একটা নযির দিলাম। এই তক স্বভাবতঃ খুবই গরম হইয়াছিল। উভয় পক্ষ হইতে তীব্র ও রুঢ় কথাও আদান-প্রদান হইতেছিল। হঠাৎ শহীদ সাহেব উত্তেজিত সুরে আমাকে বলিলেন : ‘তুমি দেড় শ টাকা আয়ের মফস্বলের উকিল। তুমি কলিকাতাবাসী ভদ্রলোকের বাসা-খরচের জান কি?’
আমি এই আক্রমণে আরও রাগিয়া গেলাম। পকেট হইতে এক টুকরা হিসাবের কাগ্য সশব্দে টেবিলের উপর রাখিয়া ক্রোধ-কম্পিত গলায় বলিলাম : এই হিসাবে কলিকাতাবাসী একটি ভদ্র-পরিবারের সমস্ত আবশ্যক খরচ ধরা হইছে। এতে শুধু মদ ও মাগির হিসাব ধরা হয় নাই। ও দুইটা ছাড়া আর কি এই হিসাবে বাদ পড়ছে, দেখাইয়া দেন।
শহীদ সাহেব রাগে চেয়ার ছাড়িয়া উঠিলেন। আমিও উঠিলাম। হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম আর কি? সভা ভাংগিয়া যায়। নবাব বাহাদুর হবিবুল্লাহ ছিলেন হাড়ে-মজ্জায় আদৎ শরিফ লোক। তিনি মধ্যে পড়িলেন। আমরা উভয়ে সমান দোষী হইলেও নিজের দলের শহীদ সাহেবকেই তিনি দোষী করিলেন এবং আমার কাছে মাফ চাইতে তিনি শহীদ সাহেবকে কড়া হুকুম দিলেন, অন্যথায় তিনি পদত্যাগ করিবেন বলিয়া হমকি দিলেন। কিন্তু এর দরকার ছিল না। শহীদ সাহেব দিল-দরিয়া লোক। তিনি হাত বাড়াইয়া শুধু আমার হাত ধরিলেন না, টানিয়া আমাকে জড়াইয়া ধরিলেন এবং বলিলেন : মাফ কর এবং তুলিয়া যাও। আমিও ঐ কথা বলিলাম। উভয়েই উভয়কে মাফ করিলাম বটে, কিন্তু ভুলিলাম না। সেই হইতে আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়িতে লাগিল। পরবর্তীকালে তিনি অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজ দিয়া আমাকে বিশ্বাস করিয়াছেন এবং আমি সাধ্যমত সে বিশ্বাস রক্ষা করিয়াছি।
