রাত্রে আমার একযিমাটা আরও বেশি টেকিয়া গেল। শরীরের তাপ বাড়িল। সকালে উঠিয়াই বুঝিলাম ঘটিতে পারি না। কুচকি ফুলিয়া গিয়াছে। কাজেই চেষ্টা চরিত করিয়া হক সাহেবের বাড়িতে পৌঁছাইতে আমার প্রায় এগারটা বাজিয়া গেল। তখন বোধ হয় আমার গায় এক শ’ তিন ডিগ্রি জ্বর। কিন্তু হক সাহেবের বাড়ি গিয়া যা শুনিলাম ও দেখিলাম, তাতে আমার জ্বর ছাড়িয়া শরীর-মন ঠাণ্ডা বরফ হইয়া গেল। নবাবযাদা হাসান আলী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির প্রভৃতি বন্ধুরা বিষণ্ণ মুখে কানাকানি করিতেছেন। আমার বিল দেখিয়া তাঁরা আমার উপর রাগ করিয়া আছেন। শামসুদ্দিন সাহেব ও আশরাফুদ্দিন সাহেব গোস্বা করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। এ সবের কারণ হক সাহেব শামসুদ্দিন সাহেবকে সংগে না লইয়াই শপথ নিতে চলিয়া গিয়াছেন। ইহাতে সবাই আপ-সেট হইয়া গিয়াছেন। গত রাত্রের ঘটনা বেচারারা কিছুই জানিতেন না। হক সাহেবের বাড়িতে যে লোকের ভিড় ছিল, তাঁদের অধিকাংশই স্বভাবতঃই আনন্দ-উল্লাসে মাতোয়ারা। বেচারা শামসুদ্দিনের কথাটা তাঁদের আনন্দের মাত্রা খুব বেণি কমাইতে পারে নাই। এই পরিবেশ আমাদের ভাল লাগিল না, অথবা আমাদের বিষণ্ণ মুখ তাঁদেরই ভাল লাগিল না। নিকটেই নবাবযাদা হাসান আলীর বাড়ি। আমরা সেখানে চলিয়া আসিলাম। ক্রমে সেখানেও ভিড় বাড়িল। আনেক গরম কথাবার্তা হইল। কিন্তু কোনও সিদ্ধান্ত করা গেল না। আমার শরীরের তাপ ও একফিমার টাটানি অসহ্য হইল। নবাবদা তাঁর গাড়িতে আমাকে বাসায় পৌঁছাইয়া দিলেন। আমার বাসা মানে বন্ধুবর আয়নুল হক খাঁ সাহেবের বাসা। তিনি তখন ৪৯ নং আপার সারকুলার রোডে থাকিতেন। আমি তাঁর মেহমান ছিলাম। নবাবযাদার বাড়ির বৈঠকে সাব্যস্ত হইল যথাসম্ভব সত্বর কলিকাতায় উপস্থিত সমস্ত কৃষক-প্রজা নেতাদের একটি সভা ডাকিয়া আমাদের কর্তব্য ঠিক করা হইবে।
৩. হক-মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ
বিকালের দিকে খবর পাইলাম হক মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করিয়াছেন। শামসুদ্দিন সাহেবের জায়গা খালি রাখা হয় নাই। তাঁর স্থলে নবাব মোশাররফ হোসেন সাহেবকে দিয়া কৃষক-প্রজা-কোটা পূর্ণ করা হইয়াছে। আমি আসমান হইতে পড়িলাম। ভয়ানক রাগ হইল। এমন সময় হক সাহেবের একখানা পত্র পাইলাম। নবাব্যাদা নিজেই এই পত্র লইয়া আসিয়াছেন। চিঠিখানা খুবই লম্বা। তাতে তিনি তাঁর স্বাভাবিক ওজস্বিনী ভাষায় সমস্ত অবস্থা বর্ণনা করিয়াছেন। অপর পক্ষ তাঁকে মন্ত্রিসভায় মাইনরিটি করিবার যে ষড়যন্ত্র করিয়াছিল তা রুখিবার জন্যই তিনি শামসুদ্দিনের সীটটা খালি না রাখিয়া নবাব মোশাররফ হোসেনকে দিয়া তা পূর্ণ করিয়াছেন। নবাব। সাহেব কৃষক-প্রজা পার্টির কার্যক্রম পুরাপুরি গ্রহণ করিয়াছেন। হক সাহেব আমাকে বিশ্বাস করিতে অনুরোধ করিয়াছেন যে কেবল মাত্র কৃষক-প্রজা-পার্টির স্বার্থেই তিনি এ কাজ করিয়াছেন। আমি কারও কথায় যেন তাঁকে তুল না বুঝি। যে মুহূর্তে তিনি বুঝিবেন যে তাঁর পক্ষে প্রজার স্বার্থরক্ষা অসম্ভব হইয়াছে সেই মুহূর্তে তিনি পদত্যাগ করিবেন। আমি যেন তাঁর উপর আস্থা রাখিয়া তাঁর কাজে সহযোগিতা করি। আমি যেন তাঁর পক্ষ হইতে শামসুদ্দিনকে বলি : হক সাহেব শামসুদ্দিনের কথা ভুলেন। নাই, তুলিবেন না; তাঁকে তিনি একদিন-না-একদিন মন্ত্রী করিবেনই। উপসংহারে তিনি আমার অসুখের জন্য দুঃখ করিয়াছেন এবং আল্লার কাছে আমার রোগমুক্তির জন্য সর্বদাই দোয়া করিতেছেন, তা লিখিয়াছেন। প্রথম সুযোগেই তিনি আমাকে দেখিতে আসিবেন সে আশ্বাসও দিয়াছেন।
হক সাহেবের এই পত্র লইয়া বিশেষ চিন্তা করিবার অবসর পাইলাম না। একা দু-দশ মিনিট শুইয়া থাকিতে পারিলাম না। সারা বিকাল কৃষক-প্রজা-নেতা ও এম এল এ-দের যাতায়াত চলিল। সন্ধ্যার দিকে শুনিলাম, ঐদিন প্রজা-নেতাদের জরুরী বৈঠক দেওয়া হইয়াছে। আমার সুবিধার জন্য আমারই বাসায় স্থান করা হইয়াছে। দুতালার বিশাল ছাদে সভার আয়োজন হইয়াছে।
সন্ধ্যার পর সিঁড়িতে অবিরাম জুতার খটাখট আওয়াযে বুঝিলাম সভার সময় হইয়াছে। ইযিচেয়ারে শোওয়াইয়া ধরাধরি করিয়া আমাকে ছাদে তুলা হইল। দেখিলাম অল্প কালের মধ্যেই আলো ও আসনের সুন্দর ব্যবস্থা হইয়াছে। আশাতীত রকম নেতৃ-সমাগম হইয়াছে। গম্ভীর পরিবেশে আলোচনা শুরু হইল। অল্পক্ষণেই সভা গরম হইয়া উঠিল। বক্তাদের কথায় বুঝা গেল হক সাহেব ইতিমধ্যেই প্রচার করিয়াছেন, আমার সম্মতি লইয়াই ঐ ভাবে মন্ত্রিসভা গঠন করিয়াছেন। আমার নিকট হক সাহেব পত্র লিখিয়াছেন, একথা দেখিলাম অনেক বক্তাই জানেন। অনেকেই আমার নিন্দা করিলেন। দু-দশ জন আমার নিকট লেখা হক সাহেবের পত্র দেখিতে চাহিলেন। আমার সৌভাগ্য বশতঃ নিন্দার ভাগী আমি একা ছিলাম না। বন্ধুবর আশরাফুদ্দিনকে আমার চেয়ে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা হইল। অনেক বাই বলিলেন, চৌধুরী আশরাফুদ্দিনের চেষ্টাতেই শামসুদ্দিন সাহেবকে বাদ দিয়া নবাব সাহেবকে নেওয়া হইয়াছে। আশরাফুদ্দিন সাহেবনবাব সাহেবকে লইয়া একাধিকবার হক সাহেবের সাথে দেখা করিয়াছেন তারও চাক্ষুষ সাক্ষী পর্যন্ত পাওয়া গেল। চৌধুরী সাহেব ও আমি উভয়েই আত্মপক্ষ সমর্থন করিবার চেষ্টা করিলাম। চৌধুরী সাহেবের বক্তব্য আমার ঠিক মনে নাই। তবে যতদূর মনে পড়ে তিনি বলিয়াছিলেন যে শামসুদিন সাহেবকে বাদ দেওয়া যখন একদম অবধারিত হইয়া গিয়াছিল, তখনই তিনি নিতান্ত মন্দের ভাল হিসাবে ঐ ব্যবস্থায় রাযী হইয়াছিলেন। আমি অসুখের দরুল বেশি কথা বলিতে পারিলাম না। তবে হক সাহেবের পত্রখানা আমার খুব উপকারে লাগিল। তাতে ইহা স্পষ্ট বোঝা গিয়াছিল যে হক সাহেবের কাজে আমার পূর্ব-সম্মতি ছিল
