দারওয়ান আমাদেরে লইয়া দুতালায় ড্রয়িংরুমে পৌঁছাইল। বিশাল অপরূপ সজ্জিত ড্রয়িংরুম। সমস্ত ফার্নিচার শান্তি নিকেতনের তৈরি। রাবীন্দ্রিক প্যাটার্নের। এক নলিনী বাবু আমাদেরে অভ্যর্থনা করিলেন। বুঝিলাম এই এনগেজমেন্ট আগেরই ঠিক করা। বিশাল কামারার এক কোণে তিন জন ঘেষাঘেষি করিয়া বসিলাম। সংগে-সংগেই কফি আসিল। বেয়ারাকে বিদায় দিয়া নলিনী বাবু নিজে কফি তৈয়ার করিতে এবং কথা বলিতে লাগিলেন। হক সাহেব ও নলিনী বাবু উভয়েই বলিলেন যে আজিকার আলোচ্য বিষয়টা ভয়ানক গোপনীয়; সুতরাং আমি এটা কারও কাছে ঘুণাক্ষরেও বলিতে পারিব না সে মর্মে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হইবে। আমি যথারীতি সে প্রতিশ্রুতি দিলাম। এরপর অনেক ভূমিকা করিয়া, একজন অপর জনের সমর্থন করিয়া, একজন অপর জনের মুখ হইতে কথা কাড়িয়া নিয়া, যা বলিলেন তার সারমর্ম এই যে শামসুদ্দিন সাহেবকে মন্ত্রী করিতে লাট সাহেব অসম্মত হইয়াছেন। তাঁর জন্য যিদ করিলে, তাঁকে বাদ দিয়া মন্ত্রিসভা গঠন না করিলে, পরের দিন শপথ নেওয়া হয় না। মন্ত্রিসভা গঠনে বিলম্ব হইয়া যায়। শেষ পর্যন্ত হক সাহেবের মন্ত্রিসভা নাও হইতে পারে। ইউরোপীয় দল সায় নামুদ্দিনকে প্রধান মন্ত্রী করিবার চেষ্টা আজ, ত্যাগ করে নাই। লাট সাহেব শামসুদ্দিন সাহেবের বিরুদ্ধে গিয়াছেন এই জন্য যে শামসুদ্দিন সাহেব অতীতে জেল খাঁটিয়াছেন এবং বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দ্রোহিতার আই. বি. রিপোর্ট আছে। আমি তর্ক করিলাম : জেল-খাটা কংগ্রেস নেতাদের মন্ত্রী করিতে লাট-বড়লাটের খোশামোদ করিতেছেন, মন্ত্রী নির্বাচনের একক অধিকার প্রধান মন্ত্রীর লাট সাহেবের তাতে হস্তক্ষেপের কোনও অধিকার নাই। মন্ত্রিসভা গঠনের শুরুতেই যদি প্রধান মন্ত্রী লাট সাহেবের ধমকে কাৎ হইয়া পড়েন তবে লাট সাহেব সুবিধা পাইবেন, কৃষক-খাতকদের স্বার্থের প্রতি কাজেই লাট সাহেব বাধা দিবেন ইত্যাদি। আমার চেয়ে অনেক বয়স্ক ও অভিজ্ঞ এই দুই নেতা আমাকে অনেকক্ষণ ধরিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। আমি বুঝিলাম না। বরঞ্চ তাঁদের কথায় আমার সন্দেহ হইল যে লাট সাহেবের কথাটা ভাওতা মাত্র। এই দুই নেতাই শামসুদ্দিন সাহেবকে বাদ দিবার সংকল্প করিয়াছেন। কাজেই আমার যিদ বাড়িয়া গেল। তাছাড়া যুক্তিতেও তাঁরা আমার সহিত পারিয়া উঠিতেছিলেন না। তাঁদের একমাত্র যুক্তি ছিল এই যে শামসুদ্দিন সাহেবকে লাট সাহেব কিছুতেই গ্রহণ করিবেন না। তাঁরে নিয়া যিদ করিলে সার নাযিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হইয়া যাইতে পারেন। আমাদের কাছে তৎকালে এই এক যুক্তিই লাখ যুক্তির সমান। কাজেই আমি বোধ হয় দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিলাম। একদিকে প্রিয় বন্ধু ও কৃষক-প্রজা সমিতির সেক্রেটারি নির্যাতিত ও ত্যাগী দেশ-কমী শামসুদ্দিনের মন্ত্রিত্ব, অপর দিকে কোটি-কোটি কৃষক খাতকের স্বার্থ। বোধ হয় একটু বাহ্যজ্ঞানও হারাইয়া ছিলাম। খুব সম্ভব কল্পনা রাজ্যে বিচরণ করিতেছিলাম। দু’জনের কে ঠিক মনে নাই, একজন বলিলেন, শামসুদ্দিনের সীটটা খালি রাখিয়া পরের দিন দশজন মন্ত্রী লইয়া মন্ত্রিসভা গঠিত হইয়া যাক, পরে লাট সাহেবকে বুঝাইয়া-সুঝাইয়া রাযী করিয়া শামসুদ্দিনকে নিলেই চলিবে। আমি বোধ হয় মন্দের ভাল হিসাবে এতেই রাযী হইয়াছিলাম। কারণ এক সময় যখন নলিনী বাবু আমার জবাবের জন্য যিদ করিতেছিলেন, তখন আমার পক্ষ হইতে হক সাহেবই জবাব দিয়াছিলেন : সে ত জবাব দিয়াই দিছে। আগামীকাল দশজনের মন্ত্রিসভা করতে তার ত আপত্তি নাই। আবুল মনসুর, চল এইবার উঠি।
হক সাহেব সত্যসত্যই উঠিয়া পড়িলেন। আমি শেষ চেষ্টা স্বরূপ বলিলাম। ‘শামসুদ্দিনকে তবে কবে নেওয়া হৈব?’ হক সাহেব আমার হাত ধরিয়া টানিতে টানিতে বলিলেন : ‘লিভ ইট টুমি। আমি কি সমিতির সেক্রেটারি ছাড়া বেশি দিন মন্ত্রিত্ব করতে পারব? যত শীঘগির পারি তারে নিয়া নিবই। এইটা আমার ওয়াদা, তারে আমি একদিন মন্ত্রী করবই। তুমি কোনও চিন্তা কৈর না।‘
ফিরিবার পথে গাড়িতে হক সাহেব আমাকে বলিলেন : দেখছ মনসুর, বেটার শয়তানিটা? কি কৌশলেই না সে হিন্দু-মুসলিম মন্ত্রীদের সংখ্যা সমান করবার ব্যবস্থা কৈরা ফেলছে। নিশ্চয়ই বেটা লাটে বুদ্ধি এটা।
আমি চমকিয়া উঠিলাম। এই দিক হইতে ব্যাপারটা আমি মোট্রেই চিন্তা করি নাই ত। হক সাহেব আরও দেখাইলেন যে লোকটা যে শুধু হিন্দু-মুসলিম কোটাই ফিফটি ফিফটি করিতেছে তা নয়। মুসলিম কোটায় মুসলিম লীগের মোকাবিলায় হক সাহেবের পার্টির দুইজন করিতেছে। মন্ত্রিসভায় তাঁকে মাইনরিটি করিবার ব্যবস্থা হইয়াছে। প্রধান মন্ত্রী হইয়াও তিনি কিছু করিতে পারিবেন না। প্রজা-পার্টির কোটায় আর নেওয়াই বা যায় কাকে? আমি একগুয়েমি করিয়া দাঁড়াই নাই। রেযায়ে করিম ও হুমায়ুন কবিরটা ইলেকশনে ফেল করিয়াছে। হাসান আলীটা একেবারে নাবালক ইত্যাদি।
একদমে একতরফাভাবে এই সব কথা বলিতে-বলিতে গাড়ি আমার বাসার সামনে আসিয়া পড়িল। আমি কোনও জবাব দিতে পারিলাম না, আমার পায়ের একযিমাটা খুবই টাটাইতেছিল। এতক্ষণে শরীরে বেশ তাপ উঠিয়াছে বলিয়া মনে হইল। আদাব দিয়া বিদায় হইলাম। পরদিন সকাল দশটার আগেই তার বাসায় যাইতে আমাকে নির্দেশ দিয়া হক সাহেব চলিয়া গেলেন।
