আমরা অগত্যা নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। হক সাহেব শরৎ বাবুর উপর যা রাগিয়াছিলেন, তার সবটুকু ঢালিলেন আমাদের উপর। বিনা বাক্যব্যয়ে হক সাহেবের গালাগালি মাথায় লইয়া তাঁকে তাঁর বাসায় পৌঁছাইয়া দিলাম। আমরা সকলে একমত হইলাম যে কংগ্রেস নেতৃত্বের দোষে আজ বাংলার কপাল পুড়িল। পরবর্তী ঘটনাবলী আমাদের এই আশংকার সত্যতা প্রমাণ করিয়াছে।
ও-দিকে গুপ্ত সাহেবের বাড়িতে আমাদের আলোচনা-সভা চলিতে থাকা কালে মুসলিম লীগের এজেন্টরা কাছে-ন্যদিকেই ওৎ পাতিয়া সময় কাটাইতেছিলেন। আমাদের আপোস-রফা ভাংগিয়া যাওয়ার পরক্ষণেই তারা আমাদের সেক্রেটারি মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদকে একরূপ কিডন্যাপ করিয়া ঢাকার নবাব বাহাদুরের বাড়িতে নিয়া যান। মুসলিম লীগ নেতাদের অনেকেই সেখানে অপেক্ষা করিতেছিলেন। শামসুদ্দিন সাহেবের সহিত তারা আলোচনা করেন। শরৎ বাবুর বাড়ি হইতে সবে মাত্র আমরা হক সাহেবের বাড়িতে পৌঁছিয়াছি, অমনি শামসুদ্দিন সাহেব হাঁপাইতে-হপাইতে খবর লইয়া আসিলেন, হক সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী মানাসহ কৃষক-প্রজা পার্টির সমস্ত কার্যক্রম মানিয়া লইয়া মুসলিম লীগ আমাদের সাথে কোয়ালিশন করিতে রাযী হইয়াছেন। তখনকার মানসিক অবস্থায় হক সাহেব স্বভাবতঃই সোল্লাসে ঐ প্রস্তাব মানিয়া লইলেন। আমরাও অগত্যা সম্মতি জানাইলাম।
১০. হক মন্ত্রিসভা গঠন
হক মন্ত্রিসভা গঠন
দশই অধ্যায়
১. কৃষক-প্রজা-মুসলিম লীগ কোয়েলিশন
কংগ্রেস-নেতাদের সাথে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হওয়ায় লীগ-নেতাদের সাথে আলাপ আলোচনায় কোনও অসুবিধা হইল না। ফলে এক দিনেই সব ঠিক হইয়া গেল। এগার জনের মন্ত্রিসভা হইবে। মুসলমান ছয়, হিন্দু পাঁচ। মুসলিম ছয় জনের মধ্যে কৃষক প্রজা তিন, মুসলিম লীগ তিন। হিন্দু পাঁচ জনের মধ্য বর্ণহিন্দু তিন জন ও তফসিলী হিন্দু দুইজন থাকিবেন। মুসলিম লীগ মন্ত্রীদের নাম আগেই ঠিক হইয়া গিয়াছিল। কৃষক-প্রজা পার্টির তরফে হক সাহেব ছাড়া আর থাকিবেন মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী ও মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ। লীগ পক্ষে থাকিবেন নবাব বাহাদুর হবিবুল্লাহ, সার নাযিমুদ্দিন, মিঃ শহীদ সহরাওয়াদী। দুই-এক দিনের মধ্যে হিন্দু মন্ত্রীদেরও নাম ঠিক হইয়া গেল। বর্ণ হিন্দুদের পক্ষে থাকিবেন মিঃ নলিনী রঞ্জন সরকার, মিঃ বিজয় প্রসাদ সিংহ রায় ও কাসিম বাজারের মহারাজা শ্রীশ নন্দী। তফসিলী হিন্দুদের পক্ষে থাকিবেন মিঃ মুকুন্দ বিহারী মল্লিক ও মিঃ প্রসন্নদেব রায়কত।
২. গভীর রাত্রের নাটক
অতঃপর আমার কোনই কাজ ছিল না। তবু বন্ধুদের অনুরোধে সুয়ারিং-ই সিরিমনিটা দেখিবার জন্য কলিকাতায় আরেক দিন থাকিয়া গেলাম। পরদিন সুয়ারিং হইবে। সার্বিক শান্তি ও আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে হঠাৎ বিকালের দিকে গুজব রটিল বন্ধুবর শামসুদ্দিন বাদ পড়িয়া যাইতেছেন। শামসুদ্দিন সাহেব স্বভাবতঃই চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। আমরাও কম চঞ্চল হইলাম না। সন্ধ্যার শো সিনেমা দেখার প্ল্যান স্যাক্রিফাইস করিয়া বন্ধু-বান্ধব সহ হক সাহেবের কাছে গেলাম। তিনি গুজবের সত্যতা অস্বীকার করিলেন। আমরা খুশী হইয়া বিদায় হইলাম। কিন্তু হক সাহেব সকলকে বিদায় দিয়া শুধু আমাকে থাকিতে বলিলেন। রাত্রি নয়টার সময় তিনি একা আমাকে লইয়া বাহির হইলেন। ড্রাইভারকে কিছুই বলিলেন না। অথচ ডাইভার মাত্র পাঁচ-সাত মাইল বেগে যেন নিজের ইচ্ছামত গাড়ি চালাইতে লাগিল। অনেকক্ষণ চালাইল। মনে হইল সারা কলিকাতা শহর ঘুরিল। ঘোড়ার গাড়ি এমনকি রিকশা সামনে পড়িলেও তা পাশ কাটাইয়া গেল না। পিছন-পিছন যাইতে লাগিলাম। আমি প্রথমে এ সব কিছুই লক্ষ্য করিলাম না। কারণ হক সাহেব খুব উঁচু স্তরের কথাবার্তা বলিতে থাকিলেন। বাংলার সাত কোটি গরিব কৃষক-প্রজার ডাল-ভাত্রে ব্যবস্থা করিবার যে মহান দায়িত্ব ও পবিত্র কর্তব্য আল্লাহ আজ তাঁর ঘাড়ে চাপাইয়া দিয়াছেন, সেটা তিনি কেমন করিয়া যে পালন করিবেন, সে চিন্তায় তীর বুক কাঁপিতেছে। শুধু মুখে বলিলেন না, আমার একটা হাত টানিয়া নিয়া তীর বুকে লাগাইলেন। সত্যই তাঁর বুক ধড়ফড় করিতেছিল। পরম ভক্তিতে আমার বুক ভরিয়া গেল। এই সব কথার মধ্যে হক সাহেবের গাড়ি মাত্র দুইবার থামিল। একবার বেনিয়াপুকুর রোডের এক দর্যির দোকানে; আরেকবার মেছুয়া বাজার স্ট্রিটের এক হাকিম সাহেবের ডিস্পেনসারিতে। দুই জায়গায় তিনি বড় জোর আধ ঘন্টা খরচ করিলেন। বাকী সব সময় গাড়ি চলিতেই থাকিল। ঐ সব উঁচুস্তরের কথার উপসংহারে হক সাহেব বলিলেন যে তাঁর ঐ মহান দায়িত্ব পালনে গরিবের দুশমনরা অনেক রকমে বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করিবে। এসব বিঘ্ন অতিক্রম করিতে আল্লাহ তাঁহাকে নিশ্চয়ই সাহায্য করিবেন। তবে তিনি সে কাজে আমার সহযোগিতার উপর অনেকখানি নির্ভর করেন।কারণ আমি মন্ত্রী-মেম্বর না হওয়ায় আমার মূল্য, সকলের কাছে অনেক বেশি। আমি গর্ব ও আনন্দে উৎসাহের সংগে সে আশ্বাস দিতে দিতেই গাড়ি আসিয়া একটা প্রাসাদের গাড়ি-বারান্দায় থামিল। একটা লোক দৌড়িয়া আসিয়া গাড়ির দরজা খুলিয়া হক সাহেবকে কুর্নিশ করিল। হক সাহেব বাহির হইলেন। অপর দিককার দরজা দিয়া আমি বাহির হইলাম। বাহির হইয়াই বুঝিলাম এটা মিঃ নলিনী রঞ্জন সরকারের লোয়ার সারকুলার রোডস্থ প্রসাদতুল্য বাড়ি ‘রঞ্জনী’। বারান্দার বিশাল ঘড়িতে দেখিলাম বারটা বাজিবার মাত্র পাঁচ মিনিট বাকী।
