করতালি-ধ্বনি থামিলে আমি দাঁড়াইলাম। আমি সেই দিনই মফস্বল হইতে আসিয়াছি বলিয়া এই প্রথম কার্যক্রমটি শুনিলাম। অতি চমৎকার হইয়াছে। এটাকে আইডিয়াল মেগনাকার্টা-অব-বেংগল বলা যায়। মুসাবিদাকারীকে ধন্যবাদ। কংগ্রেস ও কৃষক-প্রজা নেতাদেরে ধন্যবাদ। এ সব কথা বলিয়া শেষে বলিলাম : আমার সামান্য একটু সংশোধনী প্রস্তাব আছে। নেতাদের উজ্জ্বল মুখ হঠাৎ অন্ধকার হইয়া যাইতেছে দেখিয়া তাড়াতাড়ি যোগ করিলাম : এটাকে সংশোধন বলা অন্যায় হইবে শুধু ক্রমিক, নম্বরের একটু ওলট-পালট মাত্র।
৮. কংগ্রেস-নেতাদের অদূরদর্শিতা
মিঃ গুপ্তের পঠিত শর্তনামায় ক্রমিক নম্বর ছিল এইরূপ: (১) স্বরাজ দাবির প্রস্তাব গ্রহণ, (২) রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি, (৩) প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, (৪) মহাজনী আইন পাস ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি প্রস্তাব করিলাম যে শুধু ২নং দফাঁকে ৩নং ও ৪নং দফার নিচে আনিয়া ক্রমিক নম্বর সংশোধন করা হউক। আমার এই প্রস্তাবের সমর্থনে আমি যা বলিলাম তার সংক্ষিপ্ত সার-মম এই রাজনৈতিক বন্দী মুক্তির প্রশ্নে লাট সাহেব যদি ভেটো করেন তবে মন্ত্রিসভাকে আলু-সম্মানের খাতিরে পদত্যাগ করিতে হইবে। কংগ্রেস-নেতাদের কেউ কথায় কেউবা মাথা ঝুকাইয়া আমার কথায় সায় দিলেন)। সে অবস্থায় আইন-পরিষদের পুননির্বাচন হইতে পারে। (এ কথায়ও কংগ্রেস নেতারা সায় দিলেন)। সে নির্বাচনে কৃষক-প্রজা সমিতি মুসলিম লীগের কাছে হারিয়া যাইবে। কারণ সকলেই জানেন, নির্বাচনের সময় তারা কৃষক প্রজা-সমিতিকে কংগ্রেসের লেজুড় আখ্যা দিয়াছে এবং কৃষক-খাতকের কল্যাণের সমস্ত ওয়াদাকে ভাওতা বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। এখন যদি কৃষক ও খাতকদের হিতের কোনও আইন পাস না করিয়াই আমরা রাজনৈতিক ইতে পদত্যাগ করি, তবে মুসলিম লীগের সেই মিথ্যা অভিযোগকে সত্য প্রমাণ করা হইবে। অতএব আমার নিবেদন এই যে, মন্ত্রিসভা আগে কৃষক-প্রজা সমিতির ওয়াদা-মাফিক প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন করিবেন, ধাতকদেরে রক্ষার জন্য মহাজনি আইন পাস করিবেন, এবং কৃষি-খাতকদের জন্য সালিশী বোর্ড গঠন করিবেন। এসব কাজ করিবার পর রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থা করিবেন, এবং বিনা বিচারে আটকের আইন বাতিল করিকেন। লাট সাহেব এতে বাধা দিলে আমরা মন্ত্রিসভা হইতে এবং আইন-পরিষদ হইতে সদলবলে পদত্যাগ করিব, পুননির্বাচনের দাবি করিব। গোটা দেশবাসী আমাদের সমর্থন করিবে। সে নির্বাচনে কংগ্রেস সমস্ত হিন্দু সীট এবং কৃষক-প্রজা সমিতি সমস্ত মুসলিম শীট দখল করিবে।
সমবেত মুসলিম নেতাদের প্রায় সকলেই আমার কথার সমর্থন করিলেন। কিন্তু কংগ্রেস-নেতারা তা করিলেন না। তাঁরা আবেগময়ী ভাষায় বলিলেন রাজনৈতিক বন্দী-মুক্তির প্রশ্নটা জাতীয় সম্মান-অসম্মানের প্রশ্ন। বিশেষতঃ আন্দামান দ্বীপে তখন শত শত বাংগালী রাজনৈতিক বন্দী অনশন করিয়া জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে উদ্বেগজনক সময় অতিবাহিত করিতেছেন। এই প্রশ্নের সাথে কৃষক-খাতকের অর্থনৈতিক প্রশ্নের তুলনা হইতে পারে না।
উভয় পক্ষ হইতেই যুক্তি-তর্ক দেওয়া হইতে লাগিল। কিন্তু উভয় পক্ষ অটল রহিলেন। চার-পাঁচ ঘন্টা আলোচনায় এই অচল অবস্থার কোনও অবসান ঘটিল না। রাত প্রায় একটায় সময় সভা ভাগিয়া গেল। সকলেই বিমর্ষ হইয়া মিঃ গুণ্ডের বাড়ি হইতে বাহির হইলাম।
এই ঘটনা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু-নেতাদের অদূরদর্শী অনুদারতায়কিতাবে ছোট-ছোট ব্যাপার হইতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে দূরত্ব প্রসারিত হইয়াছে, এই ঘটনা তার একটা জামান প্রমাণ। যদি ঐদিন কংস কৃষক-প্রজা পার্টিতে আপোস হইয়া যাইত, তবে কি হইত একবার অনুমান করা যাক। হক সাহেবের মত সবল ও জনপ্রিয় নেতা কংগ্রেসের পক্ষে থাকিতেন, মুসলিম লীগে যাইতে বাধ্য হইতেন না। বাংলার কৃষক-প্রজারা কংগ্রেসের প্রতি আস্থাশীল হইত।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবির নবাবধাদা হাসান আলী ও আমি নবযাদার বাড়িতে বসিয়া চরম অস্বস্তির মধ্যে ব্যাপারটার পর্যালোচনা করিলাম। কংগ্রেস-নেতাদের আবেগময়ী বক্তৃতার জবাবে শেষ পর্যন্ত আমরা রাজনৈতিক বন্দী মুক্তির দফাটা দুই নরে রাখিতেও রাখী হইয়াছিলাম, কেবল শর্ত করিয়াছিলাম যে লাট সাহেব ঐ প্রস্তাব ভেটো করিলে মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করিবেন না। পদত্যাগ যদি করিতেই হয়, তবে প্রজাস্বত্ব ও মহাজনি আইন পাস করার পরই তা করা হইবে। কংগ্রেস-পক্ষ তাতেও রাযী হন নাই। আমরা তিন বন্ধুতে পর্যালোচনা করিয়া একমত হইলাম যে শরৎ বাবুকংগ্রেস-নেতাদের এই মনোতাবে অসন্তুষ্ট ও দুঃখিত হইয়াছেন। তিনি এই ইশুতে আপোস-রফা ভাংগিয়া দিতে রাখী ছিলেন না। অতএব আমরা ঠিক করিলাম রাজনীতির পাশ কর শরৎ বাবুর সাথে একা দেখা করিতে হইবে। এই রাত্রেই করিতে হইবে। কারণ আমাদের চক্ষে ঘুম নাই। আর একরাত্রে কত কি হইয়া যাইতে পারে।
৯. কংগ্রস-কৃষক প্রজা আপোস-চেষ্টা ব্যর্থ
যেমন কথা তেমনি কাজ। আমরা তিন বন্ধুতে গেলাম হক সাহেবের বাড়ি। তাঁকে অনেক বুঝাইয়া নিয়া গেলাম শরৎ বাবুর বাড়িতে। রাত্রি তখন আড়াইটা কি তিনটা। অনেক ডাকাডাকি করিয়া দারওয়ানকে জাগাইলাম। তার আপত্তি ঠেলিয়া ভিতরে গেলাম। হক সাহেবের নামের দোহাই-এ দারওয়ান অনিচ্ছা সত্ত্বেও উপরে গেল। প্রায় পনর বিশ মিনিট পরে মিসেস বোস নিচে নামিয়া আসিয়া জানাইলেন। তিনি খুবই দুঃখিত, শরৎ বাবুর মাথা ধরিয়াছে। বেদনায় ছটফট করিয়া এইমাত্র তিনি একটু সুমাইয়াছেন। তিনি কিছুতেই তাঁর ঘুম ভাংগাইবেন না।
