৬. জয়-পরাজয়ের খতিয়ান
এত সাধের ইলেকশন, এত শ্রমের জয়, সব গোলমাল হইয়া গেল নির্বাচনের পরে। দেখা গেল, একশ উনিশটা মুসলিম আসনের মধ্যে কৃষক-প্রজা পার্টি মাত্র তেতাল্লিশটা পাইয়াছে। আমাদের হিসাব মতে মুসলিম লীগ পাইয়াছে মাত্র আটত্রিশটা। আমাদের দেশে, বিশেষতঃ মুসলিম সমাজে, তখনও পার্টি-সিস্টেম ও পার্টি-আনুগত্য সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা দানা বাঁধে নাই। কাজেই সুস্পষ্ট ইওর উপর দুইদলের মুখামুখি নির্বাচন-যুদ্ধ হওয়ার পরও দেখা গেলে যে কোন দলের ঠিক কতজন নির্বাচিত হইয়াছেন, তা অস্পষ্টই রহিয়া গিয়াছে। দেখা গেল, অনেক অদলীয় মেরও নিজেদের সুবিধামত দুই দলের কোনও একদলে ভিড়িয়া পড়িতেছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত হিসাব-নিকাশ করিয়া বুঝা গেল মুসলিম লীগ পার্টির মহিলা ও শ্রমিক সদস্য সহ ষাটজনের বেশি সদস্য হইয়া গিয়াছেন। টানিয়া-বুনিয়া আমরাও আমাদের আটান্ন জন মৈন আছেন দাবি করিতে লাগিলাম। এছাড়া পঁচিশ জন ইউরোপীয়ান ও চারজন এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এই মোট উনত্রিশ জন সদস্য লাট সাহেবের ইশরায় মুসলিম লীগ দলকেই সমর্থন করিবেন। এটা এরূপ ধরা কথা। যাঁরাই মন্ত্রিসভা গঠন করিবেন, তফসিলী হিন্দুদের অন্ততঃ কুড়িজন মেম্বর তাঁদেরই সমর্থন করিবেন, এটাও স্পষ্ট বোঝা গেল। এ সব হিসাব করিয়াও কিন্তু মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভা গঠনের সম্ভাবনা ছিল না। তৎকালে আইন পরিষদে মোট মেম্বর-সংখ্যা ছিল আড়াইশ। তার মধ্যে বিশেষ নির্বাচক-মণ্ডলীর প্রতিনিধিসহ মুসলমান ১২২, বর্ণহিন্দু ৬৪, তফসিলী হিন্দু ৩৫, ইউরোপীয়ান ২৫ ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ৪। বৰ্ণহিন্দু ও তফসিলীদের মিলাইয়া যাটের উপর ছিলেন কংগ্রেসী। এঁরা মুসলিম লীগকে কিছুতেই সমর্থন করিবেন না। মাদ্রাজা-বোম্বাই ও যুক্ত-প্রদেশের লীগ-কংগ্রেস আপোস সত্ত্বেও বাংলায় এই পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। এ অবস্থায় সমস্ত শ্বেতাংগ সদস্য, এক ডজন হিন্দু রাজা মহারাজ ও কুড়িজন তফসিলী হিন্দু মুসলিম লীগকে সমর্থন করিলেও তাঁরা মন্ত্রিসভা গঠন করিতে পারেন না। পক্ষান্তরে কৃষক-প্রজা সমিতি তা পারে। কারণ কৃষক-প্রজা পার্টি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। একমাত্র জামিদারি উচ্ছেদের চরমপন্থী দাবির জন্যই অধিকাংশ বর্ণহিন্দু এই পার্টির বিরোধী। এটাই ফয়সালা হইয়া যাইবে হিন্দুসমাজে নির্বাচন-যুদ্ধ হক সাহেবের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার দ্বারা। গোড়াতে শ্বেতাংগরা হক সাহেব ও তাঁর দলকে সমর্থন করিবেন না বটে, কিন্তু একটা মন্ত্রিসভা গঠিত হইয়া গেলে তারা সে মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করিবেন ইহাই শ্বেতাংগদের নীতি।
৭. কংগ্রেস-প্রজা পার্টি আপোস চেষ্টা
এ অবস্থায় মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয় দলই কৃষক-প্রজা পার্টির সংগে আপোস করিতে চাইলেন। কংগ্রেস মতি গ্রহণ করিবে না, এটা আগেই ঘোষণা করায় আমরা কংগ্রেসের সহিত কোয়েলিশন করাই অধিকতর সুবিধাজনক মনে করিলাম। কারণ এতে হক সাহেবের প্রধান মন্ত্রিত্ব অবধারিত হয়। কৃষক-প্রজা দলের বেশি লোককে মন্ত্রী করা যায়। পক্ষান্তরে মুসলিম লীগের প্রধান মন্ত্রিত্বের দাবি আছে। কাজেই মুসলিম লীগের প্রসারিত হাত অগ্রাহ্য করিয়া আমরা কংগ্রেসের সহিত কথা চালাইলাম। কংগ্রেসের সহিত মূলনীতিগত ঐক্যমত থাকায় আপোসের শর্ত নির্ধারণ অতি সহজ মনে হইল। কতিপয় বড়-বড় শর্ত ঠিক হওয়ার পরই বিশেষ ধরুরী কাজে আমি ময়মনসিংহ চলিয়া আসিলাম। কথা থাকিল, সব চূড়ান্ত হওয়ার সময় আমি আবার আসিব। মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী, মৌঃ শামসুদ্দিন, মৌঃ আশরাফুদ্দিন চৌধুরী, অধ্যাপক হুমায়ুন করিব, নবাবযাদা হাসান আলী প্রভৃতি আমার চেয়ে যোগ্য বন্ধুরা আলোচনার দায়িত্ব নেওয়ায় আমি নিশ্চিন্তে ময়মনসিংহে চলিয়া আসিলাম। দুই তিন দিন যাইতে না-যাইতেই হক সাহেবের টেলিগ্রাম পাইয়া ছুটিয়া গেলাম। হক সাহেব বড় খুশী। তিনি খুশীতে তাঁর বেলচার মত হাত দিয়া আমার পিঠে থাপ্পড় মারিতে লাগিলেন। কংগ্রেস আমাদের সকল শর্ত মানিয়া লইয়াছে। আমিও উল্লসিত হইলাম।
সেদিনই রাত্রি আটটায় মিঃ জে. সি. গুপ্তের বাড়িতে ডিনার। সেখানে চূড়ান্ত শর্তাবলী উভয় পক্ষের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক স্বাক্ষরিত হইবে। উভয় পক্ষে আট অথবা দশ জন করিয়া বোল অথবা কুড়ি জনের ডিনার। আমাদের পক্ষে হক সাহেব, সৈয়দ নওশের আলী, শামসুদ্দিন, আশরাফুদ্দিন, নবাবযাদা খানবাহাদুর হাশেম আলী, অধ্যাপক কবির, ডাঃ আর. আহমদ ও আমি প্রভৃতি, কংগ্রেস পক্ষ হইতে মিঃ শরৎ বসু, নলিনী সরকার, ডাঃ বিধান রায়, জে এম.দাশগুপ্ত, কিরণ শংকর রায়, সন্তোষ কুমার বসু, ধীরেন্দ্র নাথ মুখার্জী ও জে.সি. গুপ্ত প্রভৃতি। হৃদ্যতার আবহাওয়ার মধ্যেই আলাপ-আলোচনা চলিল। শর্তাবলী আগেই ঠিক হইয়া গিয়াছে বলিয়া আপোস রফার কোনও কথাই উঠিল না। শুধু ভবিষ্যৎ লইয়াই রংগিন চিত্র আঁকার প্রতিযোগিতা চলিল। ডিনার খাওয়া হইল। মিঃ গুপ্ত আমিরী-বাদশাহী আনার জন্য মহর ছিলেন। ডিনারে ভাই হইল। খাওয়ার পরে শর্তাবলী দস্তখতের সময় আসিল। গুপ্ত সাহেব আগেই সব টাইপ করাইয়া রেডি রাখিয়াছিলেন। তিনি সে সব কাগয হাযির করিলেন। নেতাদের ইশারায় তিনি শর্তনামাটি পড়িয়া শুনাইলেন। শর্তনামার ক্ষুদ্র ভূমিকায় দেশের এই সন্ধিক্ষণে কংগ্রেস ও কৃষক-প্রজা পার্টির মত দুইটি প্রগতিবাদী প্রতিষ্ঠানের কোয়ালিশনের আবশ্যকতা সংক্ষেপে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় বর্ণনা করা হইয়াছে। তারপরেই ক্রমিক নম্বর দিয়া মন্ত্রিসভার করণীয় কার্যাবলীর তালিকা দেওয়া হইয়াছে। তাতে কংগ্রেস ও কৃষক-প্রজা সমিতির ইলেকশন মেনিফেস্টোর প্রধান-প্রধান ধারা যথা জাতীয় দাবি, রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি, প্রজা স্বত্ব আইন, মহাজনী আইন, কৃষি ঋণ, সালিশী বোর্ড, অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা ইত্যাদি সমস্ত প্রগতিমূলক কার্যক্রমই ছিল। মিঃ গুপ্তের পড়া শেষ হইলে করতালি-ধ্বনিতে কার্যক্রমটি অভিনন্দিত হইল।
