যুক্তসভার মধ্যে খোদ ভূয়াপুরের সটাই ছিল সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। এটা ইব্রাহিম খাঁ সাহেবের কর্মক্ষেত্র। এই স্থানটাকে উন্নত করার কাজে প্রিন্সিপাল সাহেব তাঁর কর্মজীবনের বেশির ভাগ ব্যয় করিয়াছেন। এই ভূয়াপুরেই নির্বাচনী যুক্ত স। অঞ্চলের সবচেয়ে মান্যগণ্য সবচেয়ে বয়োজ্যষ্ঠ এক মুরুব্বিকে সভাপতি করা হইল প্রিন্সিপাল সাহেবের প্রস্তাব-মত। কথা হইল। তিনি আর আমি মাত্র এই দুই জন বক্তৃতা করিব। আমাদের বক্তৃতা শেষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নবাবযাদা দাঁড়াইয়া জনসাধারণকে শুধু একটা সেলামালেকুম দিবেন।
প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ রাজনীতি, সাহিত্য-সাধনা ও প্রজা-আন্দোলন সব ব্যাপারেই আমার নেতা ও মুরুব্বি। ছাত্রজীবনেও তিনি ছিলেন আমাদের নেতা ও ‘হিরো’। তাঁরই সংগে নির্বাচনী বক্তৃতার লড়াই করিতে হইতেছে। এর একটু ইতিহাস আছে। প্রিন্সিপাল সাহেব ময়মনসিংহ প্রজা-আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি টাংগাইল মহকুমা প্রজা-সমিতির প্রেসিডেন্ট। কাজেই স্বভাবতঃই তিনি নির্বাচনে প্রজা-সমিতির মনোনয়ন চাহিয়া দরখাস্ত দিলেন। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে একটা চিঠিও দিলেন। প্রজা-সমিতি তাঁর মত যোগ্য ব্যক্তি ও প্রবীণ নেতাকে মনোনয়ন দিবে নিশ্চয়ই। কিন্তু একটু অসুবিধা হইল এই যেনবাবযাদা হাসান আলী এবং প্রিন্সিপাল সাহেব একই এলাকার লোক। মনোনয়ন চাইলেন উভয়ে একই এলাকা হইতে। আমি বিষম বিপদে পড়িলাম। নবাবদাকে নিজ এলাকা হইতে নমিনেশন না দিলে আর দেওয়াই যায় না। তিনি তরুণ ও অপরিচিত। যা-কিছু পরিচয় তাঁর বাপের নামে। প্রজাদের পক্ষে সেটা সুপরিচয় নয়। পক্ষান্তরে প্রিন্সিপাল সাহেব সারা বাংলায় সুপরিচিত। যে কলেজের তিনি প্রিন্সিপাল সেই করটিয়া কলেজ মধ্য টাংগাইল নির্বাচকমণ্ডলীতে অবস্থিত। তাঁর শক্তির উৎস যে ছাত্র-শক্তি, সেই ছাত্র বাহিনী মধ্য টাংগাইলে অবস্থিত। কলেজের সেক্রেটারি টিয়া স্টেটের মোতায়ারি নবাব মিয়া সাহেব (মসউদ আলী খান পন্নী) মধ্য-টাঙ্গাইলে দাঁড়াইলে প্রিন্সিপাল সাহেবের যে অসুবিধা ও বেকায়দা হইত তাও হয় নাই। কারণ নবাব মিয়া সাহেব দাঁড়াইয়াছেন দক্ষিণ টাংগাইল নির্বাচনী এলাকাতে। এসব কথাই আমি প্রিন্সিপাল সাহেবকে পত্রে ও মূখে বুঝাইলাম। এর উপরও আরও দুইটা কথা বলিলাম। এক, তাঁর মত শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ব্যক্তিকে এ জিলার যেকোন নির্বাচনী এলাকা হইতে পাস করাইয়া আনিবার মত প্রভাব ও জনপ্রিয়তা এজা-সমিতির আছে এবং তা করিবার গ্যারান্টিও আমি দিলাম। দুই, নবাবযাদাকে তাঁর জমিদারির বাহিরে অন্য কোন নির্বাচনী এলাকাতে খাড়া করিলে লোকেরা বলিবে অত্যাচারী জমিদার হিসাবে নিজের জমিদারিতে তোট পাইবেন না বলিয়াই নবাবযাদা অন্যখানে দাঁড়াইয়াছেন। অতএব হয় নবাদকে মংপুর-গেপালপুরে দাঁড় করাইতে হয়, নয়ত তাঁকে এক বাদ দিতে হয় এই উত্মকুল রক্ষার জন্য নবাবদা ও প্রিন্সিপাল সাহেবের কেসটা কেন্দ্রীয় গামেন্টারি বোর্ডের কাছে দেওয়া হইল। তাঁরাও আমার সমর্থন করিলেন। নবাদাকে উত্তর-টাঙ্গাইল ও প্রিন্সিপাল সাহেবকে মধ্য-টাংগাইলে মনোনয়ন দেওয়া হইল।
কিন্তু প্রিন্সিপাল সাহেব আমাদের মনোনয়ন অগ্রাহ্য করিয়া উত্তর-টাংগাইলে মনোনয়নপত্র দাখিল করিলেন এবং মুসলিম লীগের টিকিট চাইলেন। মুসলিম লীগ প্রিন্সিপাল সাহেবের মত দেশ-বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবককে লুফিয়া নইলেন। এইভাবে এক কালের প্রজা-নেতা আমার সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক গুরুর বিরুদ্ধে ক্যানভাস করিবার জন্য আমি ভুয়াপুর আসিয়াছি।
বক্তৃতাও করিলাম দরদ দিয়া প্রাণ ঢালিয়া। একটা অশ্রদ্ধাপূর্ণ শক্ত কথাও বলিলাম না। শুধু ঘটনা-পরম্পরা বর্ণনা করিয়া গেলাম। প্রিন্সিপাল সাহেবও সুবক্তা রসিক বাগ্মী। কিন্তু মামলা ছিল তাঁর খুবই জটিল। সব পার্টির মতই প্রজা-সমিতিরও মনোনয়ন চাওয়ার নিয়ম ছিল, দরখাস্তে স্পষ্ট করিয়াই লেখা থাকিত : ‘প্রজা-পার্টির মনোনয়ন মানিয়া হব। মনোনয়ন না পাইলে প্রতিদ্বন্দিতা হইতে সরিয়া দাঁড়াই। স্বাধীনভাবে বা অন্য কোনও পার্টির মনোনয়ন লইয়া নির্বাচন লড়িব না।‘ আমি এই প্রতি- সভায় উপস্থিত করিলাম। প্রিন্সিপাল সাহেব স্বভাবতই স্বীকার করিলেন। তারপরে তাঁর বক্তৃতা আর ভাল জমিল না। নবাবযাদা ডবলের বেশি ভোট পাইয়া মাত করিলেন।
৫. অমানুষিক খাটুনি
এই নির্বাচন উপলক্ষে আমরা সকলেই অমানুষিক পরিশ্রম করিয়াছিলাম। স্বয়ং নবাব হাসান আলী ও মৌঃ আসাদুদদৌলা সিরাজীর মত সুখী লোকেরাও গভীর রাতে পাস্ত্রে থটিয়া নদী-নালা পার হইয়াছেন। অনেক সহকমী লইয়া আমি অন্ধকার রাতে সাইকেল কাঁধে করিয়া মাইলের পর মাইল বালুচর পার হইয়াছি। এই সবের শারীরিক প্রতিক্রিয়া অন্ততঃ আমার উপর অদ্ভুত হইয়াছিল। যেদিন তোটাভুটি শেষ হয়, সেদিন নিশ্চিত জয়ের রগন চিত্র আঁকিতে-আঁকিতে সন্ধ্যার কিছু আগে বাসায় ফিরিলাম। অনেক দিন পরে শেত-গোসল করিয়া পরিতৃপ্তির সংগে খাইয়া সন্ধ্যার সময় দরজা বন্ধ করিয়া শুইয়া পড়িলাম। আন্দায় ছয়টা-সাতটা হইবে। আমার ঘুম না ভাংগা পর্যন্ত আমাকে ডিটার্ব না করিতে নির্দেশ দিয়া শুইলাম। পরদিন রাত্রি নয়টার সময় আমার ঘুম ভাংগে। অর্থাৎ একঘুমে আমি ছাৱিশ ঘন্টা কাটাইয়া ছিলাম। এই সময়টার মধ্যে আমার বাড়িতে প্রথমে দুশ্চিন্তা ও পরে কান্নাকাটি পড়িয়াছিল। মহল্লায় জানাজানি হইয়া গিয়াছিল বন্ধু-বান্ধবের ভিড় হইয়াছিল। জানালা দিয়া আমার পেটের উঠানামা দেখিয়াই আমার জীবিত থাকা সম্বন্ধে তাঁরা নিশ্চিত হইয়াছিলেন। এই ছাবিশ ঘন্টায় আমার ক্ষুধা পেশাব পায়খানা লাগে নাই। আমার স্ত্রী বলিয়াছেন, তিনি জানালার ফাঁকে খুব লক্ষ্য রাখিয়াছিলেন, এই ছারিশ ঘন্টায় আমি তিনবারের বেশি পাশ ফিরি নাই।
