আমাদের দ্বিতীয় টেকনিক ছিল এইরূপ। আমাদের বক্তারা তাঁদের বক্তৃতায় বলিতেন : আমাদের বক্তৃতা ও যুক্তি-তর্ক শুনিলেন। কোন দলকে আপনারা ভোট দিবেন, আজই এই মুহূর্তে তা স্থির করিয়া ফেলিবেন না। কয়েকদিন পরেই এখানে মুসলিম লীগের সভা হইবে। আপনারা দলে দলে সে সভায় যোগদান করিবেন। মন দিয়া তাঁদের বক্তৃতা শুনিবেন। আমাদের যুক্তি ও তাঁদের যুক্তি মিলাইয়া তুলনামূলক বিচার করিবেন। তারপর ঠিক করিবেন, কোন দলকে আপনারা ভোট দিবেন। আমাদের বক্তাদের এই ধরনের বক্তৃতার মোকাবিলায় মুসলিম লীগ বক্তারা তাঁদের সভায় বলিতেন : ‘কৃষক-প্রজার লোকেরাও এখানে সভা করিতে আসিবে। তাদের কথা শুনিবেন না। তাদের সভায় যাইবেন না। ওরা মুসলিম-সংহতি-ধ্বংসকারী হিন্দু-কংগ্রেসের ভাড়াটিয়া লোক। ওদেরে ভোট দিলে মুসলমানদের সর্বনাশ হইবে।
এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের বক্তৃতায় মুসলিম জনসাধারণ স্বভাবতঃই কৃষক–প্রজা পার্টির সমর্থক হইয়া পড়িত। যে দল অপর পক্ষের বক্তৃতা শুনিয়া পরে কর্তব্য ঠিক করিতে বলে, তারা নিশ্চয়ই অপর দলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এই সাধারণ কাণ্ড-জ্ঞান মুসলিম জনসাধারণের আছে এটা যাঁরা বিশ্বাস করেন নাই তাঁরাই রাজনীতিতে হারিয়াছেন।
আমাদের তৃতীয় টেকনিক ছিল উভয় পক্ষের যুক্ত নির্বাচনী সভার আয়োজন করার দাবি। আমাদের বক্তারা কোন অঞ্চলে গিয়াই প্রস্তাব দিতেন। কি দরকার অত টাকা-পয়সা খরচ ও অতশত পরিশ্রম করিয়া দুইটা মিটিং করিয়া জনসাধারণকে তকলিফ দিবার? দুই পক্ষ মিলিয়া একটা সভা করা হউক। খরচও কম হইবে। লোকও বেশি হইবে। উভয় পক্ষের সমান সংখ্যক বক্তা সম-পরিমাণ সময় বক্তৃতা করিবেন। আমাদের পক্ষের এই প্রস্তাবে মুসলিম লীগাররা স্বভাবতঃই আপত্তি করিতেন। যেখানেই আপত্তি করিয়াছেন, পরিণাম তাঁদের পক্ষে সেখানেই খারাপ হইয়াছে। আমাদের প্রস্তাবটা ছিল দুধারি তলওয়ার : মানিলেও আমাদের জিত, না মানিলেও আমাদের জিত।
৪. উত্তর টাংগাইল
এই টেকনিকে সবচেয়ে বেশি ম্যাজিকের কাজ হইয়াছিল টাংগাইল মহকুমার মধুপুর-গোপালপুর নির্বাচন-কেন্দ্রে। এখানে নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলী আমাদের প্রার্থী। আর প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ সাহেব মুসলিম লীগ প্রার্থী। নবাবযাদা ব্যক্তিগতভাবে প্রগতিবাদী তরুণ হইলেও ‘অত্যাচারী জমিদার’ বলিয়া পরিচিত নবাব বাহাদুর নবাব আলীর পুত্র। পক্ষান্তরে ইব্রাহীম খাঁ সাহেব জনপ্রিয় শিক্ষাবিদ, সুপরিচিতি সাহিত্যিক ও প্রবীণ সমাজসেবক। তাছাড়া স্বয়ং জিল্লা সাহেব এই নির্বাচনী-কেন্দ্রে খুব ধূমধামের সাথে জন-সভা করিয়াছেন। এসবের ফল হইল এই যে নির্বাচনের মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে একদিন নবাবযাদা সকালবেলা আমার বাসায় হাযির। তার মোটর ধূলায় সাদা। নিজের চেহারা তাঁর উস্কুখুস্কু। কয়দিন ধরিয়া না জানি শেভও করেন নাই। গোসলও করেন নাই। অমন সুন্দর চেহারাখানা একদম মলিন। কত রাত ঘুমান নাই। চোখ লাল। চোখের চারধারে কালশিরা পড়িয়া গিয়াছে। এমন। অসময়ে তাঁকে দেখিয়া বিস্মিত হইলাম। উদ্বিগ্নও হইলাম। কারণ জিগ্গাসা করিলাম। তিনি বলিলেন : ইলেকশনে জিতার তাঁর কোনই চান্স নাই। তিনি বড়জোর এক আনি ভোট পাইবেন; পনর আনিই পাইবেন প্রিন্সিপাল সাহেব। এ অবস্থায় ইলেকশনে লড়িয়া কোনও লাভ নাই। তিনি হাজার দশেক টাকা খরচ করিকেন বাজেট করিয়াছিলেন। অর্ধেকের বেশি খরচ হইয়া গিয়াছে। বাকী টাকাটা তাঁর নিজের ইলেকশনে নিশ্চিত অপব্যয় না করিয়া অন্যান্য গরিব প্রার্থীর পিছনে খরচ করা উচিৎ। এই কথাটা বলিবার জন্যই এবং বাকী টাকাটা লইয়াই তিনি আমার কাছে আসিয়াছেন। তিনি আর ইলেকশন করিবেন না, কর্মীদেরে তা বলিয়া আসিয়াছেন।
আমি এক ধ্যানে তার কথাগুলি শুনিলাম। এক দৃষ্টে তাঁর দিকে চাহিয়া রহিলাম। বড় লোকের আদরের দুলাল। কাঁচা সোনার মত চেহারা। জীবনে কোনও সাধ অপূর্ণ রাখেন নাই বিলাসী বাবা। কোনও নির্বাচনে হারেনও নাই আজো। অল্পদিন আগে কৃষক-প্রজা টিকিটে বিপুল ভোটাধিক্যে লোক্যাল বোর্ড ও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে নির্বাচিত হইয়াছেন। মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান হইয়াছেন। আর আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই তরুণ মনে এমন আঘাত। পাইয়াছেন। সেটাও বড় কথা নয়। সে পরাজয়ের নিশ্চিত সম্ভাবনার সামনে কি অপরূপ বীরত্বের সাথে বুকটান করিয়া দাঁড়াইয়াছেন। না, এ তরুণকে হারিতে দেওয়া হইবে না।
এক নাগাড়ে অনেক দূর ট্রেন ও সাইকেল ভ্রমণ করিয়া অনেকগুলি সভা করিয়া মাত্র গতরাতে বাসায় ফিরিয়াছি। ভালরূপ খাওয়া-ঘুমও হয় নাই। আবার এই দশটার গাড়িতেই আরেকটা সভা করিতে যাইবার কথা। এক মুহূর্তে সিদ্ধান্ত করিয়া ফেলিলাম। নবাবযাদার নির্বাচনী এলাকাতেই যাইব। নবাবযাদাকে বলিলাম শেভ গোসল করিয়া চারটা ডাল-ভাত খাইয়া একটু বিশ্রাম করিতে। আমিও তাই করিলাম। সন্ধ্যার দিকে ধনবাড়ি পৌঁছিলাম। অনেক রাত পর্যন্ত পরবর্তী দিনসমূহের জন্য প্ল্যান প্রোগ্রাম করিলাম। সকাল হইতে সভা করিয়া চলিলাম। তিনদিনে তিনটা বড় সভা করিলাম। আর পথের ধারের সভা-সোড় সাইড মিটিং করিলাম উনিশটা। হাটের সভা করিলাম না। কর্মীরা ঢোল ও চোংগা লইয়া আগে-আগে চলিয়া যাইতেন। এক সভা শেষ করিতে-করিতে দুই-তিন মাইল দূরে আকেটা সভার আয়োজন হইয়া যাইত। সভা মানে দুই তিন পাঁচ সাতশ লোকের জমায়েত। বড় সভা যে কয়টা করিলাম তার দূইটা ছিল যুক্ত সভা।
