(৫) মুসলিম লীগের তরফ হইতে প্রচার চালাইবার জন্য প্রচুর অর্থের ব্যবস্থা ছিল। পক্ষান্তরে কৃষক-প্রজা পার্টির কোনও তহবিল ছিল না। প্রার্থীরাও প্রায় সবাই গরিব।
পক্ষান্তরে কৃষক-প্রজা পার্টির অনুকূল অবস্থা ছিল এই কয়টি :
(১) কৃষক-প্রজা আন্দোলনের ও ব্যক্তিগতভাবে হক সাহেবের খুবই জনপ্রিয়তা ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ, মহাজনি শোষণ অবসান, কৃষি খাতকের দুরবস্থা দূরকরণ প্রভৃতি গণদাবির মোকাবেলায় মুসলিম লীগের কোনও গণ-কল্যাণের কর্মসূচী ছিল না।
(২) কৃষক-প্রজা পার্টির কর্মীরা নির্বিলাস সমাজ সেবক দেশ-কর্মী। তাঁদের জনসেবার দৃষ্টান্ত জনগণের চোখের দেখা অভিজ্ঞতা। বিনা পয়সায় পায়ে হাঁটিয়া এরা প্রচার করিতেন। পক্ষান্তরে মুসলিম লীগের বড় লোক প্রার্থীদের কর্মীরা চটকদার বেশে প্রচারে বাহির হইতেন।
(৩) মুসলিম ছাত্র-তরুণরা সকলেই প্রতিবাদী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কৃষক-প্রজা পার্টির সমর্থক ছিল।
(৪) নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে কংগ্রেস-লীগ মৈত্রী হওয়ায় বাংলার নাইট নবাবরা প্রজা-কর্মীদেরে কংগ্রেসের ভাড়াটিয়া বলিয়া গাল দিতে অসুবিধায় পড়িলেন। পক্ষান্তরে কংগ্রেস-লীগ মৈত্রী বাংলার কংগ্রেস মানিয়া না ওয়ায় তাঁদের অনেকে এবং অনেক খবরের কাগ কৃষক-প্রজা পার্টির প্রচার প্রপেগেণ্ডায় সমর্থন করেন।
(৫) পর পর কতকগুলি নাটকীয় ঘটনায় জনমত প্ৰজা-পার্টির দিকে উদ্দীপ্ত হয়ঃ (ক) হক সাহেবের পক্ষ হইতে (আসলে তাঁর অনুমতি না লইয়াই) ডাঃ আর. আহমদ বাংলার যে কোন নির্বাচনী এলাকা হইতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবার জন্য সার নাফিমুদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ করেন। (খ) বাংলার লাট সার নাযিমুদ্দিনের পক্ষে ওকালতি করায় হক সাহেব লাট সাহেবের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধংদেহি বিবৃতি দিয়া দেশময় বাহু বাহ্ পান। (গ) সার নাযিমুদ্দিনের আপন জমিদারি পটুয়াখালি নির্বাচনী এলাকাই দ্বন্দ্ব যুদ্ধের ময়দান নির্বাচিত হওয়ায় ঘটনার নাটকত্ব শতগুণ বাড়িয়া যায়। সারা বাংলার, সারা ভারতের এবং শেষ পর্যন্ত সারা দুনিয়ার দৃষ্টি পটুয়াখালির দিকে নিবদ্ধ হয়।
২. পটুয়াখালি দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ
একদিকে ইংরাজ লাটের প্রিয়পাত্র সার নাযিমুদ্দিনের পক্ষে সরকারী প্রভাব ও ক্ষমতা এবং নাইট-নবাবদের দেদার টাকা, অপরদিকে খেতাববিত্তহীন বৃদ্ধ এজা নেতা হক সাহেবের পক্ষে তাঁর মুখের বুলি ‘ডাল-ভাত’ ও সমান বিত্তহীন প্রজা কর্মীরা। রোমান্টিক আদর্শবাদী ছাত্ররা স্কুল-কলেজের পড়া ফেলিয়া বাপ-মায়ের দেওয়া পকেটের টাকা খরচ করিয়া চারিদিক হইতে পটুয়াখালিতে ভাংগিয়া পড়িল। এর ঢেউ শুধু পটুয়াখালিতে সীমিত থাকিল না। সারা বাংলার বিভিন্ন নির্বাচন কেন্দ্রেও ছড়াইয়া পড়িল। হক সাহেব খাজা সাহেবের প্রায় ডবল ভোট পাইয়া নির্বাচিত, হইলেন। তাঁর বরাবরের নিজের নির্বাচন কেন্দ্র পিরোজপুর হইতেও তিনি নির্বাচিত হইলেন।
আমার নিজের জিলা ময়মনসিংহে আমাদের বিপুল জয়লাভ হইল। আমি নিজে না দাঁড়াইয়া কৃষক-প্রজা প্রার্থীদের জিতাইবার জন্য দিনরাত সভা করিয়া বেড়াইলাম। কঠোর পরিশ্রম করিলাম আমারই মত গরিব সহকর্মীদেরে লইয়া। ফলে এ জিলার প্রধান প্রধান লীগ নেতা খান বাহাদুর শরফুদ্দিন, খান বাহাদুর নূরুল আমিন, খান বাহাদুর গিয়াসুদ্দিন, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, মৌঃ আবদূল মোননম খাঁ প্রভৃতি সকলকে ধরাশায়ী করিলাম। জিলার মোট যোলটি মুসলিম সীটের মধ্যে কৃষক-প্রজা পার্টি পাইয়াছিল এগারটি, মুসলিম লীগ পাইয়াছিল মাত্র পাঁচটি। উল্লেখযোগ্য যে, জিন্না সাহেব স্বয়ং ময়মনসিংহ জিলাতেই অনেকগুলি নির্বাচন কেন্দ্রে সভা-সমিতি করিয়াছিলেন। তাঁর মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নির্বাচন বিশারদ ও ময়মনসিংহের মুসলিম ভোটারদের মনে দাগ কাটতে পারেন নাই।
৩. নয়া টেকনিক
বরিশালের পরে ময়মনসিংহ জিলাতেই কৃষক-প্রজা পার্টি সবচেয়ে বেশিহারে আসন দখল করিয়াছিল। ময়মনসিংহ জিলার এই অসামান্য সাফল্যের কারণ ছিল তিনটি। এই তিনটি কারণই ছিল এই জিলার কৃষক-প্রজা কর্মীদের প্রচার-প্রপেগেণ্ডার টেকনিক। আত্ম-প্রশংসার মত শোনা গেলেও বলা দরকার যে তিনটি টেকনিকই আমার নিজের উদ্ভাবিত। সহকর্মীদেরে ঐ টেকনিকের ব্যাপারে আগেই তালিম দিয়া লইয়াছিলাম। একটি এই : এ জিলার কৃষক-প্রজা বক্তারা মুসলিম লীগের ‘মুসলিম সংহতির শ্লোগানকে সামনাসামনি আক্রমণ, ফ্রন্টাল এটাক, করিতেন না। মুসলিম জমিদারের সংগে মুসলিম প্রজার, মুসলিম মহাজনের সাথে মুসলিম খাতকের সংহতির কথা বলা হাস্যকর, এ ধরনের মামুলি যুক্তিত ছিলই। এছাড়া অবস্থা ভেদে এবং স্থান ভেদে দরকার-মত আমাদের বক্তারা এই যুক্তি দিতেন : ‘আমরাও মুসলিম সংহতি চাই। তবে আমাদের দাবি এই যে সে মুসলিম-সংহতি হইবে কৃষক প্রজাদের কুটিরের আংগিনায়, নবাব-সুবাদের আহসান-মনযিল বা রাজ-প্রসাদে নয়। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে জমিদার-মহাজন আর কয়জন? শতকরা পঁচানব্বই জন মুসলমানই আমরা কৃষক। কাজেই আমরা কৃষক-প্রজা কর্মীরা বলি : হে মুষ্টিমেয় মুসলমান জমিদার-মহাজনেরা, আপনারা নিজেরা, পৃথক দল না করিয়া মুসলিম সংহতির খাতিরে চলিয়া আসুন পঁচানব্বই জনের দল এই কৃষক-প্রজা-সমিতিতে। এর পরে মুসলিম লীগের বক্তারা হাজার সংগতির কথা বলিয়াও সেখানে দাঁত ফুটাইতে পারিতেন না।
