আমি এ কথার বিরুদ্ধে যুক্তি দিবার জন্য মুখ খুলিতেছিলাম। ধমক দিয়া আমাকে থামাইয়া দিলেন এবং আমার কাঁধ হইতে ডান হাতটা আমার মাথায় রাখিয়া বলিলেন : ‘ডোন্ট আণ্ড উইথ মি। আই নো মোর দ্যান ইউ ডু। প্লিয গো টু এভরি হোম, এন্ড ক্যারি দি ম্যাসেজ অব মুসলিম ইউনিটি টু ইচ এন্ড এভরি মুসলিম। দ্যাট উইল সার্ব দি পেযেন্টস মোর দ্যান ইওরপ্রজা পার্টি।‘
আমি বুঝিলাম এটা তর্ক নয় আদেশ। এর বিরুদ্ধে কোন যুক্তি চলে না। কাজেই কোন কথা বলিলাম না। আসলে বলিবার সময়ই তিনি দিলেন না। কথা শেষ করিয়াই আমার মাথা হইতে হাতটা নামাইয়া আমার দিকে বাড়াইয়া দিলেন। আমি ভক্তি– ভরে ঈষৎ নুইয়া তাঁর হাত ধরিলাম। তিনি দুইটা ঝাঁকি দিয়া বলিলেন : গুড বাই এও গুডলাক।
বন্ধুরা বিশেষ কৌতূহলের সংগে আমার অপেক্ষায় বারান্দায় পায়চারি করিতেছিলেন। দু-এক মিনিটের মধ্যে আমি বাহির হইয়া আসায় তাঁদের কৌতূহলের স্থান দখল করিল বিষয়। শুধু বন্ধুবর আশরাফুদ্দিন তাঁর স্বাভাবিক ঘাড়-দোলানো হাসিমুখে বলিলেন : তোমারে নরম পাইয়া একটু আলাদা রকমে ক্যানভাস করলেন বুঝি? গলাইতে পারলেন?
সকলেই হাসিলেন। আমিও হাসিলাম। গুতেই কাজ হইল। কোনও জবাবের দরকার হইল না। তার সময়ও পাওয়া গেল না। নূতন বিষয় আমাদের সকলের মন কব্য করিল। ইসপাহানি সাহেবদের বাড়িতে জিন্ন সাহেবের জন্য যে কামরা নির্দিষ্ট ছিল, সেটা হইতে বাহির হইয়া প্রথমে একটা প্রশস্ত বারান্দায় পড়িতে হয়। সে বারান্দা পার হইয়া বিশাল ড্রয়িং রুমে ঢুকিতে হয়। আমরা ড্রয়িং রুমে ঢুকিয়াই দেখিলাম, হক সাহেব ও মোমিন সাহেব একই সোফায় পাশাপাশি বসিয়া আছেন। আমরা উভয়কেই আদাব দিলাম। হক সাহেব জিগাসা করিলেন। কি হৈল? অধ্যাপক কবির জানাইলেন ফাঁসিয়া গিয়াছে। মোমিন সাহেব আমাদের দিকে না চাহিয়া শুধু নবাব্যাদা হাসান আলীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন : তোমরা মাথা গরম রাজনৈতিক নাবালকেরা নিজেরা ত কিছু করতে পারবেই না, আমরা প্রবীণদেরেও কিছু করতে দিবে না।
আমরা মোমিন সাহেবের সহিত তর্ক না করিয়া দু’চার কথায় হক সাহেবকে আমাদের মোলকারে রিপোর্ট দিয়া চলিয়া আসিলাম।
পরদিনই খবরের কাগযে বাহির হইল জিন্না সাহেব কৃষক-প্রজা সমিতি বাদ দিয়া ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির সহিত আপোস করিয়াছেন। ঐ পার্টি নিজেদের নাম বদলাইয়া মুসলিম লীগ নাম ধারণ করিয়াছেন। আমাদের পক্ষ হইতে অবশ্য বিবৃতি বাহির হইল যে ক্ষতিপূরণের প্রশ্নেই জিন্না সাহেবের সহিত আমাদের আপোস হইতে পারিনা।
ইহার পর প্রকাশ্য মাঠের সংগ্রাম অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়িল। যদিও আগের প্রাদেশিক মুসলিম লীগ আমাদেরই দখলে ছিল, কিন্তু জিন্না সাহেবের মোকাবেলায় আমাদের সে দাবি টিকিল না। তাছাড়া কৃষক-প্রজা সমিতির মত অসাম্প্রদায়িক শ্ৰেণী-প্রতিষ্ঠান আর মুসলিম লীগের মত সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান এক সংগে চালাইবার চেষ্টার মধ্যে যে অসংগতি এমন কি রাজনৈতিক অসাধুতা ছিল, অল্পদিনেই তা সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল। আমরা অবস্থা গতিকেই মুসলিম লীগের দখল ছাড়িয়া দিয়া কৃষক-প্রজা সমিতিতে মনোনিবেশ করিলাম। ফলে এই নির্বাচন যুদ্ধ কৃষক-প্রজা সমিতি ও মুসলিম লীগের সম্মুখযুদ্ধে পরিণত হইল।
০৯. নির্বাচন-যুদ্ধ
নির্বাচন-যুদ্ধ
নয়ই অধ্যায়
১. সুদূরপ্রসারী সংগ্রাম
১৯৩৭ সালের এই নির্বাচন মুসলিম বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা। যুদ্ধটা দৃশ্যতঃ কৃষক-প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগ এই দুইটি দলের পার্লামেন্টারি সংগ্রাম হইলেও ইহার পরিণাম ছিল সুদূর প্রসারী। আমরা কর্মীরা এই নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব পুরাপুরি তখনও উপলব্ধি করিতে পারি নাই সত্য কিন্তু সাধারণভাবে কৃষক প্রজাগণের এবং বিশেষভাবে মুসলিম জনসাধারণের অর্থনৈতিক কল্যাণ-অকল্যাণের দিক হইতে এ নির্বাচন ছিল জীবন-মরণ প্রশ্ন, এটা আমরা তীব্রভাবেই অনুভব করিতাম। ঐক্যবদ্ধভাবে কঠোর পরিশ্রমও করিয়াছিলাম সকলে। মুসলিম ছাত্র তরুণরাও সমর্থন দিয়াছিল আশাতিরিক্তরূপে।
পার্টি হিসাবে দুই দলের সুবিধা-অসুবিধা বিচার করিলে দেখা যাইবে উভয়পক্ষেরই কতকগুলি সুবিধা-অসুবিধা দুইই ছিল। মুসলিম লীগের পক্ষে সুবিধা ছিল এই কয়টি?
(১) মুসলিম জনসাধারণ মনের দিক দিয়া মোটামুটি মুসলিম সংহতির প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাস করিত।
(২) প্রজা-সমিতির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও তাঁর সাথে মৌঃ তমিয়ুদ্দিন খাঁ খানবাহাদুর আবদুল মোমিন সহ অনেক প্রজা-নেতা মুসলিম লীগে যোগ দিয়াছিলেন। প্রবীণ প্রজা-নেতাদের অনেকে স্বন্ত্র প্রজা-পার্টি গঠনকরিয়াছিলেন।
(৩) মওলানা আকরম খাঁ এই সময় মুসলিম বাংলার একমাত্র দৈনিক আজাদ বাহির করেন, কৃষক-প্রজা পার্টির কোনও সংবাদপত্র ছিল না।
(৪) কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে একটা নির্বাচনী মৈত্রী হয় তাতে বোশ্বই ফুক্ত প্রদেশ মাদ্রাজ ও বিহারে ঐ দুই প্রতিষ্ঠান যুক্তভাবে নির্বাচন-সংগ্রাম চালান। বাংলার নির্বাচনেও তার ঢেউ লাগে। কংগ্রেসের সমর্থক জমিয়তে-ওলামায়-হিন্দ মুসলিম লীগ প্রার্থীদের ভোট দিবার জন্য ফতোয়া জারি করেন।
