৬. আপোসের বিরোধিতা
আমরা প্রতিনিধিদলের মেম্বার। সেখান হইতে সার্কাস রোডস্থিত ডাঃ আর, আহমদের বাড়ি গেলাম। সমস্ত অবস্থা পর্যালোচনা করিলাম। আমরা একমত হইলাম যে হক সাহেব ও শামসুদ্দিন সাহেব সহ অধিকাংশ সদস্য এই আপোসের পক্ষপাতী এটা যেমন সত্য, এই আপোস করিলে কৃষক-প্রজা সমিতির অস্তিত্ব এই খানেই খতম এটাও তেমনি সত্য। আমরা সংকটের দুই শিংগার ফাঁকে পড়িলাম। একমাত্র ভরসা জিন্ন সাহেব। তিনি যদি মেহেরবানি করিয়া বিনা-ক্ষতিপূরণের দাবিটা গ্রাহ্য করেন, তবেই আমরা বাঁচিয়া যাই। সকলে মিলিয়া আল্লার দরগায় মোনাজাত করিতে লাগিলাম : জিন্না সাহেব যেন আমাদের দাবি না মানেন। নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে জীবনে আব্লেকবারমাত্র আল্লার দরগায় মোনাজাত করিয়াছিলাম। এক টাকা দিয়া ত্রিপুরা স্টেট লটারির টিকিট করিয়াছিলাম। প্রথম পুরস্কার এক লক্ষ। তৎকালে সারা ভারতবর্ষে বিশ্বাসী এথচ মোটা টাকার লটারি ছিল মাত্র এই একটি। কয়েক বছর ধরিয়া এই লটারির টিকিট কিনিতেছিলাম। টিকিট কিনার পরদিন হইতে খেলার ফল ঘোষণার দিন পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস কাল খোদার দরগায় দিনরাত মোনাজাত করিতাম জিতার জন্য। কিন্তু একবার হরিবার জন্য তেমনি মোনাজাত করিয়াছিলাম। কারণ পকেটে টিকিটসহ পাঞ্জাবিটা ধুপার বাড়ি দিয়া ফেলিয়াছিলাম। ধূপার ভাটিতে পড়িয়া তার চিহ্ন ছিল না। তেমনি এবার পাঁচ-ছয় বন্ধুতে দোয়া করিতে থাকিলাম : ‘হে খোদ, জিন্না সাহেবের মন কঠোর করিয়া দাও।‘
পরদিন নির্ধারিত সময়ে জিন্না সাহেবের সহিত দেখা করিলাম। দু’এক কথায় বুঝিলাম, বিনা-ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদে তিনি কিছুতেই রাযী হইবে না; কারণ ওটাকে তিনি ফান্ডামেন্টাল মনে করেন। তখন আমরা নিশ্চিন্ত হইয়া বিনা ক্ষতিপূরণের উপর জোর দিলাম। এমনকি, আমরা এতদূর বলিলাম যে পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠনে কৃষক-প্রজা পার্টিকে শতা ৪০-এর স্থলে আরও কমাইয়া দিলেও আমরা মানিয়া নিতে পারি, কিন্তু বিনা-ক্ষতিপূরণের প্রশ্নের মত ফাণ্ডামেন্টালে আমরা কোনও আপোস করিতে পারি না। জিন্না সাহেবের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাযেয়াফতের যুক্তির খণ্ডনে আমরা কর্নওয়ালিস, পাঁচসালা, দশমালা ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের উল্লেখ করিয়া দেখাইবার চেষ্টা করিলাম যে জমিদাররা আসলে জমির মালিক নয়, ইজারাদার মাত্র। তাছাড়া, কৃষক-প্রজা সমিতি বাংলার সাড়ে চার কোটি কৃষক-প্রজার কাছে এ ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ। আমরা সে ওয়াদা কিছুতেই খেলাফ করিতে পারি না। জিন্না সাহেব আমাদেরে মাফ করিবেন।
জিন্না সাহেব তাঁর অসাধারণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে বুঝিয়া ফেলিলেন, আমরা ভাংগিয়া পড়িবার চেষ্টা করিতেছি। গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরিয়া তিনি আমাদিগকে ধমকাইয়াছেন, কোনঠাসা করিয়াছেন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করিয়াছেন, কিন্তু কখনও তিনি ভাংগাভাংগি চাহেন নাই। সেটা যদি চাইতেন, তবে এক দিনেই আমাদেরে বিদায় করিয়া দিতে পারিতেন। তিনি এক কথার মানুষ। দর-কষাকষি তাঁর ধাতের মধ্যেই নাই। এমন লোক যে এক সপ্তাস্ত্রে বেশি দিন ধরিয়া দিনের পর দিন আমাদের সাথে আলোচনা চালাইয়া গিয়াছেন, তাতে কেবলমাত্র এটাই প্রমাণিত হয় যে আমাদের সাথে তাঁর মূলগত পার্থক্য যতই থাকুক, তিনি আমাদের মধ্যে ভাংগাভাংগি চান নাই। এই দিন আমাদের মধ্যে ভাংগাভাংগির মনোভাব দেখিয়া তিনি বেশ একটু চঞ্চল এবং তাঁর ধাতবিরোধী রকম নরম হইয়া গেলেন। অতিরিক্ত রকম মিষ্টি ভাষায় তিনি আমাদের দাবির অযৌক্তিকতা বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। তিনি আমাদেরে দেখাইলেন, বিনা-ক্ষতিপূরণের কথাটা আমরা নূতন তুলিতেছি। আমরা বলিলাম যে, উচ্ছেদ কথাটার মধ্যেই বিনা-ক্ষতিপূরণ নিহিত রহিয়াছে। উচ্ছেদ কথার সংগে খরিদ বা পাচেষ, হুকুম দখল বা একুইযিশন-রিকুইযিশনের পার্থক্য আমরা জিন্না সাহেবের মত বিশ্ববিখ্যাত উকিলকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম। জিন্না সাহেব আর কি করিবেন? আমাদের এই অপচেষ্টাকে তিনি শুধু চাইন্ডিশ বা শিশু-সুলভ বলিয়াই ছাড়িয়া দিলেন এবং আমাদিগকে এই ছেলেমি না করিয়া ‘সেনসিবল’ হইতে উপদেশ দিলেন।
৭. আলোচনা ব্যর্থ
কিন্তু আমরা সেনসিবল হইলাম না। কারণ আমরা মন ঠিক করিয়াই আসিয়াছিলাম। ক্ষতিপূরণের প্রশ্নেই জিন্ন সাহেবের সহিত আমাদের ভাংগাভাংগি হইল, বিনা-ক্ষতিপূরণের দাবি মানিয়া নিলে আমরা পার্লামেন্টারি বোর্ডে আরও কম সীট নিতে রাযী ছিলাম, এই মর্মে পরদিনই খবরের কাগযে বিবৃতি দিবার জন্য আমরা তৈয়ার হইতেছিলাম। আমাদের পার্টির মুসাবিদা-বিশারদ ইংরাজীতে সুপণ্ডিত অধ্যাপক হুমায়ুন কবির সাহেব এই মর্মে একটি মুসাবিদা খাড়া করিয়াই আজিকার বৈঠকে আসিয়াছিলেন। সুতরাং আমরা আর বিলম্ব করিলাম না। উঠিয়া পড়িলাম। আপোস না হওয়ার জন্য আমরা যারপরনাই দুঃখিত হইয়াছি, সেই মর্মবেদনা জানাইয়া অতিরিক্ত নুইয়া ‘আদাব আরয’ বলিয়া আমরা বিদায় হইলাম। জিন্না সাহেব আসন হইতে উঠিয়া আমাদের দিকে আসিলেন বিদায়ের শিষ্টাচার দেখাইবার জন্য। দরজার পর্দা পার হইবার আগেই জিন্না সাহেব আমাকে নাম ধরিয়া ডাকিলেন। আমি ফিরিয়া দাঁড়াইলাম। বন্ধুরা স্বভাবতঃই ফিরিলেন না। জিন্না সাহেব আমার কাছে আসিয়া আমার কাঁধে হাত দিলেন। বলিলেন : ‘ডোন্ট বি মিসগাইডেড বাই আশরাফুদ্দিন। হি ইয এ হোলহগার। ইউআরএ সেনিসিবল ম্যান। আই কোয়াইট রিএলাইয ইওর এংযাইটি ফর দি ওয়েলফেয়ার অব দি পেযেন্টস। বাট টেক ইট ফ্রম মি উইদাউট মুসলিম সলিডারিটি ইউ উইল নেভার বি এবল্টু ডু এনি গুড টু দেম।‘
