৪. লীগ-প্ৰজা আপোস চেষ্টা
কিন্তু আলোচনা যতই দীর্ঘ হইতে লাগিল আমাদের উৎসাহ ও আশা ততই কমিতে লাগিল। জিন্না সাহেবের দাবি ছিল এই : (১) কৃষক-প্রজা সমিতিকে মুসলিম লীগের টিকিটে প্রার্থী বাড়া করিতে হইবে; (২) কৃষক-প্রজা পার্টির মেনিফেষ্টো হইতে জমিদারি উচ্ছেদ দাবি বাদ দিতে হইবে; (৩) পার্লামেন্টারী বোর্ডে কৃষক প্রজা পার্টির শতকরা ৪০ জন এবং মুসিলম লীগের শতকরা ৬০ জন প্রতিনিধি থাকিবেন; (৪) মুসলিম লীগের প্রতিনিধি জিন্না সাহেব নিজে মনোনীত করিবেন। তাঁর দাবির পক্ষে জিন্না সাহেব বলিবেন। গোটা ভারতের সর্বত্র একমাত্র মুসলিম লীগের টিকিটেই নির্বাচন চালাইতে হইবে। মুসলিমসংহতি প্রদর্শনের জন্য এটা দরকার। জমিদারি উচ্ছেদ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য এই যে ঐ দাবি বস্তুতঃ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাযেয়াফত করার দাবি। উহা মুসলিম লীগের মূলনীতি-বিরোধী। তিনি মুসলিম লীগের নয়া ছাপা গঠনতন্ত্রের ৭নং ধারা আমাদিগকে দেখাইলেন।
পক্ষান্তরে কৃষক-প্রজা সমিতির তরফ হইতে আমাদের দাবি ছিল? (১) কৃষক-প্রজা সমিতির টিকিটেই বাংলার নির্বাচন হইবে; তবে কেন্দ্রীয় পরিষদে কৃষকপ্রজা প্রতিনিধিরা মুসলিম লীগ পার্টির সদস্য হইবেন এবং নিখিল-ভারতীয় সমস্ত ব্যাপারে কৃষক-প্রজা সমিতি মুসলিম লীগের নীতি মানিয়া লইবে; (২) পার্লামেন্টারী বোর্ডে কৃষক-প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের প্রতিনিধি আধাআধি হইবে; (৩) মুসলিম লীগ প্রতিনিধিরাও কৃষক-প্রজা প্রতিনিধিদের মতই প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন। আমাদের দাবির পক্ষে যুক্তি ছিল এই ও বাংলার তফসিলী হিন্দুরা কৃষক-প্রজা পার্টির সমর্থক। মুসলিম লীগ টিকিটে নির্বাচন চালাইলে আমরা তাদের সমর্থন হারাই। জিন্না সাহেবের মনোনয়নের বিরুদ্ধে আমরা যুক্তি দিলাম যে পার্লামেন্টারি বোর্ডের মুসলিম লীগ প্রতিনিধিরা প্রাদেশিক লীগ ওয়ার্কিং কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত হইলে আমরা দেশের মুসলিম লীগ কর্মীদের পূর্ণ সহযোগিতা পাইব। পক্ষান্তরে নমিনেশনের পিছন দুয়ার দিয়া যদি কোনও অবাঞ্ছিত লোক পার্লামেন্টারি বোর্ডে স্থান পায় তবে কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও প্রার্থী নির্বাচনে গন্ডগোল দেখা দিবে।
জিন্না সাহেব আমাদের যুক্তি মানিলেন না। তিনি বলিলেন : কেন্দ্রীয় পরিষদে কৃষক-প্রজা প্রতিনিধির মুসলিম লীগ পার্টির যোগ দেওয়ার কথাটা বর্তমানে অর্থহীন, কারণ কেন্দ্রীয় পরিষদের নির্বাচন এখন হইতেছে না। তফসিলী হিন্দুদের সহযোগিতা সম্বন্ধে তিনি বলিলেন, স্বন্ত্র নির্বাচন প্রথার ভিত্তিতে যখন নির্বাচন হইতেছে, তখন মুসলিম লীগ টিকিটে নির্বাচিত হইবার পরও তফসিলী হিন্দুদের সহযোগিতা পাওয়া যাইবে। আর পার্লামেন্টারি বোর্ডে প্রাদেশিক লীগের প্রতিনিধি নির্বাচন সম্বন্ধে তিনি বলিলেন যে, প্রাদেশিক লীগ কৃষক-প্রজা সমিতির লোকেরই করতলগত। নির্বাচনেও তাঁদের লোকই আসিবেন। তাতে পার্লামেন্টারি বোর্ড এক দলের হইয়া পড়িবে, সর্বদলীয় মুসলমানদের হইবে না।
উভয় পক্ষ স্ব স্ব মতে অটল থাকা সত্ত্বেও আলোচনা কোন পক্ষই ভাংগিয়া দিলাম না। শেষ পর্যন্ত আপোস-চেষ্টা সফল হইবে, উভয় পক্ষই যেন এই আশায় থাকিলাম। ইতিমধ্যে আমরা জানিতে পারিলাম জিন্না সাহেব আমাদের সাথে আলোচনা চালাইবার কালে সমান্তরালভাবে ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির নাইট-নবাবদের সাথেও আলোচনা চালাইতেছেন। আমাদের প্রশ্নের জবাবে তিনি তা স্বীকার করিলেন। বলিলেন : সকল দলের মুসলমানকে এক পার্টিতে আনাই আমার উদ্দেশ্য।’
৫. উভয়–সংকট
এক দিনের বৈঠকে হঠাৎ জিন্না সাহেব আমাদিগকে জানাইলেন। পার্লামেন্টারি বোর্ড সম্পর্কে জিন্না সাহেবের দাবি কৃষক-প্রজা সমিতির সভাপতি হক সাহেব ও সেক্রেটারি শামসুদ্দিন সাহেব মানিয়া লইয়াছেন, আমাদের এ বিষয়ে নূতন কথা বলিবার কোনও অধিকার নাই। আমরা বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইলাম। শামসুদ্দিন সাহেব সে দিনের আলোচনায় ছিলেন না। আমাদের বিষয় দূর করিবার জন্য জিন্না সাহেব মুচকি হাসিয়া এক টুকরা কাগজ দেখাইলেন। দেখিলাম, তাঁর কথা সত্য।
আমরা ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত হইয়া সেদিনের আলোচনা অসমাপ্ত রাখিয়াই চলিয়া আসিলাম। হক সাহেব ও শামসুদ্দিন সাহেবকে চ্যালেঞ্জ করিলাম। তাঁদের কথাবার্তা আমাদের পছন্দ হইল না। কলিকাতায় উপস্থিত কৃষক-প্রজা নেতাদের লইয়া একটি জরুরী পরামর্শ সভা ডাকিলাম। ঢাকায় বলিয়াদির জমিদার খান বাহাদুর কাযিমুদ্দিন সিদ্দিকী সাহেব আমাদের সমর্থক ছিলেন। লোয়ার সার্কুলার (নোনাতলা) রোডস্থ তাঁর বাড়িতে এই পরামর্শ বৈঠক বসিল। হক সাহেব ও শামসুদ্দিন সাহেব এই সভায় তাঁদের কাজের সমর্থনে বক্তৃতা করিলেন। তাঁরা জানাইলেন যে জিন্না সাহেব জমিদারি উচ্ছেদের দাবি মানিয়া লইয়াছেন। এ অবস্থায় পার্লামেন্টারী বোর্ডের প্রতিনিধিত্ব লইয়া ঝগড়া করিয়া আপোস-আলোচনা ভাংগিয়া দেওয়ার তাঁরা পক্ষপাতী নন। আমরা ইতিমধ্যেই খবর পাইয়াছিলাম যে সার নাষিমূদ্দিনের পরামর্শে জিন্না সাহেব জমিদারি উচ্ছেদের বিরোধিতা অনেকটা শিথিল করিয়াছেন। হক সাহেব ও শামসুদ্দিন সাহেবের কথায় এখন আমরা খুব বেকায়দায় পড়িলাম। আমরা নিজেদের সমর্থনে খুব জোর বক্তৃতা করিলাম। মুসলিম লীগের লিখিত গঠনতন্ত্রের বিরোধী জিন্ন সাহেবের ঐ মৌখিক প্রতিশ্রুতির মূল্য কি, সে সব কথাও বলিলাম। তারপর শুধু জমিদারি উচ্ছেদের কথাটাও যথেষ্ট নয়; বিনা ক্ষতিপূরণে উচ্ছেদটাই বড় কথা। আমাদের মেনিফেস্টোর কথাও তাই। এ সম্পর্কে জিন্না সাহেব হক সাহেবকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন, তা সভা সমক্ষে স্পষ্ট করিয়া বলিতে আমরা হক সাহেবকে চ্যালেঞ্জ করিলাম। হক সাহেব বা শামসুদ্দিন এ ব্যাপারে সভাকে সন্তুষ্ট করিতে পারিলেন না। বুঝা গেল, আসলে ক্ষতিপূরণের কথাটা তাঁরা জিন্না সাহেবের কাছে তুলেনই নাই। এই পয়েন্টে আমরা জিতিয়া গেলাম। কিন্তু এটা আমরা বুঝিলাম যে বিনা-ক্ষতিপূরণের শর্ত জিন্না সাহেব মানিয়া লইয়া থাকিলে পার্লামেন্টারী বোর্ডে মাইনরিটি হইয়াও আপোস করা উপস্থিত সদস্যগণের অধিকাংশেরই মত। যাহোক জিন্ন সাহেবের কাছে একমাত্র বিনা-ক্ষতিপূরণের ব্যাপারটা পরিষ্কার করিবার তার প্রতিনিধিদলের উপর দেওয়া হইল।
