কিন্তু যাঁর নেতৃত্বের জন্য আমরা এত গলদঘর্ম হইলাম তাঁর কাছে পুরস্কার পাইলাম তিরস্কার। বন্ধুবর আশরাফুদ্দিনই একাজে আমাদের নেতা ছিলেন। সুতরাং হাংগারফোর্ড স্ট্রিট হইতে বাহির হইয়া তিনি সোজা আমাদেরে ঝাউতলা রোড নিয়া গেলেন এবং হক সাহেবের নেতৃত্বের জন্য কি মরণপণ সংগ্রামটা করিলাম সবিস্তারে তার বর্ণনা করিলেন। জবাবে হক সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বলিলেন : দেখতেছি তোমরা আমার সর্বনাশ করবা। আমারে নেতা করবার কথা তোমাদেরে কে কইছিল? যেখানে মরহুম নবাব সলিমুল্লা বাহাদুরের সাহেবযাদা আছেন, সেখানে আমি লিডার হৈবার পারি? এমন অন্যায় দাবি কৈরা তোমরা আমার শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার চান্সটাও নষ্ট কৈরা দিলা? না, এসব ছেলেমি আমি মানবো না।
আমরা চোখ-চাওয়া-চাওয়ি করিলাম। আমি রসিকতা করিয়া বলিলাম। সার, আপনের একদিকে মুসলিম বেংগল ও অপরদিকে আহসান মনযিলের সংগ্রামটা আমরা ভুলতে পারি না। আশরাফুদ্দিন বলিলেন : ‘আপনে নিজে প্রধানমন্ত্রী হৈতে চান না, আমরা জানি। কিন্তু বাংলার কৃষক-প্রজারা চায় আপনেরেই তারার প্রধানমন্ত্রী রূপে। নবাব-সুবা প্রধানমন্ত্রী তারা চায় না। আপনেরে প্রধানমন্ত্রী করতে পারি কি না, তা আমরা দেখব। আপনে কথা কইতে পারবেন না। কাগজে বিবৃতিও দিতে পারবেন না। চুপ কৈরা থাকবেন।‘ হক সাহেব তাঁর অতি পরিচিত দুষ্টামিপূর্ণ হাসিটি হাসিলেন। আর কিছু বলিলেন না। অর্থাৎ তিনি রাযী হইলেন। ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির নেতারা আমাদের অসম্মতিকেই হক সাহেবের অসম্মতি ধরিয়া নিলেন। কৃষক-প্রজা পার্টি ও ইউনাইটেড পার্টির রেষারেষি চলিতে থাকিল।
৩. মিঃ জিন্নার সমর্থন লাভের চেষ্টা
১৯৩৪ সালের শেষ দিকে জিন্না সাহেব তাঁর লণ্ডনের স্বয়ং-নির্বাসন ত্যাগ করিয়া বোম্বাই আসেন। সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে নির্বাচিত হন। তাঁরই সমর্থনে সার আবদুর রহিম স্পিকার নির্বাচিত হন, সে কথা আগেই বলিয়াছি। ১৯৩৫ সালে তিনি মুসলিম লীগ পুনর্গঠনে মন দেন। পাঁচ বৎসর তিনি দেশে না থাকায় মুমলিম লীগ ইতিমধ্যে মৃত প্রায় হইয়া গিয়াছিল। এই সময় বংগীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ আমাদের দলের দখলে। মৌলবী মুজিবুর রহমান ইহার প্রেসিডেন্ট, ডাঃ আর, আহমদ সেক্রেটারি। আমার নিজের জিলার আমি উহার প্রেসিডেন্ট, উকিল মৌঃ আবদুস সোবহান এই সময় উহার সেক্রেটারি। এইভাবে মুসলিম লীগ তখনও আমাদের মত কং’গ্রেসী মুসলমানদেরই’ দখলে। কিন্তু আমরা সকলে প্ৰজা-আন্দোলন লইয়া এত ব্যস্ত যে মুসলিম লীগ সংগঠনের দিকে মন দিবার আমাদের সময়ই ছিল না। তবু আমরাই ছিলাম বাংলায় জিন্না নেতৃত্বের প্রতিনিধি।
আমাদের দলের ডাঃ আর. আহমদের সংগে কলিকাতার প্রভাবশালী তরুণ মুসলিম নেতা মিঃ হাসান ইস্পাহানি, তাঁর সহকর্মী আব্দুর রহমান সিদ্দিকী প্রভৃতির অন্তরংগতা ছিল অন্য দিক হইতে। তাঁরা এই সময় ‘নিউ মুসলিম মজলিস’ নামে একটি প্রগতিবাদী প্রতিষ্ঠান চালাইতেন। মিঃ হাসান ইস্পাহানি জিন্না সাহেবের একান্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। বাংলার পয়সাওয়ালা নাইট-নবাবদের সাথে টক্কর দিতে গেলে
আইন পরিষদে প্রজা পার্টি জিন্ন সাহেবের সমর্থন কাজে লাগিবে, এই সিদ্ধান্ত করিয়া মিঃ ইস্পাহানির মারফতে আমরা জিন্ন সাহেবকে দাওয়াত করিলাম। তিনি আসিলেন। ইস্পাহানিদের ৫নং ক্যামাক স্ট্রিটের বাড়িতে উঠিলেন। রাতে ডিনারের পরে আলোচনা শুরু হইল। মৌঃ ফযলুল হক, আবদুল করিম, মৌঃ সৈয়দ নওশের প্রভৃতি আমরা আট-দশজন ডিনারে আলোচনায় শরিক হইলাম।
আলোচনায় নীতিগতভাবে সকলে অতি সহজেই একমত হইলাম। মুসলমানদের একতাবদ্ধ হওয়া, নাইট-নবাবদের ধামাধরা রাজনীতি হইতে মুসলিম সমাজকে মুক্ত করা, সাম্প্রদায়িক ঐক্যের মধ্য দিয়া মুসলিম স্বার্থ রক্ষা করা ইত্যাদি ব্যাপারে কোনও মতভেদ দেখা দিল না। কিন্তু খুটিনাটি ব্যাপারে আস্তে আস্তে বিরোধ দেখা দিতে লাগিল। জিন্না সাহেব ইতিমধ্যে মুসলিম লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে নূতন গঠনতন্ত্র রচনা করিয়াছেন। তাতে মুসলিম ভারতের রাজনীতিক আদর্শ-উদ্দেশ্য সম্বন্ধে প্রগতিবাদী দাবি-দাওয়া লিপিবদ্ধ হইয়াছে। সেই আদর্শ-উদ্দেশ্যকে বুনিয়াদ করিয়া মুসলিম লীগ সর্বভারতীয় ভিত্তিতে নির্বাচন-সংগ্রাম পরিচালনা করিবে, জিন্না সাহেবের উদ্দেশ্য তাই। কাজেই আমরা বুঝিলাম, আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী হইতে বাধ্য। অতএব জিনা সাহেবের সহিত আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তৃত আলোচনা চালাইবার জন্য একটি প্রতিনিধি দল গঠন করা হইল। মৌঃ শামসুদ্দিন, মৌঃ আশরাফুদ্দিন, মৌঃ রেযায়ে করিম, নবাবযাদা হাসান আলী, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আমি প্রতিনিধি দলের মের হইলাম। সৈয়দ নওশের আলী এই দলের লিডার হইলেন। সৈয়দ সাহেব দুই-একবার গিয়াই ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। আমরা যা করিব, তাতেই তাঁর মত আছে বলিয়া তিনি খসিয়া পড়িলেন। অতঃপর নেতাহীন অবস্থাতেই আমরা দিনের পর দিন আলোচনা চালাইয়া যাইতে থাকিলাম। ইতিমধ্যে আমরা আলবার্ট হলে এক জনসভার আয়োজন করিলাম। বক্তা এক জিন্না সাহেব। তিনি যুক্তিপূর্ণ সারগর্ভ বক্তৃতা করিলেন। তাতে তিনি ইংরাজের ধামাধরা তল্পিবাহক নাইট-নবাবদের কষিয়া গাল দিলেন এবং নেতৃত্ব হইতে তাহাদিগকে ঝাটাইয়া তাড়াইবার জন্য জনসাধারণকে উদাত্ত আহ্বান জানাইলেন। উপসংহারে তিনি প্রাণশশী ভাষায় বলিলেন : ‘লেট দি ক্রিম অব হিন্দু সোসাইটি বি অর্গেনাইযড় আন্ডার দি বেনার অব দি কংগ্রেস এও দি ক্রিম অব মুসলিম সোসাইটি আন্ডার দি বেনার অব দি মুসলিম লীগ। দেন লেট আস পুট আপ এ ইউনাইটেড ডিমান্ড ফর ইন্ডিপেন্ডেন্স অব আওয়ার ডিয়ার মাদারল্যান্ড। আওয়ার ডিমান্ড উইল বি ইররেফিস্টিবল।‘ কানফাটা করতালি ধ্বনি ও বিপুল উৎসাহের মধ্যে সভা ভংগ হইল।
