১. প্রজা-সমিতির নাম পরিবর্তন
ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত প্রজা সম্মিলনীর সময় হইতেই নিখিল-বংগ প্রজা সমিতির সেক্রেটারি মওলানা মোহাম্মদ আম খাঁ প্রজা-সমিতির কাজে নিরুৎসাহ হইয়া পড়েন। কিন্তু সমিতির সহকারী সেক্রেটারি সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদীর সহকারী সম্পাদক মৌঃ নযির আহম্মদ চৌধুরী পূর্বের মতই উৎসাহের সাথে সমিতির কাজ চালাইয়া যাইতে লাগিলেন। সার আবদুর রহিমের স্থলে সমিতির স্থায়ী সভাপতি নির্বাচনের জন্য ময়মনসিংহ সম্মিলনীর কিছুদিন পরেই মোহদী’ অফিসে কাউন্সিলের অধিবেশন দওয়া হইল। মওলানা সাহেবের সকল প্রকার বিরুদ্ধতা ঠেলিয়া আমরা হক সাহেবকে সভাপতি নির্বাচন করিতে সমর্থ হইলাম। মওলানা সাহেব অধিকতর নিরুৎসাহ এমনকি অসহযোগী হইয়া পড়িলেন।
নিখিল-বংগ প্রজা সম্মিলনীর পরবর্তী অধিবেশন ঢাকায় হইবে, মনমনসিংহ বৈঠকেই তা স্থির হইয়াছিল। ১৩৩৬ সালে এপ্রিল মাসে এই সম্মিলনীর অধিবেশন বসিল। বিখ্যাত দন্ত-চিকিত্সক ডাঃ আর, আহমদ অভ্যর্থনা সমিতির চেয়ারম্যান, ঢাকা বারের বিখ্যাত উকিল মৌঃ নঈমুদ্দিন আহমদ অভ্যর্থনা সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি, চৌধুরী গোলাম কবির, মৌঃ রেযায়ে করিম, মির্যা আব্দুল কাদির (কাদির সরকার), ‘আমান’-সম্পাদক মৌঃ তফাযল হোসেন, খ্যাতনামা মোখতার সৈয়দ আবদুর রহিম অভ্যর্থনা সমিতির বিভিন্ন পদ অলংকৃত করেন। খান বাহাদুর আবদুল মোমিন ও মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের দল প্রতিযোগিতা না করায় এবারও জনাব ফলকেই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্মিলনীর সভাপতি নির্বাচিত হন।
এই সম্মিলনী ছিল মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক জীবনেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে প্রাদেশিক আইনপরিষদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ছিল আসন্ন। কার্যকরী সমিতির নির্দেশে আমি সম্মিলনীর বিবেচনার জন্য একটি ইলেকশন মেনিফেস্টো আগেই রচনা করিয়াছিলাম। জিন্না সাহেবের চৌদ্দ দফার নামানুকরণে আমি প্রজা পার্টির দাবিগুলোকে টানিয়া-খেচিয়া চৌদ্দতে স্ফীত-সীমিত করিয়া উহার নাম দিয়াছিলাম ‘প্রজা সমিতির চৌদ্দ দফা।‘ সেই মেনিফেস্টোতে বিনা-ক্ষতি পূরণে জমিদারি উচ্ছেদ, খাযনার নিরিখ হ্রাস, নয়র-সেলামি রহিতকরণ, খাযনা-ঋণ মওকুফ, মহাজনী আইন প্রণয়ন, সালিশী বোর্ড গঠন, হাজা-মজা নদী সংস্কার, প্রতি থানায় হাসপাতাল স্থাপন, প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক বাধ্যতামূলক করণ, বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, শাসন ব্যয় হ্রাসকরণ, মন্ত্রি-বেতন এক হাজার টাকা নির্ধারণ ও রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি প্রভৃতি বিভিন্ন দাবি লিপিবদ্ধ করা হইয়াছিল। এই সম্মিলনীতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছিল। কুমিল্লা ও নোয়াখালী জিলার প্রজা-আন্দোলন কৃষক-আন্দোলন নামেই পরিচত ছিল। বাংলার আর সব জিলাতেই উহার নাম ছিল প্রজা-আন্দোলন। নির্বাচনের মুখে প্রজা-সমিতিকে ঐক্যবদ্ধ করা আবশ্যক বিবেচিত হওয়ায় সকল মতের কর্মীদের সমন্বয় বিধান করা হয় সমিতির নাম কৃষক-প্রজা সমিতি করিয়া। মেনিফেস্টোও কৃষক-প্রজার চৌদ্দ দফা নামে পরিচিত হয়। অসুস্থতা সত্ত্বেও সম্মিলনীর প্রধান প্রস্তাব মেইন রেযুলিউশন আমাকেই মুভ করিতে হয়। সকল জিলার নেতৃবৃন্দ ঐ প্রস্তাবের সমর্থনে বক্তৃতা করেন। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে সম্মিলনীর কাজ শেষ হয়।
২. মুসলিম ঐক্যের চেষ্টা
সমিতির নাম কৃষক-প্রজা হওয়ার সুযোগ লইয়া খান বাহাদুর মোমিন ও মওলানা আকরম খাঁর দলের কতিপয় নেতা। পূর্ব নামে সমিতি চালাইবার চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হন। অল্পদিন পরেই নবাব হবিবুল্লার নেতৃত্বে কলিকাতায় ‘ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি’ গঠন করা হয়। জনাব শহীদ সুহরাওয়ার্দী ঐ পার্টিতে যোগদান করেন। খান বাহাদুর আবদুল মোমিন ও মৌঃ তমিয়ুদ্দিন খাঁ আনুষ্ঠানিকভাবে ঐ পার্টিতে যোগ না দিলেও এবং কাগজে-কলমে কৃষক-প্রজা সমিতিতে কৃষক-প্রজা সমিতির সহিত সক্রিয় সম্পর্ক রাখিলেন না। মওলানা আকরম খাঁর স্থলে মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ সমিতির সেক্রেটারি নির্বাচিত হইলেন।
‘ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি’ নামক এই নয়া সংস্থায় মুসলিম বাংলার সব নাইট নবাব ও জমিদার সওদাগররা সংঘবদ্ধ হইলেন এবং পার্টি কণ্ডে পাঁচ-সাত জন বড় লোকের প্রত্যেকে দশ হাজার টাকা করিয়া চাঁদা দিয়াছেন বলিয়া খবরের কাগযে ঘোষণা করিলেন। ইহাতে আমরা কৃষক-প্রজা কর্মীরা একটু চঞ্চল হইয়া উঠিলাম। এই সময় ডাঃ আর, আহমদ, মিঃ আব্দুর রহমান সিদ্দিকী ও মিঃ হাসান ইসপাহানির, নেতৃত্বে ‘নিউ মুসলিম মজলিস’ নামে কলিকাতায় প্রগতিবাদী মুসলিম তরুণদের একটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। মুসলমান নাইট-নবাব খান বাহাদুরদেরে সংঘবদ্ধ হইতে দেখিয়া এরাও একটু চিন্তাযুক্ত হইলেন। প্রতিকার কি করা যায়, এই লইয়া ইহাদের সাথে আমাদের কথাবার্তা চলিতে থাকে। ইতিমধ্যে নবাব হবিবুল্ল বাহাদুরের হাংগারফোর্ড স্ট্রিটের বাড়িতে ‘ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির’ নেতারা কৃষক-প্রজা সমিতির সহিত একটি আপোস-রফার বৈঠক আহবান করেন। প্রজা-সমিতির বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা (যথা মৌঃ ফযলুল হক, মৌঃ আব্দুল করিম, মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী) উক্ত সভায় গেলেন না। তাঁদের বদলে মৌঃ তমিযুদ্দিন খাঁ, মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ, মৌঃ আশরাফুদ্দিন চৌধুরী ও আমাকে পাঠাইলেন। সেখানে কর্মপন্থা নিয়া বিশেষ বিরোধ হইল না। কিন্তু পার্টি লিডার লইয়া আপোস-আলোচনা ভাংগিয়া গেল। আমরা চাইলাম হক সাহেবকে লিডার করিতে, তাঁরা চাইলেন নবাব হবিবুল্লাকে। মুসলমানদের নেতা মানেই এবার বাংলার প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং কোনও দলই নরম হইলাম না। আলোচনা ভাংগিয়া গেল। নেতৃত্বের ইশুতে আলোচনা ভাংগিয়া দেওয়ার ব্যাপারে মৌঃ তমিসুদ্দিন সাহেব আমাদের সংগে চলিয়া আসিলেন না। মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ যদিও মৌঃ তমিয়ুদ্দিনের মতের সমর্থক ছিলেন, অর্থাৎ নেতৃত্বের ইশুতে আলোচনা ভাংগিবার বিরোধী ছিলেন, তবু শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথে বাহির হইয়া আসেন।
