রাজা বাহাদুর স্তষ্টিত হইলেন। আমি তথ্য-বৃত্তান্ত দিয়া এই দৃষ্টান্তের সংগে জমিদারি প্রথার হুবহু মিল দেখাইলাম। আশি বৎসরের এই মহানহৃদয় বৃদ্ধের চোখ কপালে উঠিল। তিনি ধরা গলায় মৃদু সুরে বলিতে লাগিলেন : কি বলিলে? আমরা সেবার জন্য দরিদ্র-নারায়ণ সৃষ্টি করিতেছি? সুষা করিয়া পূণ্য লাভের আশায় সুস্থ লোককে আঘাত করিয়া রোগী বানাইতেছি?
এ কথাগুলি আমার নিকট রাজা বাহাদুরের প্রশ্ন ছিল না। এগুলো ছিল তাঁর আত্ম-জিজ্ঞাসা, স্বগত উক্তি। চোখও তীর আমার দিকে ছিল না। তবু আমি এ সুযোগ হেলায় হারাইলাম না। আমি বলিলাম : জি-হাঁ কর্তা, অবস্থা ঠিক তাই।
তিনি আমার কথা শুনিলেন না বোধ হয়। কারণ এ বিষয়ে আর কোন কথা বলিলেন না। স্বগত উক্তি বন্ধ করিয়া তিনি আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন : মনসুর, আমার মনটা খুবই খারাপ হইয়া গেল। কিন্তু এ জন্য তোমাদের দোষ দেই না। বরঞ্চ তুমি আমার চোখের সামনে চিন্তার একটা নূতন দিক খুলিয়া দিয়াছ। আজ তুমি যাও, আরেক দিন তোমার সংগে আলোচনা করিব।
আর তিনি আমাকে ডাকেন নাই।
৯. গোলকপুরের জমিদার
তৃতীয় ঘটনাটি ঘটিয়াছিল এরও অনেক পরে ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর কি ১৯৩৭ সালের জানুয়ারি মাসে। ঈশ্বরগঞ্জ থানার জারিয়া হাই স্কুলের খেলার মাঠে নির্বাচনী সভা। তখন আসন্ন সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষ করিয়া দেশ তাতিয়া উঠিয়াছে। প্রতিদ্বন্দিতাও আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরীর মত গরিব প্রজা-কর্মী ও খান বাহাদুর নূরুল আমিনের মত প্রভাবশালী লোকের মধ্যে। কাজেই বিরাট জনতা হইয়াছে। হঠাৎ জনতার মধ্যে চাঞ্চল্য পড়িয়া গেল। গোলকপুরের জমিদার শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী সতায় আসিয়াছেন। আমি সভাপতি। মঞ্চের উপর জমিদার বাবুর বসিবার ব্যবস্থা করিলাম। তিনি সভায় দু’চার কথা বলিতে চাহিলেন। আমি সভায় সে কথা ঘোষণা করিয়া জমিদার বাবুকে আহ্বান করিলাম। তিনি অল্প কথায় বক্তৃতা শেষ করিলেন। দেখা গেল, তিনি মহাত্মা গান্ধীর একজন ভক্ত এবং নিজে সাধু প্রকৃতির অতিশয় বিনয়ী ভদ্রলোক।
তিনি বলিলেন: ‘এ জিলার প্রজা-আন্দোলনের নেতা মনসুর সাহেব প্রাতঃ স্মরণীয় নমস্য ব্যক্তি’ বলিয়া জোড়-হাত নত মস্তকে ঠেকাইলেন। আমার প্রাতঃস্মরণীয় হওয়ার কারণও তিনি সংগে সংগেই দেখাইলেন। বলিলেন : ‘কারণ তিনি মহাত্মা গান্ধীর একজন অনুরক্ত অনুসারী লোক।‘ অপাত্রে এমন উচ্চ প্রশংসার কারণও সংগে সংগেই সুস্পষ্ট হইয়া গেল। তিনি বলিলেন : ‘অথচ এটা খুবই দুঃখের বিষয় যে মনসুর সাহেব অহিংসায় বিশ্বাসী হইয়াও তিনি জমিদারদিগকে ঘৃণা করিয়া থাকেন। এখানে তিনি রাজা জগৎকিশোরের মতই বলিলেন : সব জমিদারকে ঘৃণা করা উচিৎনয়। কারণ সব জমিদারই খারাপ নয়।‘
জমিদার বাবু মহাত্মা গান্ধীর নাম করায় তাঁর কথার জবাব দেওয়া আমার পক্ষে খুবই সহজ হইল। আমি তাঁর ভদ্রতার প্রতিদানে ভদ্রতা করিয়া আমার বক্তৃতার শুরুতেই বলিলাম : মহাত্মাজীকে ইংরাজরা যেমন ভুল বুঝিয়াছিল, আমাকেও জমিদার বাবু তেমনি ভুল বুঝিয়াছেন। মহাত্মাজী ইংরাজের অভিযোগের উত্তরে বলিয়াছিলেন : আমি ইংরাজ জাতিকে ঘৃণা করি না। ইংরাজ সাম্রাজ্যবাদকে ঘৃণা করি। ইংরাজ জাতির মধ্যে আমার শ্রদ্ধেয় বহু ব্যক্তি আছেন। আমিও মহাত্মাজীর ভাষা নকল করিয়া বলিতেছি : আমি জমিদারদেরে ঘৃণা করি না। জমিদারি প্রথাকেই ঘৃণা করি। বস্তুতঃ জমিদাদের মধ্যে আমার শ্রদ্ধেয় বহু ব্যক্তি আছেন, দাঁতব্য কাজে যাঁদের দান অতুলনীয়। আমরা শুধু জমিদারি প্রথাটারই ধ্বংস চাই। ব্যক্তিগতভাবে জমিদারদের ধ্বংস চাই না। এই প্রথার বিরুদ্ধেই যে আমাদের সংগ্রাম, এই কুপ্রথা যে ধনীকে দরিদ্র এবং ভাল মানুষকে খারাপ করিতেছে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হইতে তা বর্ণনা করিলাম। যে আমি জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে আশৈশব সংগ্রাম করিয়া আসিতেছি সেই আমিই যে জমিদারি-প্রথার চাপে খারাপ হইয়া গিয়াছিলাম, সে অপরাধ সরলভাবে স্বীকার করিলাম। এক জমিদারের দুই শরিকের মামলায় আমি কোর্টের দ্বারা সেই জমিদারির রিসিভার নিযুক্ত হইয়াছিলাম। জমিদারদের পক্ষ হইতে তাদের জমিদারি পরিচালন করিতে গিয়া ছয় মাসের মধ্যে আমি বুনিয়াদী জমিদারদের চেয়েও অত্যাচারী জমিদার হইয়া গিয়াছিলাম। এক মহালের খায়না আদায়ের জন্য শেষ পর্যন্ত আমি পুলিশের সহায়তা চাহিয়াছিলাম। জিল প্রজা-সমিতির সেক্রেটারি প্রজাদের বকেয়া খাযনা আদায়ের জন্য পুলিশের সাহায্য চাওয়ায় জিলা ম্যাজিস্ট্রেট ও এস, পি, তা হাসিয়াই খুন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা আমাকে ও-কাজে বিরত করিয়াছিলেন। নইলে কি যে কাণ্ডটা হইয়া যাইত, সে দুশ্চিন্তা ঐ সভার মধ্যেই প্রকাশ করিলাম। উপসংহারে বলিলাম : যে প্রথা আমার মতবিরোধী লোককে অত্যাচারী বানাইয়াছিল ছয় মাসে, দেড় শ’ বৎসরে ঐ প্রথা আপনাদের কতখানি অত্যাচারী বানাইয়াছে তা আপনিই বিচার করুন। সভায় হাসির হুল্লোড় পড়িয়া গেল। জমিদার বাবুও হাসিলেন। আমার কথা তার মনে এমন দাগ কাটিয়াছিল যে তিনি বীরেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী ও শৈলেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী নামক তাঁর দুই গ্র্যাজুয়েট ছেলেকে প্রজা-কমী হিসাবে গ্রহণ করিতে আমাকে অনুরোধ করিলেন। জমিদার পুত্রকে প্রজা-সমিতিতে গ্রহণ করার সম্ভাব্য আপত্তির বিরুদ্ধে তিনি নবাবযাদা হাসান আলীর নযির দিলেন। আমি নানা। যুক্তি ও দৃষ্টান্ত দিয়া উভয়ের পার্থক্য দেখাইলাম এবং শর্তাদি আরোপ করিলাম। শেষ পর্যন্ত তাঁরা প্রজা সমিতিতে যোগ দেন নাই।
০৮. আইন পরিষদে প্রজা পার্টি
আইন পরিষদে প্রজা পার্টি
আটই অধ্যায়
