৭. প্রজা-জমিদারে আপোসের অভিনব চেষ্টা
প্রজা আন্দোলনের দুর্নিবার গতি ও অদূর ভবিষ্যতে এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এই সময় ময়মনসিংহের, তথা সারা বাঙলার জমিদারদের মনে একটা সন্ত্রাস সৃষ্টি করিয়াছিল। প্রমাণস্বরূপ তিনটি মাত্র ঘটনার উল্লেখ করিব? প্রথমতঃ, জমিদার সভার পক্ষ হইতে প্রজা-সমিতির সহিত আপোস-রফা করিবার প্রস্তাব আসে এই সময়। কংগ্রেস নেতা শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, এবং জিন্ন সাহেবের ইনডিপেটে পার্টির ডিপুটি লিভার কালীপুরের জমিদার শ্রীযুক্ত ধীরেন্দ্র কান্ত লাহিড়ী এই ব্যাপারে উদ্যোগী হন। মহারাজা শশিকান্তের শশীলজে জিলা প্ৰজা-সমিতি ও জিলা জমিদার সভার নেতৃবৃন্দের মধ্যে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা হয়। খাযনার হার, বকেয়া খানা মাফ, নযরসেলামী ও মাথট-আওয়াব লইয়াও বিস্তারিত আলোচনা হয়। কিন্তু সেটা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। প্রজা আন্দোলনের ইতিহাসের ভুলিয়া-যাওয়া বুদ্বুদ হিসাবে। যার মূল্য আছে, সেটা হইতেছে আমাদের পক্ষ হইতে একটা অভিনব প্রস্তাব। প্রস্তাবটি ছিল এই লক্ষ টাকা বা তদূর্ধ আয়ের সমস্ত জমিদারিকে এক-একটি স্বায়ত্তশাসিত ইউনিটে পরিণত করিতে হইবে। প্রজাসাধারণের ভোটে একটি কাউন্সিল নির্বাচিত হইবে। সেই কাউন্সিল নিজেদের ভোটে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করিবে। একটি মন্ত্রিসভাই জমিদারি চালাইবে। জমিদার মন্ত্রিসভার কাজে হস্তক্ষেপ করিতে পারিবেন না। ইংল্যাণ্ডের রাজার মত তিনি নিয়মতান্ত্রিক হেড়-অ-দি-স্টেট থাকিবেন। জমিদারের ব্যক্তিগত খরচের জন্য প্রিতি পার্স রূপে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কনস্টিটিউশনে বরাদ্দ থাকিবে। উহা ননভোটেবল থাকিবে; অর্থাৎ কাউন্সিল উহা কমাইতে পারিবে না। এক লক্ষ টাকার মত আয়ের জমিদারিগুলি নিজেরা একত্র হইয়া লক্ষ টাকার উপরে উঠিবে; অথবা পার্শ্ববর্তী বড় জমিদারির শামিল হইবে। প্রস্তাবটি অদ্ভুত ও অভিনব হইলেও জমিদার পক্ষ এক কথায় উহা উড়াইয়া দেন নাই। বরঞ্চ তাঁদের একজন উৎসাহের সংগে উহা বিবেচনা করিতে এবং জমিদার সভার সাধারণ সভায় পেশ করিতে রাযী হইলেন।
কিন্তু একটি কথাতেই শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা ভাংগিয়া গেল। সে কথাটি এই যে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে আপোস-রফার শর্তগুলো ময়মনসিংহ জিলাতেই সীমাবদ্ধ থাকিবে। যদি এখানে সফল হয় তবে দ্বিতীয় স্তরে বাংলার অন্যান্য জিলায় তা প্রয়োগ করা হইবে। এটা প্রজা-আন্দোলনে বিভেদ ও ভাংগন আনিবার দুরভিসন্ধি বলিয়া আমরা সন্দেহ করিলাম। তাই এদিকে আর অগ্রসর হইলাম না।
৮. দানবীর রাজা জগৎকশোর
দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে রাজা জগৎকিশোরের সঙ্গে। রাজা জগৎকিশোর এ জিলার জমিদারের মধ্যে বয়োজ্যষ্ঠ ছিলেন। তিনি নির্বিলাস, দানশীল ঋষিতুল্য ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর দানে বহু স্কুল-মাদ্রাসা, হাসপাতাল, এমনকি মসজিদ নির্মিত ও পরিচালিত হইয়াছে। প্রজা-আন্দোলনের চরম জনপ্রিয়তার দিনে তিনি আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। রাজা জগৎকিশোরকে আমি অন্তর দিয়া ভক্তি করিতাম। ‘বেনিভোলেন্ট মার্কি’কে যাঁরা প্রজাতন্ত্রের চেয়ে উৎকৃষ্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা মনে করেন, রাজা জগৎকিশোর তাঁদের জন্য লুফিয়া নিবার মত দৃষ্টান্ত ছিলেন। তিনি নির্বিলাস সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করিতেন। দয়ালু বলিয়া তিনি প্রজাদের কাছে সুপরিচিত। ধর্ম ও দাঁতব্য কাজে তাঁর দান মোটা। সুতরাং নিজেকে ধার্মিক পরোপকারী বলিয়া অহংকার করিবার তাঁর অধিকার ছিল। কিন্তু সব সত্যিকার ধার্মিকের মতই তিনি নিরহংকার ছিলেন। তাই বলিয়া কেউ তাঁকে অত্যাচারী যালেম বলিবে এটাও তিনি আশা করিতে পারেন নাই। জীবনে বোধ হয় আমার কাছেই তিনি একথা শুনেন এবং মর্মাহত হন। আমি তাঁর সাথে দেখা করিতে গেলে আগে তিনি আমাকে তাঁর মর্যাদা-মাফিক জলযোগ করাইলেন। কোন প্রকার আত্ম-প্রশংসা না করিয়াও বলিলেন তার সারমর্ম এই : সব জমিদার যেমন ভাল নয়, তেমনি সব জমিদারই খারাপ নয়। দরিদ্র নারায়ণের সেবাই সব ধনী মানুষের কর্তব্য এবং জমিদারদের মধ্যেও এ সম্পর্কে সচেতন সকলে না হইলেও কিছু লোক আছেন, অতএব প্রজা-সমিতি সব জমিদারকে এক কাতারে দাঁড় করাইয়া জমিদারের প্রতি অন্যায় এবং দেশের অনিষ্ট করিতেছে। তাঁর সুরে সুস্পষ্ট আন্তরিকতা ফুটিয়া উঠিল। আমি জবাবে রাজা বাহাদুরকে ব্যক্তিগতভাবে প্রশংসা করিয়া যা বলিলাম তার সারমর্ম এই ও দরিদ্র-নারায়ণের সেবা করা পুণ্য কাজ। এই পুণ্য-কাজ করিয়াই ধার্মিক জমিদাররা স্বর্গে যাইতে পারেন। দরিদ্র-নারায়ণ না থাকিলে সেবা করিবেন কার? কাজেই দেশে দরিদ্র-নারায়ণ থাকা দরকার। যথেষ্ট দরিদ্র না থাকিলে দেদার আর্থিক শোষণের দ্বারা তা সৃষ্ট করা অত্যাবশ্যক। আপনারা তাই করিতেছেন। যেমন ধরুন, রোগীর সুষা পুণ্য কাজ। অথচ চোখের সামনে কোন রোগী না থাকায় আর্তের সেবা-সুষার মত পুণ্য কাজ হইতে আমি বঞ্চিত। আমি পরম ধার্মিক লোক। কাজেই একটা সুস্থ লোকের পিঠে দায়ের আঘাতে একটা ঘা করিলাম। সে ঘায়ে ক্ষার-নুন দিয়া ঘাটা পচাইলাম। নালি হইল। লোকটা শয্যাশায়ী হইল। সে মরে আর কি? আমি তখন তার সেবা-শুশ্রূষা করিতে বসিলাম। দিন-রাত আহার-নিদ্রা ভুলিয়া তার সেবা করিলাম। বলেন কর্তা, আমি স্বর্গ পাইবনা?
