আমি উদ্বোধনী ভাষণ লিখিয়া দিব এই শর্তে নবাব ফারুকী সম্মিলন উদ্বোধন করিতে রাযী হইয়াছিলেন। অমন বিপদে আমি যে কোনও পরিশ্রমের শর্তে রাযী হইতাম। প্রতিদানে শুধু সেই দিনই জিলা ম্যাজিস্ট্রেটকে টেলিগ্রাম করিয়া তাঁর প্রজা সম্মিলনী উদ্বোধন করার সংবাদটা জানাইয়া দিতে অনুরোধ করিলাম। তিনি তৎক্ষণাৎ তা করিলেন। প্রাইভেট সেক্রেটারির মুসাবিদা করা টেলিগ্রামের শেষে তিনি নিজে হইতে যোগ করিলেন? সম্মিলনী যাতে সাফল্যমণ্ডিত হয় সে দিকে ন্যর রাখুন। আমিও নিশ্চিত হইয়া ফারুকী সাহেবের উদ্বোধনী বক্তৃতা মুসাবিদায় বসিয়া গেলাম। সে রাত্র আমি ফারুকী সাহেবের মেহমান থাকিলাম। অনেক রাত-তক খাঁটিয়া অভিভাষণ লেখা শেষ করিলাম। পরদিন সকালে তাঁকে পড়িয়া শুনাইলাম। তিনি খুশী হইয়া ওটা সেইদিনই ছাপা শেষ করিবার হুকুম দিলেন এবং আমাকে আরেকদিন থাকিয়া যাইতে অনুরোধ করিলেন। আমিও তাঁর অনুরোধ ফেলতে পারিলাম না। রাত্রে খাওয়ার পর তিনি খানা-কামরা হইতে সকলকে বাহির করিয়া দিলেন। দরজা বন্ধু করিলেন। তারপর পকেট হইতে ছাপা ভাষণটি বাহির করিয়া বলিলেন: এটা কিভাবে পড়িতে হইবে আমাকে শিখাইয়া দেন।
আমি তাই করিলাম। অনেক রাত ধরিয়া একাজ চলিল। আমি উচ্চস্বরে নাটকীয় ভংগিতে দুই-একবার পড়িয়া নবাব সাহেবকে ঠিক ঐভাবে পড়িতে বলিলাম। কোথায় হাত নাড়িতে হইবে, কোথায় শুধু ডান হাতের শাহা আংগুল তুলিতে হইবে, কোথায় সুর উদারা মুদারা তারায় উঠানামা করিবে, সব শিখাইলাম। নবাব সাহেব বাংলা পড়ায় খুব অভ্যস্ত ছিলেন না। কিন্তু অসাধারণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, এডাল্ট করিবার অসামান্য ক্ষমতা ও কাও-জ্ঞান ছিল তাঁর প্রচুর। গলার আওয়াযটিও মিঠা ও বুলন্দ। সুতরাং দুই-তিন ঘন্টার চেষ্টায় তিনি এমন সুন্দর আবৃত্তিও করিলেন যে আমি বিশিত হইলাম। ডিনার টেবিলে দাঁড় করাইয়া রিহার্সাল দেওয়াইলাম। শেষে বলিলামঃ পরীক্ষায় পাশ।
পরদিনই আমি ময়মনসিংহে ফিরিয়া আসিলাম। প্যাণ্ডলে অভ্যর্থনা সমিতির কর্মকর্তাদের সাথে দেখা। সকলের মুখে হাসি। কর্ম-তৎপরতা দ্বিগুণিত। তাঁরা জানাইলেন, আমার আকস্মিক আত্মগোপনে সকলেই ঘাবড়াইয়া গিয়াছিলেন। ১৪৪ ধারার খবরে আকাশ-বাতাস ছাইয়া গিয়াছিল। প্যাণ্ডলে লোকজনের যাতায়াত কমিয়া গিয়াছিল। একদিন সকল কাজ বন্ধ ছিল। কিন্তু পরদিনই জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট তাঁরা জানিতে পারেন নবাব ফারুকী সম্মিলনী উদ্বোধন করিতে আসিতেছেন। ডি. এম, আরও জানান যে, তিনি সকল প্রকারে সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছেন। তখন তাঁরা বুঝিতে পারেন আমি আত্মগোপন করিয়া কোথায় গিয়াছি।
৬. স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে সাফল্য
এইভাবে শত্রুদের মুখে ছাই দিয়া বিপুল সাফল্যের সঙ্গে প্রজা সম্মিলনীর কাজ সমাধা হইল। হক সাহেবের অভিভাষণ, নবাব ফারুকীর উদ্বোধনী ভাষণ, ডাঃ সেনগুপ্তের সারগর্ভ অভ্যর্থনা ভাষণ, শহীদ সুহরাওয়াদী ও মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদের বক্তৃতা এবং প্রদর্শনীর উদ্বোধনীতে নলিনী বাবুর ভাষণ সকল দিক দিয়া তথ্যপূর্ণ ও জনপ্রিয় হইয়াছিল। এই সম্মিলনীর ফলে সারা বাংলায় প্রজা-আন্দোলনের জয়যাত্রা শুরু হইল। বিশেষ করিয়া এ জিলার প্রজা-সমিতি একটা বিপুল শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইল। অবসরপ্রাপ্ত ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আবদুল মজিদ ও নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলীর অর্থ-সাহায্যে জিলা কৃষক-প্রজা সমিতির ‘মিলন প্রেস’ নামক ছাপাখানা ও ‘চাষী’ নামক সাপ্তাহিক কাগয বাহির হইল।
এই সময় জিলার সর্বত্র লোক্যাল বোর্ড ও জিলাবোর্ডের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পার্টি হিসাবে প্রজা-সমিতি সমস্ত লোকাল বোর্ডে প্রার্থী খাড়া করে। গোটা জিলার ৭২টি আসনের মধ্যে প্রজা-সমিতি ৬৪টি আসন দখল করে। তৎকালে লোক্যাল বোর্ডের নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে জিলা বোর্ডের মেম্বর নির্বাচিত হইতেন। এই নির্বাচনেও প্রজা-সমিতি জয়লাভ করে। জিলা বোর্ড প্রজা-সমিতির হাতে আসে। কিন্তু আমার একটা ভুলে সব ভণ্ডুল হইয়া যায়। জিলা বোর্ডের চেয়ারম্যান কে হইবেন, সেটা ঠিক করিতে বোর্ডের নবনির্বাচিত মেম্বরদের মত নেওয়া আমার উচিৎ ছিল। কিন্তু আমি তা করিলাম না। পার্লামেন্টারী রাজনীতিতে তখন আমার বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা ছিল না। আমি কংগ্রেসে প্রাপ্ত ডিসিপ্লিন-বোধ হইতে সরলভাবে মনে করিলাম, প্রজা-সমিতির টিকিটে যখন মেম্বাররা নির্বাচিত হইয়াছেন, তখন প্রজা সমিতির নির্দেশই তাঁরা বিনা-আপত্তিতে মানিয়া লইবেন। এটা ছিল আমার নির্বুদ্ধিতা। প্রজা-সমিতি তখন নবজাতশিও। প্রাচীন শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানেও অতটা। অন্ধ আনুগত্য আশা করা যাইতে পারে না। তাছাড়া যাঁরা নির্বাচিত হইলেন, তাঁরা নাবালক শিশু নন। জিলা বোর্ড শাসনে কার কি অভিজ্ঞতা আছে ও থাকা দরকার, এটা তাঁরা যেমন জানেন আমি বা প্রজা-সমিতির অনেকেই তা জানেন না। কাজেই চেয়ারম্যানের জন্য তোক বাছাই-এ তাঁদের মতামতের মূল্য খুব বেশি। কিন্তু অনভিজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাহেতু আমি তাঁদের জিজ্ঞাসা না করিয়া ওয়াকিং কমিটি দ্বারা এই বাছাই করাইলাম। অবসরপ্রাপ্ত ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মৌঃ আবদুল মজিদ সাহেবকে। ওয়ার্কিং কমিটি, চেয়ারম্যানির নমিনেশন দিল। মেম্বররা স্বভাবতঃই অসন্তুষ্ট হইলেন। প্রজা-সমিতির নির্দেশ অমান্য করিয়া নূরুল আমিন সাহেব নিজে প্রার্থী হইলেন ও অধিকাংশের ভোটে নির্বাচিত হইলেন। নির্বাচিত হইবার পর অবশ্য নুরুল আমিন। সাহেব ঘোষণা করিলেন যে তিনি এখনও প্রজা-সমিতির প্রতিনিধি আছেন ও থাকিবেন এবং জিলা বোর্ডে প্রজা-সমিতির নীতি কার্যকরী করিবেন। অনেক দিন তক তিনি করিলেনও তাই। কিন্তু জিলা বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচনে জিলা প্ৰজা সমিতির নেতৃত্বে যে ভাংগন ধরিয়াছিল, সেটা আর জোড়া লাগে নাই। তবু প্রজা আন্দোলন তার নিজের জোরেই অগ্রসর হইতেছিল। জিলা বোর্ড লইয়া নেতৃত্বের মধ্যে ঝগড়া হইলেও সাধারণ কর্মীদের মধ্যে তার ছোঁয়া লাগে নাই। অর্থনৈতিক কর্ম পন্থার দরুন ছাত্র সমাজে প্রজা-সমিতির সমর্থক যে দল দ্রুত গড়িয়া উঠিতেছিল, তাদের মধ্যেও বিন্দুমাত্র নিরুৎসাহ দেখা দেয় নাই।
