দ্বিতীয় ঘটনাটি সাম্প্রতিক। অভ্যর্থনা সমিতি গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা চাঁদা আদায়ে শহরে বাহির হইয়াছি। ডাঃ সেন ও সূর্যবাবুর পরামর্শে আমরা হিন্দু বড় লোকদের কাছে চাঁদার জন্য ত যাইতামই, জমিদারদের কাছেও যাইতাম। এ জিলার অন্যতম বড় জমিদার নবাবযাদা হাসান আলী তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজা সমিতিতে যোগ দেন নাই বটে, কিন্তু আমাদের আন্দোলনে তাঁর সমর্থন আছে একথা তখন জানাজানি হইয়া গিয়াছে। কাজেই কখনও ডাঃ সেনকে সঙ্গে লইয়া কোনদিন নিজেরাই জমিদারদের কাছে চাঁদা চাইয়া বেড়াইতে লাগিলাম। এমনি একদিন আমরা অভ্যর্থনা সমিতির লোকজন দল বাঁধিয়া এক জমিদারের কাঁচারি ঘরে ঢুকিলাম। জমিদার বাবু এক পাশে ইবি চেয়ারে হেলান দিয়া হুক্কা টানিতেছেন। অন্যদিকে চার-পাঁচটা চৌকিতে ঢালা ফরাসে কর্মচারিরা কাজ করিতেছেন। জমিদার বাবুর নিকট আমি সুপরিচিত। তাঁর এক পুত্র আমার ক্লাস ফ্রেণ্ড ছিলেন। আরেক পুত্র আমাদের সংসী উকিল। আমাকে দেখিয়াই তিনি সোজা হইয়া বসিলেন এবং দল বাঁধিয়া আসার কারণ জিগগাসা করিলেন। আমি বেশ একটু বিস্তারিতভাবেই আমাদের উদ্দেশ্য বর্ণনা করিলাম এবং প্রসংগক্রমে এই সম্মিলনীর সাথে ডাঃ সেন ও সূর্যবাবুর সম্পর্কের কথা হয়ত একটু অতিরঞ্জিত করিয়াই বলিলাম। তিনি সব কথা শুনিয়া অসংকোচে বলিলেন : হ, চাঁদার জন্য খুব উপযুক্ত পাত্রের কাছেই আসিয়াছ। তোমরা জমিদারের মার্গে বাঁশ দিবে, আর আমরা জমিদাররা সে কাজে চাঁদা দিব?
আমিও এই পিতৃতুল্য ব্যক্তির কথার পৃষ্ঠে অসংকোচে নির্ভয়ে সমান জোরে বলিলাম : জি হাঁ, আলবত দিবেন।
আমার কথার জোর দেখিয়া ভদ্রলোক বিস্ময়ে বলিলেন : কেন দিব? আমি বলিলামঃ তেলের দাম দিবেন।
সদাহাস্যময় ভদ্রলোক ভেবাচেকা খাইয়া গেলেন। ‘তেলের দাম?’ শব্দটা তিনি দুই-তিনবার স্বগত উচ্চারণ করিলেন। অবশেষে খাযাঞ্চি বাবুর দিকে চাহিয়া উচ্চস্বরে বলিলেন : মনসুরকে দশটা টাকা এক্ষণি দিয়া দাও ত। খরচের ঘরে লেখ? তেলের দাম বাবদ প্রজা সমিতিকে। উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত নীরব। আমার সহকর্মীরাও। শুধু জমিদার বাবু স্বয়ং তাঁর প্রশস্ত গোঁফের নিচে মুচকি হাসিতেছিলেন। আমার গোঁফ টোফ না থাকায় আমার দন্তবিকাশ সকলের চোখে পড়িতেছিল। কিন্তু আমার সে হাসির অর্থ বোঝা গেল অসাধারণ সাফল্যে। এই ভদ্রলোক জীবনে এক সংগে দশ টাকা চাঁদা আর কোনও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে দেন নাই।
যথারীতি রশিদ দিয়া অতিরিক্ত নুইয়া ভদ্রলোককে আদাব দিয়া আমরা বাহির হইয়া আসিলাম। রাস্তায় নামিয়াই সহকর্মীরা আমাকে ধরিলেন : ‘ব্যাপারটা কি? তেলের দাম নিয়া কি ম্যাজিকী কথা বলিলেন, আর অমন কৃপণ ভদ্রলোক দিয়া দিলেন দশটা টাকা?’ জবাবে আমি বন্ধুদের দৃষ্টি ভদ্রলোকের কথিত বাঁশের দিকে আকর্ষণ করিলাম এবং ওকাজে তেল ব্যবহারের উপকারিতা বর্ণনা করিলাম। এতক্ষণে বন্ধুরা রসিকতাটার মর্ম বুঝিতে পারিলেন। হো হো করিয়া রাস্তার মধ্যেই এ-ওর ঘাড়ে পড়িতে লাগিলেন।
রসিকতাটা কড়ুয়া বলিয়াই বোধ হয় শহরের সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। মহারাজার সংগে দেখা করিয়াই বুঝিলাম তাঁর কানেও পৌঁছিয়াছে। আমাকে দেখিয়াই মহারাজা বলিয়া উঠিলেন? কি আমার কাছে তেলের দাম আদায় করতে আসছ নাকি? ডাঃ সেন হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। আমরা দুজনেও উচ্চস্বরে হাসিয়া উঠিলাম। কাজেই আমার জবাব দেওয়ার দরকার হইল না। পরে বুঝিয়াছিলাম কথাটা চাপা দেওয়ার জন্যই ডাঃ সেন অতজোরে হাসিয়াছিলেন। যাহোক, ডাঃ সেনের যুক্তিতে মহারাজা মাতিলেন। পরদিন হইতে অসংখ্য লোক লাগিয়া গেল। বন-বাদাড় নালা-ডুবা আট হইয়া গেল। পাঁচ-ছয় মাস পরে সেখানে অসংখ্য আলোক-মালা সজ্জিত প্যাণ্ডালে-স্টলে হাজার-হাজার লোকের দিনরাত ব্যাপী সমাবেশ হইল।
৫. নবাব ফারুকী ও নলিনী বাবুর সহায়তা
অন্য একটি ঘটনায় ময়মনসিংহ প্রজা সম্মিলনীর অধিবেশনে চাঞ্চল্য এবং দর্শকের সমাবেশে বিস্ময়কর প্রাচুর্য ঘটিয়াছিল। সম্মিলনীর নির্ধারিত তারিখের মাত্র পাঁচ-ছয় দিন আগে বিশ্বস্ত লোকের মারফত খবর পাইলাম, জিলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ ডাউ প্রজা সম্মিলনীর উপর ১৪৪ ধারা জারির আদেশ দিয়াছেন। নেতৃস্থানীয় আমাদের কয়েকজনের নামে নোটিশ লেখা হইতেছে। দুই-একদিনের মধ্যেই জারি হইবে। সংবাদদাতাদের অবিশ্বাস করিবার বা তাঁদের খবরে সন্দেহ করিবার কোনও কারণ ছিল না। কাজেই বুঝিলাম বিপদ অনিবার্য। কিন্তু নিশ্চিত আসন্ন বিপদে মূষড়াইয়া পড়িলাম না। নিছক উৎপ্রেরণামে কাউকে কিছু না বলিয়া আমি কলিকাতা চলিয়া গেলাম। কৃষিমন্ত্রী অনারেবল নবাব কে. জি, এম. ফারুকীকে প্রজা সম্মিলনী উদ্বোধন করিতে ও শ্রীযুক্ত নলিনী রঞ্জন সরকারকে প্রদর্শনী উদ্বোধন করিতে রাযী করিলাম। এসব করিবার পর হক সাহেব, ডাঃ সেনগুপ্ত, মৌঃ মুজিবুর রহমান প্রভৃতি নেতৃবৃন্দের সহিত দেখা করিলাম এবং সমস্ত অবস্থা বিবৃত করিলাম। একমাত্র মৌঃ মুজিবুর রহমান সাহেব নলিনী বাবু সম্পর্কে কিছুটা আপত্তি করিলেন। সমস্ত অবস্থা শুনিয়া ও বিবেচনা করিয়া শেষ পর্যন্ত তিনিও মন্দের ভাল হিসাবে আমার কাজ অনুমোদন করিলেন।
