মওলানা আকরম খাঁ সাহেব গাবতঃই এবং ন্যায়তই আমার উপর কুদ্ধ হইলেন। নিখিল-বংগ প্রজা সমিতির সেক্রেটারি হিসাবে তিনি অন্যায়ভাবে সম্মিলনী অনিদিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা থোষণা করিলেন। এই মর্মে সমস্ত জিলা ও মহকুমা শাখায় টেলিগ্রাম করিয়া দিলেন। আমি অভ্যর্থনা সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি হিসাবে এই বে-আইনী স্থগিত অগ্রাহ্য করিলাম। দলে দলে প্রতিনিধিদের সফিনীতে যোগ দিতে অনুরোধ করিয়া প্রতি জিলায় ও মহকুমায় টেলিগ্রাম করিয়া দিলাম এবং সংবাদপত্রে বিবৃতি দিলাম।
মওলানা সাহেবের বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও বিরাট সাফল্যের সঙ্গে তিন দিনব্যাপী সম্মিলনী এবং এক মাসব্যাপী কৃষি-শিল্প-প্রদর্শনী হইল। প্রদর্শনীটা এত জনপ্রিয় হইয়াছিল যে নির্দিষ্ট এক মাস মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও আরও পনর দিন মেয়াদ বাড়াইয়া দেওয়াইয়াছিল।
৩. সম্মিলনীর সাফল্যের হেতু
কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও ময়মনসিংহ প্রজা-সম্মিলনী সফল হইবার কারণ ছিল। তার প্রথম কারণ এই যে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধতা যখন শুরু হয় তখন সম্মিলনীর আয়োজনের কাজ সমাপ্ত হইয়া গিয়াছে। দ্বিতীয়তঃ সাধারণভাবে সারা বাংলায় এবং বিশেষভাবে ময়মনসিংহ জিলায় তৎকালে প্রজা-আলোলন জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে উঠিয়াছিল। প্রজা-আলোশনের জনপ্রিয়তা ছাড়া সম্মিলনীর অভ্যর্থনা সমিতিরও একটা নিজস্ব ক্ষমতা ও মর্যাদা ছিল। সম্মিলনীর সভাপতি হক সাহেব ও অন্যান্য নিমন্ত্রিত ও সমাগত নেতৃবৃন্দের সকলেরই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল। বস্তুতঃ নিখিল বংগ প্রজা সম্মিলনীর ১৯৩৫ সালের ময়মনসিংহ অধিবেশনের মত সাফল্যমণ্ডিত প্রাদেশিক কোনও সম্মিলনী বাংলায় আর হয় নাই, একথা অনেকেই বলিয়াছিলেন। অভ্যর্থনা সমিতিতে যেমন করিয়া সকল দলের ও সকল শ্রেণীর নেতৃ-সমাবেশ হইয়াছিল ময়মনসিংহ জিলায় তেমন আর হয় নাই। এই অভ্যর্থনা সমিতির চেয়ারম্যান ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক ও আইনবিদ ডাঃ নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত। এর তিনজন ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন খান বাহাদুর মৌঃ ইসমাইল, ডাঃ বিপিন বিহারী সেন ও মিঃ সূর্য কুমার সোম এবং জেনারেল সেক্রেটারি ছিলাম আমি। কৃষি-শিল্প-প্রদর্শনী কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মিঃ নুরুল আমিন, প্যাল কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মৌঃ আবদুল মোননম খাঁ, ফাঁইনাল কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মৌঃ মোহাম্মদ ছমেদ আলী, একোমোডেশন কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মৌ তৈয়বুদ্দিন আহমদ, লান্টিয়ার কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মৌঃ গিয়াসুন্দিন পাঠান, লান্টিয়ার কোরের জি.ও. সি. ছিলেন মৌঃ মোয়াধ্যম হুসেন খাঁ। এতদ্ব্যতীত প্রজা সমিতি, কংগ্রেস ও আমন সকল প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট কর্মীদের অনেকেই এই অভ্যর্থনা সমিতির বিভিন্ন দফতরে দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করিয়াছিলেন। ফলতঃ একমাত্র জিলা বোর্ডের চেয়ারম্যান খান বাহাদুর শরফুদ্দিন আহমদ সাহেব ছাড়া এ শহরের সকল সম্প্রদায় ও দলের উল্লেখযোগ্য সকল নেতাই এই প্রজা সম্মিলনীতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন। একযিবিশন কমিটির সেক্রেটারি হিসাবে জনাব নুরুল আমিন এমন অসাধারণ কর্মক্ষমতার পরিচয় দিয়াছিলেন যে তাঁর আয়োজিত প্রদর্শনী দেড় মাস কাল এই শহরকে এমনকি গোটা জিলাকে কর্মচঞ্চল করিয়া রাখিয়াছিল। সরকারী-বেসরকারী বহু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগতভাবে বহু শিল্পী কৃষক ও ব্যবসায়ী তাঁদের প্রদর্শনযোগ্য জিনিসপত্র লইয়া এই প্রদর্শনীতে যোগ দিয়াছিলেন। দৈনিক জপ্রতি এক আনা করিয়া প্রবেশ ফি থাকা সত্ত্বেও দেড় মাস ধরিয়া এই প্রদর্শনীতে প্রতিদিন হাজার হাজার লোকের ভিড় হইত। প্যান্ডাল কমিটির সেক্রেটারি হিসাবে মৌঃ আবদুল মোননম খাঁ এমন মৌলিক পরিকল্পনা প্রতিভার পরিচয় দিয়াছিলেন যে তাঁর নির্মিত ও সজ্জিত প্যাণ্ডালের মত সুদৃশ্য সুউচ্চ বিশাল ও মনোরম প্যাণ্ডাল কংগ্রেসেরও কোন প্রাদেশিক সম্মিলনীতেও হয় নাই। সুউচ্চ জোড়া মিনারযুক্ত তিনটি বিশাল তোরণ দিয়া বিরাট প্যাণ্ডলে প্ৰবেশ করিতে হইত। প্যাণ্ডালের উপরে ঠিক মধ্যস্থলে ছিল শতাধিক ফুট উচ্চ এক সুডৌল বিশালকায় গম্বয। সোলালী কাগযে মোড়া এই গুম্বয বহুদূর হইতে দেখা যাইত। মনে হইত সত্যই কোনও সুউচ্চ মসজিদের সোনালী গম্বয। এই গম্বয এতই জনপ্রিয় হইয়াছিল যে সম্মিলনী শেষ হইবার বহুদিন পর পর্যন্ত জনসাধারণের বিরুদ্ধতার দরুন প্যাণ্ডাল ভাংগা যায় নাই। যতদিন প্রদর্শনীর কাজ শেষ না হইয়াছিল, ততদিন প্রদর্শনী গ্রাউণ্ড ও প্যাণ্ডালের সবটুকু যায়গা সারা রাত আলোক-সজ্জিত থাকিত এবং রাত-দিন লোকের ভিড় থাকিত। বস্তুতঃ ময়মনসিংহ শহরের বড় বাজার ও ছোট বাজারের মধ্যবর্তী বর্তমান বিশাল ময়দানটি প্রজা সম্মিলনীর দৌলতেই আবাদ হইয়াছিল।
৪. মহারাজার বদান্যতা
এর আগে এই জায়গা নালা-ডুবা, বন-জংগল ও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ ছিল। দিনের বেলায়ও এই জায়গায় কেউ প্রবেশ করিত না। এখানে প্রবেশ করিবার দৃশ্যতঃ। কোন রাস্তাও ছিল না। সেজন্য এই শহরে কুড়ি বছর বাস করিয়াও এবং এই ময়দানের চার পাশের দোকান-পাটে কুড়ি বছর সওদা করিয়াও অনেকে জানিত না যে এই সব দোকানের পিছনেই একটা বিশাল এলাকা বন-জংগল ও ডুবা-নালায় ভরিয়া আছে। যদিও এখান হইতেই এ শহরের সমস্ত মশার উৎপত্তি হইত বলিয়া মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষ জানিতেন, তবু এটা ভরাট ও পরিষ্কার করিবার অর্থনৈতিক দুঃসাহস কখনও করেন নাই। মিউনিসিপ্যালিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান কংগ্রেস নেতা, আমার পরম শ্রদ্ধেয় গুরুজন এবং প্রজা-সম্মিলনীর অভ্যর্থনা সমিতির সহ সভাপতি ডাঃ বিপিন বিহারী সেনের সঙ্গে সম্মিলনীর জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের কথা আলোচনা করি। সার্কিট হাউস ময়দান এ শহরের একমাত্র বড় খোলা স্থান। কিন্তু এটা সরকারী জমি। এখানে কোনও সভা-সম্মিলনী করিতে দেওয়া হয় না। কাজেই পাটগুদাম এলাকাই ছিল বড়-বড় সভা-সম্মিলনী করিবার একমাত্র স্থান। উহাদের মধ্যে একটা সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান নির্বাচনেই ডাঃ সেনের সহায়তা নিতে। ছিলাম। তিনিই এই পরিত্যক্ত বন-বাদাড়ের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই উদ্দেশ্যে মহারাজা শশিকাস্তের সঙ্গে দেখা করিলাম। মহারাজা শশিকান্ত উদারমনা রসিক পুরুষ ছিলেন। কিন্তু দুইটা ঘটনায় আমার উপর তাঁর রাগ থাকিবার কথা। একটা বেশ পুরান। প্রায় বছর খানেক আগের ঘটনা। একদিন মহারাজার জমিদারিতে ফুলবাড়িয়া থানার জোরবাড়ি গ্রামে একটা প্রজা-সতা হইবার কথা। আমরা কয়েকজন সভাস্থলে গিয়াছি যোহরের নামাযের শেষ ওয়াকতে বেলা সাড়ে তিনটায়। একটি পতিত জমিতে সভার উদ্যোক্তারা হোট একখানা শামিয়ানা খাটাইবার খুটি খাটা গাড়িতে ছিলেন। অতি অল্প লোকই তখন সভায় আসিয়াছে। এমন সময় অদূরবর্তী জমিদার কাঁচারি হইতে, একজন কর্মচারী দুইজন পুলিশসহ সভাস্থলে আসিয়া আমাদের জানাইলেন, স্থানটি মহারাজার খাস জমির অন্তর্ভুক্ত। ওখানে সভা হইতে দেওয়া হইবে না, এটাই মহারাজার হুকুম। সংগী পুলিশ দুইজন জমিদার কর্মচারির সমর্থন করিল। উদ্যোক্তারা আমার মত চাহিলেন। আমি শামিয়ানার খুটা খাঁটি ও টেবিল-চেয়ার লইয়া তাঁদের নিজস্ব কোনও জমিতে যাইবার নির্দেশ দিলাম। সদ্য-ধান-কাটা একটি নিচু জমিতে সভার স্থান করা হইল। পুলিশ ও জমিদারের বাধাদানের খবরটা বিদ্যুৎবেগে গ্রামময় ছড়াইয়া পড়িল। স্বাভাবিক অবস্থায় যেখানে তৎকালে এই সভায় হাজার-বার শ’র বেশি লোক হইত না, সন্ধ্যার আগেই সেখানে পাঁচ ছয় হাজার লোকের সমাগম হইল। জনতার দাবিতে অনেক রাত-তক সভা চালাইতে হইল। ঐ সভায় বক্তৃতা করিতে গিয়া সেইদিনকার ঐ ঘটনা বর্ণনা করিয়া আমি বলিয়াছিলাম পল্লী গ্রামের পতিত জমিও মহারাজার নিজের এই দাবিতে তিনি আজ একটি মাঠে আপনারা তাঁরই প্রজাসাধারণকে শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক একটা সতা করিতে দিলেন না। আমি মহারাজাকে হুঁশিয়ার করিয়া দিতে চাই, এই পন্থায় প্রজা-আন্দোলন রোধ করা যাইবে না। বরঞ্চ এতে প্রজা-আন্দোলন একদিন শক্তিশালী গণ-আন্দোলনে পরিণত হইবে। আমরা জমিদারি উচ্ছেদ করিয়া এ যুলুম একদিন বন্ধ করিবই। মহারাজার লোক কেউ এই সভায় থাকিয়া থাকিলে তিনি তাঁর। কাছে এই কথা পৌঁছাইবেন যে আজ আমরা নিজেদের গ্রামে জমিদারের কাঁচারির নিকটে একটা সভা করিতে পারিলাম না, কিন্তু একদিন আসিবে, যেদিন আমরা মহারাজার রং মহল ‘শশী লজ’কে আমাদের সন্তানদের পাঠশালা বানাইব। কথাটা মহারাজার কানে যথাসময়ে উঠিয়াছিল। তিনি আমার উপর খুব চটিয়াছিলেন।
