সার আবদুর রহিমের স্থলবর্তী নির্বাচন করা খুব কঠিন ছিল। তিনি ছিলেন সকল দলের আস্থাভাজন। তক্কালে প্রজা সমিতি বাংলার মুসলমানদের একরূপ সর্বদলীয় প্রতিষ্ঠান নি। কংগ্রেসী-অকংগ্রেসী, সরকার-ঘেষা, সরকার-বিরোধী, সকল দলের মুসলমান রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর সমাবেশ ছিল এই প্রজা সমিতিতেই। এ অবস্থায় সার আবদুর রহিমের স্থলবর্তী নির্বাচনে ওয়ার্কিং কমিটির মধ্যে অতি সহজেই দুই দল হইয়া গেল। প্রজা সমিতির সেক্রেটারি মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর নেতৃত্বে প্রবীণ, প্রজা নেতাদের একদল খান বাহাদুর আবদুল মোমিন সি, আই. ই.-কে সমিতির প্রেসিডেন্ট করিতে চাহিলেন। অপরদিকে আমরা তরুণরা জনাব মৌঃ এ. কে. ফযলুল হক সাহেবকে সভাপতি করিতে সহিলাম। প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হইয়া গেল। কিন্তু প্রার্থীদ্বয়ের মধ্যে নয়– তীদের সমর্থকদের মধ্যে। ধুম ক্যানভাসিং শুরু হইল। সাধারণভাবে তরুণ দল, তথাকথিত প্রগতিবাদী দল, কংগ্রেসী ও কংগ্রেস সমর্থক দল হক সাহেবের পক্ষে। তেমনি সাধারণভাবে বুড়ার দল, খান সাহেব-খান বাহাদুর সাহেবরা সবাই মোমিন সাহেবের পক্ষে। জয়-পরাজয় অনিশ্চিত। উভয় পক্ষই বুঝিলাম শত্রুপক্ষ দুর্বল নয়। কাজেই শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই বিদায়ী সভাপতি সার আবদুর রহিমকে সালিশ মানিলাম। সার আবদুর রহিম এই শর্তে সালিশ করিতে রাযী হইলেন। তিনি সিলমোহর করা ইনভেলাপে তাঁর মনোনীত ব্যক্তির নাম লিখিয়া রাখিয়া দিল্লী চলিয়া যাইবেন। সেখান হইতে তাঁর টেলি পাইলে পর আমরা ইনভেলাপ খুলিব এবং তাঁর রায় মানিয়া লইব। উভয় পক্ষই এই শর্তে রাযী হইলাম। কিন্তু সার আবদুর রহিম এর পর যে কয়দিন কলিকাতা থাকিবেন, ততদিন উভয় পক্ষই গোপনে এ-ওর অজ্ঞাতে যার-তার ক্যানডিডেটের পক্ষে সার আবদুর রহিমকে জোর ক্যানভাস করিলাম। সার আবদুর রহিম ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির লোক। বড় একটা হাসিতেন না। তবু আমাদের কার্যকলাপে তিনি মনে-মনে নিশ্চিয়ই হাসিতে ছিলেন। সেটা বুঝিয়াছিলাম পরে।
যথাসময়ে সমিতির সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট মৌলবী আবদুল করিম সাহেবের ওয়েলেস লি স্কোয়ার বাড়িতে প্রজা সমিতির ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বসিল। মৌঃ আবদুল করিম সভাপতির আসন গ্রহণ করিলেন। প্রকাশ্য সভায় কন্টাকদারের টেণ্ডার খুলিবার মত সমস্ত ফর্মালিটি সহকারে সার আবদুর রহিমের রোয়েদাদনামার সিলমোহর-করা ইনভেলাপ খোলা হইল। আমাদের সমস্ত আশা-ভরসা ও ধারণা-বিশ্বাস ধুলিসাৎ হইয়া গেল। সার আবদুর রহিম খান বাহাদুর মোমিন সাহেবকেই সভাপতি মনোনীত করিয়াছেন। মওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের দল বিজয়োল্লাস হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিলেন। আমরা নিরাশ স্তম্ভিত ও অবশেষে ক্রুদ্ধ হইলাম। সভাপতি মৌলবী আবদুল করিম তাঁর স্বভাবসুলভ শান্ত ও ধীরভাবে আমাদের রোয়েদাদ মানিয়া লইবার উপদেশ দিলেন, যদিও আমরা জানিতাম তিনি ব্যক্তিগতভাবে হক সাহেবের সমর্থক ছিলেন। . কিন্তু আমরা বিশ্বাস ভংগ করিলাম। উভয় পক্ষের মানিত সালিশের রোয়েদাদ মানিলাম না। আমরা সরল আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করিতাম প্রজা আন্দোলনের শক্তি প্রগতি ও সংগ্রামী ভূমিকার খাতিরেই হক সাহেবকে সভাপতি করা দরকার। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস যাই থাক না কেন, সালিশ যখন মানিয়াছি তখন সালিশের রোয়েদাদও আমাদের মানা উচিৎ ছিল। রাজনৈতিক সাধুতার খাতিরে তাই ছিল আমাদের অবশ্য বর্তব্য। কিন্তু আমরা তা করিলাম না। বলিতে গেলে এই বিশ্বাসঘাতকতার নেতৃত্ব আমিই করিয়াছিলাম। আমি নূতন করিয়া যুক্তি খাড়া করিলাম: কোন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানেরই সভাপতির পদ এমনভাবে সালিশির দ্বারা নির্ধারণ করা যায় না। এটা গণতন্ত্রের খেলাফ। সমিতির মেরদিগকে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নাই। ইত্যাদি ইত্যাদি। অতএব আমরা নির্বাচন দাবি করিলাম।
২. প্রজা সম্মিলনীর ময়মনসিংহ অধিবেশন
ইতিপূর্বেই স্থির হইয়াছিল প্রজা সম্মিলনীর আগামী বার্ষিক অধিবেশন ময়মনসিংহে হইবে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অনুকরণে এটা আগের বছরের সম্মিলনীতেই ঠিক হইয়া থাকিত। আগের বছরের সম্মিলনী হইয়াছিল কুষ্টিয়ায়। আমরা সমিতির সভাপতি নির্বাচন লইয়া যখন ঐরূপ প্রতিদ্বন্দিতা করিতেছিলাম তখন আগামী বার্ষিক সম্মিলনী আমাদের সামনে ছিল। কাজেই সে ব্যাপারেও আমাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিল। মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের মতে আগামী সম্মিলনীর সভাপতি হওয়া উচিৎ মোমিন সাহেবের। আমাদের মতে হওয়া উচিৎ হক সাহেবের। এ ব্যাপারেও মওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের দলের দাবি অধিকতর ন্যায়সংগত ছিল। গত সম্মিলনীর সভাপতি ছিলেন হক সাহেব। একজনকেই পর পর দুই বছর সম্মিলনীর সভাপতির করা ঠিক হইবে না। আমরা মনে মনে স্বীকার করলাম মওলানা সাহেবের এই যুক্তি সারবান। রাখীও হয়ত হইতাম আমরা। কিন্তু সমিতির প্রেসিডেন্টগিরি লইয়া মতভেদ হওয়ায় আমরা সম্মিলনীর সভাপতিত্ব বিনা শর্তে ছাড়িয়া দিতে সাহস করিলাম না। এ ব্যাপারে মওলানা সাহেবের সহিত কোনও আপোষরফা না হওয়ায় আমি অভ্যর্থনা সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি হিসাবে অভ্যর্থনা সমিতির সাধারণ অধিবেশনে হক সাহেবকে সম্মিলনীর সভাপতি নির্বাচন করিলাম এবং সংবাদপত্রে ও হবিলে তা প্রচার করিলাম। মওলানা সাহেব ন্যায়তই ইহার প্রতিবাদ করিলেন। তক্কালে অভ্যর্থনা সমিতির পক্ষে সন্মিলনীর সভাপতি নির্বাচনের প্রথা চালু ছিল বটে কিন্তু কেন্দ্রীয় কোনও প্রতিষ্ঠান না থাকিলেই সেটা করা হইত নিখিল-বংগ প্রজা সমিতির মত প্রতিষ্ঠান থাকায় অভ্যর্থনা সমিতির সে অধিকার ছিল না। তবু জোর করিয়াই আমি তা করিয়া ফেলিলাম।
