‘মুসলিম-বাংলার মাতৃভাষা বাংলা নয় উর্দু।‘ তখন গরিব আলেম-ওলামা ও সাহিত্যিকদের সাথে গলা মিলাইয়া যে একজন মাত্র নবাব বলিয়াছিলেন : “আমাদের মাতৃভাষা উর্দু নয় বাংলা।” তিনি ছিলেন ধনবাড়ির জমিদার নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তাঁর আত্মীয়-স্বজন সহকর্মীদের মত ঠেলিয়াই তিনি এই বিবৃতি দিয়াছিলেন। এটা তাঁর মত সরকারপন্থী মডারেট রাজনীতিকের জন্য কত বড় দুঃসাহসিকতার কাজ ছিল, পঞ্চাশ বছর পরে আজ তা অনুমান করা সহজ নয়। কিন্তু মুসলিম-বাংলার জীবন-মরণ প্রশ্নে এই সাহস দেখান তিনি তাঁর কর্তব্য মনে করিয়াছিলেন।
দ্বিতীয় ঘটনাটিও তেমিন দুঃসাহসিক ও মনোবলের পরিচায়ক। খিলাফত আন্দোলনে তখন দেশ ছাইয়া গিয়াছে। বৃটিশ ও ভারত সরকার মুসলমানদের এই আন্দোলন দমন করিবার জন্য বিশেষ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার সংকল্প করিয়াছেন। সারা ভারতবর্ষে একজন মাত্র সরকারী লোক খিলাফত সম্পর্কে যুক্তি পূর্ণ সুলিখিত পুস্তিকা প্রচার করিয়া খিলাফত আন্দোলনের ন্যায্যতা প্রমাণ করিয়াছিলেন এবং বৃটিশ ও ভারত সরকারকে দমন-নীতি হইতে বিরত থাকিয়া মুসলিম ভারতের দাবি-মত খিলাফত প্রশ্ন মীমাংসার পরামর্শ দিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন ধনবাড়ির নবাব সাহেব।
যদিও দুইটাই অবিস্মরণীয় ঘটনা, তবু তা আমার মনে পড়িল এতদিনে। আমি বলিতেও লাগিলাম বন্ধুদেরে বিস্তারিতভাবেই। তাঁরা বিশ্বাস করিলেন নিশ্চয়ই। কিন্তু এটাও তাঁরা বুঝিলেন, তথ্য যতই সত্য হোক, প্রয়োজন না হইলে তা কারও মনে পড়ে না আমারও না।
সকলে এক বাক্যে গযনবীর বিরুদ্ধে নবাব্যদাকে সমর্থন করিতে রাখী হইলেন। তিনি নমিনেশন পেপার ফাঁইল করিয়াছেন এবং খান বাহাদুর ইসমাইলসহ প্রজা সমিতির সকলে নবাবযাদাকে সমর্থন দিতেছেন শুনিয়া গ্যনবী সাহেব ঢাকার নবাব বাহাদুরসহ জমিদারদের এক বিরাট বাহিনী সইয়া ময়মনসিংহে আসিলেন। নবাবযাদাকে নমিনেশন প্রত্যাহার করিতে চাপ দিলেন। নবাবযাদা অল্পদিনেই আমার প্রতি এতটা আকৃষ্ট হইয়াছিলেন যে তিনি মনসুর সাব যা করেন, তাতেই আমি রাযী বলিয়া সমস্ত চাপ আমার ঘাড়ে ফেলিলেন।
মাত্র দুইদিনের পরিচয়ে অভিজাত বংশের একটি তরুণ যুবক তাঁর রাজনৈতিক ভাগ্য আমার উপর ছাড়িয়া দেওয়ায় আমি যেমন মুগ্ধ ও গর্বিত হইলাম, তেমনি আমার দায়িত্বের গুরুত্বে চিন্তাযুক্তও হইলাম। সাধ্যমত আমার দায়িত্ব পালনও করিলাম। সমবেত নেতা ও মুরুব্বিদের-দেওয়া সনাতন সব যুক্তি যথা : ইসলামের বিপদ, মুসলিম সংগতির আশু আবশ্যকতা, গয়নবী সাহেবের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা, নবাবযাদার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ শুধু এইবার বাদে, ইত্যাদি সব যুক্তির চাপ কাটাইয়া উঠিতে পারিলাম। কিন্তু একটা বিষয় আমাকে খুব চিন্তিত করিল। স্বয়ং নবাব্যাদাও চিন্তামুক্ত ছিলেন না। সেটি এই যে ম্যাট্রিক সার্টিফিকেট অনুসারে নবাবযাদার বয়স তখন পঁচিশ হয় নাই। পঁচিশ না হইলে আইন পরিষদের নির্বাচন-প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হয় না। গয়নবী সাহেবের সমর্থকরা আমাদের পক্ষের এই গুপ্ত কথা জানিয়া ফেলিয়াছেন এটা কথা-বার্তায় স্পষ্ট বোঝা গেল। এই প্রশ্ন রিটার্নিং অফিসার ঢাকা বিভাগের কমিশনারের নিকট উঠিলে নবাবযাদার নমিনেশন পেপার স্কুটিনিতেই বাতিল হইয়া যাইতে পারে। আমাদের নেতা হক সাহেব স্বয়ং এই দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে পাশের কামরায় ডাকিয়া নিয়া নবাবযাদার উপস্থিতিতে এ বিষয়ে তাঁর লিগ্যাল অপিনিয়ন চাহিলাম। তিনিও সেই কথাই বলিলেন। নবাব্যাদার নমিনেশন প্রত্যাহার করিয়া অত-অত মুরুব্বির অনুরোধ-উপরোধ রক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ বিবেচিত হইল। একটা পুরা দিন ঘোরর বাকযুদ্ধ করিয়া তাই অবশেষে আমরা পরাজয় স্বীকার করিলাম। নবাবযাদাকে নমিনেশন প্রত্যাহারের উপদেশ দিলাম। যে হক সাহেবের বিশেষ নির্দেশে আমরা এই সংগ্রামে অবতীর্ণ হইয়াছিলাম, তাঁরই উপস্থিতিতে এবং সম্মতিক্রমে এটা হইল বলিয়া আমাদের বিবেকও পরিষ্কার থাকিয়া গেল।
এইভাবে এ জিলায় প্রজা-সমিতির নির্বাচন-যুদ্ধে নামিবার প্রথম প্রয়াস ব্যর্থ হইল। কিন্তু এতে দুইটা নেট লাভ হইল। এক, নবাবযাদার দৃঢ় চিত্ততা ও আমার উপর তাঁর নির্ভরশীলতা আমাকে মুগ্ধ করিল। অপরদিকে আমার সততা অধ্যবসায় নবাব্যদাকেও আমার প্রতি আরও আকৃষ্ট করিল। দুই, এই গয়নবী-বিরোধিতায় এ জিলার সকল মতের নেতৃবৃন্দের মধ্যে যে সংহতি স্থাপিত হইল পরবর্তী কয়েক বছর এই সংহতি প্রজা আন্দোলনকে এ জিলায় খুব জোরদার করিয়া তুলিল।
০৭. প্রজা আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি
প্রজা আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি
সাতই অধ্যায়
১. সমিতিতে অন্তর্বিরোধ
কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের এই দিনে প্রজা সমিতির প্রেসিডেন্ট সার আবদুর রহিম কলিকাতা হইতে নির্বাচিত হন। ১৯৩৫ সালে জিন্না সাহেবের ইণ্ডিপেন্টে পার্টির সমর্থনে তিনি কংগ্রেসী প্রার্থী মিঃ শেরওয়ানীকে পরাজিত করিয়া আইন পরিষদের প্রেসিডেন্ট (স্পিকার) নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনের পরে তিনি কলিকাতা ফিরিয়া প্রজা সমিতির ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডাকিয়া বলেন যে আইন পরিষদের শিকার হওয়ায় প্রচলিত নিয়ম অনুসারে তিনি আর প্রজা সমিতির প্রেসিডেন্ট থাকিতে পারেন না। তাঁর জায়গায় অন্য লোককে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য তিনি আমাদের নির্দেশ দেন।
