৪. নির্বাচনে প্রথম প্রয়াস
১৯৩৪ সালের কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে প্রজাসমিতির সভাপতি সার আবদুর রহিম কলিকাতা হইতে এবং সমিতির অন্যতম সহ-সভাপতি মৌঃ এ. কে. ফযলুল হক বরিশাল-ফরিদপুর নির্বাচনী এলাকা হইতে প্রার্থী হইলেন। ঢাকা ময়মনসিংহ নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী হইলেন সার আবদুল হালিম গযনব। আমাদের জিলার সর্বসাধারণ এবং বিশেষতঃ প্রজা-কর্মীরা সার গযনবীর রাজনীতি পছন্দ করিতাম না–প্রজার স্বার্থের দিক হইতেও না, দেশের স্বার্থের দিক হইতেও না। কাজেই আমরা তাঁর বিপক্ষে দাঁড় করাইবার যোগ্য লোক তালাশ করিতেছিলাম। এমন সময় আমি হক সাহেবের একটি পত্র পাইলাম। তাতে তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন, আমি যেন জিলার অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করিয়া গযনবীর বিরুদ্ধে একটি শক্ত ক্যানডিডেট দাঁড় করাই। ব্যাপারটার গুরুত্ব সম্পর্কে আমাকে অবহিত করিবার জন্য চিঠির উপসংহারে তিনি লিখিয়াছেন : ‘গযনবীকে কিছুতেই নির্বাচিত হইতে দেওয়া উচিৎ হইবে না। কারণ তিনি আসলে আহসান মনযিলের একটি শিখণ্ডীমাত্র। কখনও ভুলিও না যে আহসান মনযিলের সাথে আমার সংগ্রাম কোনও ব্যক্তিগত সংগ্রাম নয়। এটা আসলে আহসান মনযিলের বিরুদ্ধে মুসলিম-বাংলার লড়াই। আহসান মনযিলের কবল হইতে উদ্ধার না পাওয়া পর্যন্ত মুসলিম বাংলার রক্ষা নাই।‘
হক সাহেবের এই পত্র পাওয়ার পর আমাদের কর্তব্য বাড়িয়া গেল। আমরা আরও জোরে উপযুক্ত প্রার্থীর তালাশ করিতে লাগিলাম। দুই জিলা লইয়া নির্বাচনী এলাকা। যাকে-তাকে ত খাড়া করা যায় না। জিলার সর্বজনমান্য নেতা খান বাহাদুর মৌলবী মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেব প্রায় বছর খানেক ধরিয়া প্রজাসমিতির সমর্থক। কাজেই তাঁকেই ধরিলাম। হক সাহেবের পত্র লইয়া তাঁর সাথে দেখা করিলাম এবং দাঁড়াইতে অনুরোধ করিলাম। দুই জিলার বিশাল এলাকার দোহাই দিয়া তিনি অসম্মতি জানাইলেন। কিন্তু হক সাহেবের পত্ৰ তিনিও পাইয়াছেন বলিয়া এ ব্যাপারে তিনি চেষ্টা করিবেন আশ্বাস দিলেন।
এমনি সময়ে খান বাহাদূর সাহেবের বাড়িতে একদিন নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলীর সাথে আমার দেখা। খান বাহাদুর সাহেব হাসি মুখে বলিলেন : ‘এই নেও তোমার ক্যানডিডেট।‘ তিনি নবাবযাদার সাথে আমার পরিচয় করাইয়া দিলেন। নবাবদার চেহারা তাঁর বিনয়-নম্রতা ও ভদ্রতা দেখিয়া আমি মুগ্ধ হইলাম। জমিদারদেরে সাধারণভাবে আমি ঘৃণা করিতাম। ধনবাড়ির নবাব সাহেবকে ব্যক্তিগতভাবে আমি শ্রদ্ধা করিতাম বটে কিন্তু জমিদার হিসাবে অপর সব জমিদারদের মতই তাঁর প্রতিও আমার বিরুদ্ধ মনোভাব ছিল। জনশ্রুতিমতে ধনবাড়ির জমিদার ছিলেন অত্যাচারী জমিদারদের অন্যতম। নবাবযাদার সহিত আলাপ করিয়া এবং একটু ঘনিষ্ঠ হইয়া বুঝিলাম জমিদারের ঘরেও জমিদারি-প্রথার বিরোধী প্রজাহিতৈষী ভাল-মানুষ হওয়া সম্ভব। প্রজাসমিতির ও কংগ্রেসের সহকর্মীদের সাথে নবাবযাদার পরিচয় করাইয়া দিলাম।
নবাবযাদা হাসান আলীকে আমার খুব ভাল লাগিল। প্রজা-সমিতিতেও তাঁকে গ্রহণ রাইতেই হইবে। সেই উদ্দেশ্যে প্রজা-সমিতির ও কংগ্রেসের বন্ধুদের সাথে। তাঁর পরিচয় করাইতে এবং প্রজা-কর্মীদের কাছে তাঁকে গ্রহণযোগ্য করিয়া চিত্রিত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। চেষ্টা আমার খুব বেশি করিতে হইল না। নবাবযাদা তাঁর স্বাভাবিক অমায়িক মিষ্টব্যবহারের দ্বারা ও জ্ঞান-বুদ্ধির গুণে নিজেই অধিকাংশের হৃদয় জয় ও প্রশংসা অর্জন করিলেন। কিন্তু অপেক্ষাকৃত প্রাচীন কড়া ও নিষ্ঠাবান নেতা-কর্মীদের কাছে আমার কিছু কিছু চেষ্টার দরকার হইল। তার কারণ নবাবদার মরহুম পিতা নবাব বাহাদুরের ঐতিহ্য ও স্মৃতি। কাজেই ঐ সব সহকর্মীর কাছে শুধু নবাবযাদার তারিফ করিলেই চলিত না। তাঁর মরহুম বাবার পক্ষে চূড়ান্ত কথা বলারও দরকার হইত। অত্যাচারী জমিদার হইয়াও ত মানুষ অন্যান্য গুণের অধিকারী হইতে পারেন। আমি নিজেই ব্যক্তিগত গুণের জন্য দু’চারজন জমিদারকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করিতাম এবং প্রজা-সহকর্মী বন্ধুদের সামনে অসংকোচে সে মনোভাব প্রকাশও করিতাম। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, মুক্তাগাছার জমিদার রাজা জগৎ কিশোরকে তাঁর অসামান্য দানশীলতার জন্য, পাবনার জমিদার প্রমথ চৌধুরীকে তাঁর সাহিত্যিক নয়া-নীতির জন্য, সন্তোষের জমিদার প্রমথ নাথ রায় চৌধুরীকে তাঁর উদার অসাম্প্রদায়িক নাট্য-সাহিত্যের জন্য আমি ভক্তি-শ্রদ্ধা ও প্রশংসা করিতাম। বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথের কথা তুলিলাম না। কারণ জমিদারিটা তাঁর আসল পরিচয় নয়।
ধনবাড়ির জমিদার নবাব বাহাদুরকেও তেমনি দুইটি ঘটনায় আমি অনেক নেতা সাহিত্যিকের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা-ভক্তি ও প্রশংসা করিতাম। অনেক সময় তাঁকে লইয়া গর্বও করিতাম। কিন্তু প্রজা-আন্দোলন শুরু করিয়া এই দুইটি ঘটনাই বেমালুম তুলিয়া গিয়াছিলাম। নবাবযাদার সাথে পরিচয় হওয়া এবং তার আনুসংগিক প্রয়োজন দেখা না দেওয়া পর্যন্ত তা ভুলিয়াই ছিলাম। আজ দুইটা ঘটনাই মনে পড়িয়া গেল। বন্ধুরা তাজ্জব হইলেন। আমিও কম হইলাম না।
এই দুইটি ঘটনার প্রথমটি বাংলা ভাষা সম্পর্কে। দ্বিতীয়টি খিলাফত আন্দোলন সম্পর্কে। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষ দিকে মুসলিম-বাংলার সকল নাইট নবাব ও খেতাবধারীরা এবং উচ্চ স্তরের সরকারী কর্মচারীরা, এমনকি মফস্বলের অনেক খান বাহাদুর খান সাহেবরা পর্যন্ত, সরকারী ইংগিতে সমস্বরে রায় দিয়াছিলেন।
