২. সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ
ইতিমধ্যে ১৯৩২ আগস্ট মাসে ম্যাকডোনাল্ড এওয়ার্ড বা সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ বাহির হয়। দলের মুসলিম নেতারা এর অভিনন্দন করেন। পক্ষান্তরে সকল দলের হিন্দু নেতারা ইহার তীব্র নিন্দা করেন। কংগ্রেস তখন বে-আইনী। কাজেই প্রতিষ্ঠান হিসাবে কংগ্রেস কোনও মতামত দিতে না পারিলেও জেলের বাহিরে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই সাম্প্রদায়িক রায়েদাদের নিলায় বিবৃতি দিতে লাগিলেন। মহাত্মা গান্ধীও তখন জেলে। সাম্প্রদায়িক ব্লোয়েদাদে তফসিলী হিন্দুদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হইয়াছিল। মহাত্মা গান্ধী জেলের মধ্য হইতেই ইহার প্রতিবাদে আমরণ অনশন শুরু করেন। মহাত্মা গান্ধীকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁর মধ্যস্থতায় সকল শ্রেণীর হিন্দু নেতারা তফসিলী হিন্দুদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ভিত্তিতে যুক্ত নির্বাচনে আপোস-রফা করেন। বৃটিশ সরকারও তৎক্ষণাৎ এই আপোস-রফা গ্রহণ করিয়া রোয়েদাদ সংশোধন করেন। এই ঘটনা হইতে আমরা ইহা আশা করিলাম যে মহাত্মাজী রোয়েদাদের মুসলিম অংশের তেমন তীব্র বিরোধিতা করিবেন না। এ আশায় আরও জোর বাঁধিল কয়েক দিনের মধ্যেই। পণ্ডিত নেহরুর অন্তরংগ বন্ধু কংগ্রেসের তরুণ নেতাদের ন্যতম মিঃ জয় প্রকাশ নারায়ণ কলিকাতার আলবাট হলের এক সভায় সাম্প্রদায়িক ব্রোয়েদাদ সমর্থন করিলেন এবংকংগ্রেসকে ব্লোয়েদাদ মানিয়া লইবার অনুরোধ করিলেন। ১৯৩৩ সালের মাঝামাঝি কথা উঠিল ১৯৩৪ সালে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের নির্বাচন হইবে। কংগ্রেসীরাও নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করিবেন কানাঘুষা শোনা গেল। কয়েক মাস আগে মহাত্মাজী হরিজন আন্দোলন শুরু করিলে তাঁকে গ্রেফতার করা হইল। তিনি আবার অনশনব্রত গ্রহণ করিলেন। সরকার এবারও মহাত্মাজীকে মুক্তি দিলেন।
৩. রাঁটি কংগ্রেস সম্মিলনী
মুক্তি পাইলেও মহাজী আইন অমান্য আন্দোলন বা কংগ্রেসের কার্যকলাপে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করিলেন না। কারণ কংগ্রেস তখনও বে-আইনী। এ অবস্থায় জেলের বাইরের কংগ্রেস-নেতাদের মধ্যে পরামর্শের সুবিধার জন্য মহাত্মাজীর সমর্থনে ডাঃ আনসারী, মিঃ রাজাগোপালাচারিয়া ও ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে ১৯৩৩ সালের মাঝামাঝি রীচিতে একটি ইনফর্মাল এ. আই. সি. সি.-র সভা হয়, ময়মনসিংহের অন্যান্য কংগ্রেস কর্মীদের সাথে আমিও এই সভায় যোগদান করি। কারণ আমরা জানিতে পারিলাম, এই সভার উদ্যোক্তারা চান যে কংগ্রেসের মুসলিম মেম্বররা যেন দলে দলে এই সভায় যোগদান করেন। আমি এই ইশারার অর্থ বুঝিলাম। কাজেই শত কাজ ফেলিয়া এই সভায় যোগ দিলাম।
রাঁচিতে গিয়া বুঝিলাম প্রধানতঃ ডাঃ আনসারীর উৎসাহেই এই সঙ্গিনী সব হইয়াছে। ডাঃ আনসারী এই সম্মিলনীর সভাপতিত্ব করিবেন ইহা আগেই ঘোষিত হইয়াছিল। তাঁর মত খ্যাতনামা কংগ্রেস-নেতা রাঁচিতে মেহমান হইয়াছেন বিহারের শিক্ষাশ্রী সার সৈয়দ আবদুল আযিযের। মন্ত্রী মহোদয়ের উৎসাই শুধু ডাঃ আনসারীর মেহমানদারিতেই সীমাবদ্ধ থাকিল না। সভায় সমবেত সমস্ত মুসলিম ডেলিগেটদের খাওয়ার ব্যবস্থার আরও তিনিই নিয়াছেন। ফলে আমরা থাকিতাম যদিও কটিয়ার জমিদার জনাব ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চান মিয়া সাহেবের রাঁচি প্রাসাদে, কিন্তু আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হইলমী সাহেবের বাড়িতে। ইহার দুইটা মাত্র ব্যাখা সম্ভব ছিল। প্রথম, মন্ত্রী আবদুল আযিয সাহেব বাহিরে ধামাধরা খেতাবধারী ‘সার’ হইলেও ভিতরে ভিতরে তিনি কংগ্রেসের সমর্থক। দ্বিতীয়, ভারত সরকারের সম্মতিক্রমেই তিনি কংগ্রেস নেতাদের মেহমানদারি করিতেছেন। প্রথম ব্যাখ্যা সম্ভব মনে হইল না। কাজেই আমরা দ্বিতীয় ব্যাখ্যাই করিলাম। কংগ্রেস আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করিয়া আইন সভায়, বিশেষতঃ কেন্দ্রীয় আইন সভায়, আসিলে আইন অমান্য আন্দোলন কমজোর, এমনকি একেবারে পরিত্যক্ত হইবে। কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে ফিরিয়া আসিবে। এই আশাতেই ভারত সরকার রাঁচি সম্মিলনীর সাফল্য চাইতেছেন। আমরা এই ব্যাখ্যাই করিলাম।
বাংলার ডেলিগেট হিন্দু মুসলিম সবাই আমরা চান মিয়া সাহেবের প্রাসাদে এক সংগে থাকিতাম। কাজেই সম্মিলনীর সময়টুকু ছাড়া অন্য সব সময়েই আমরা সাম্প্রদায়িক রোয়দাদের উপর বাহাস করিতাম। এই আলোচনার ফলে আমরা বুঝিলাম যে বাংলার হিন্দু নেতারাই রোয়েদাদের বিরুদ্ধে বেশি খাপ্পা ছিলেন। বোম্বাইর মিঃ কে, এফ. নরিম্যান মাদ্রাজের মিঃ এম, আর, মাসানী, মিঃ সত্যমূর্তি ও অধ্যাপক রংগ। প্রভৃতি সকলের মধ্যেই একটু আপোস মনোভাব দেখিতে পাইলাম। কিন্তু বাংগালী হিন্দুদের প্রায় সকলেই ছিলেন অনড়। আমাদের সাথে তর্ক করিতে করিতে অনেকে উত্তেজিত হইয়া উঠিতেন। একাধিক দিন এতে অপ্রিয় ঘটনাও ঘটিয়া গিয়াছে। অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তীর সাথে একবার ত আমার হাতাহাতির উপক্রম। তিনি বলিয়াছিলেন যে, আমার মত সাম্প্রদায়িক মনোভাবের লোকের কংগ্রেস ছাড়িয়া মুসলিম লীগে যাওয়া উচিৎ। জবাবে আমি বলিয়াছিলাম, তাঁর মত সাম্প্রদায়িক হিন্দুর কংগ্রেস ছাড়িয়া হিন্দু সভায় যোগ দেওয়া উচিৎ।
কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে সম্মিলনী আরম্ভ হইলে ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের দৃঢ়তায় বাংলার হিন্দু প্রতিনিধিরা বেশ নরম হইয়া গেলেন। মহাত্মাজী সশরীরে সম্মিলনে যোগ দিলেন না বটে, তবে সকল কাজ ও প্রস্তাবাদি রচনা তাঁর সাথে পরামর্শ করিয়াই করা হইল। রাজাজী সভায় উপস্থিত থাকিয়া এবং প্রধান অংশ গ্রহণ করিয়া মহাত্মাজীর প্রতিনিধিত্ব করিলেন। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই সম্মিলনীর কাজ শেষ হইল। আমাদের দিক হইতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব যা গৃহীত হইল, তা সাম্প্রদায়িক রায়েদাদ সম্পর্কে। দুইদিন তুমুল বাদ-বিতণ্ডার পরে কংগ্রেসের বিখ্যাত ‘না গ্রহণ না বর্জন’ প্রস্তাবটি এই সম্মিলনীতে গৃহীত হইল। এই সভার কাৰ্য্য পরিচালনায় ডাঃ আনসারীর তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার বুদ্ধি দেখিয়া আমি মুগ্ধ ও বিস্মিত হইলাম। কংগ্রেস এই মধ্যপন্থী প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া দেশকে একটা আসন্ন বিপর্যয় হইতে রক্ষা করিল, এই সান্ত্বনা লইয়া আমি বাড়ি ফিরিলাম।
