সুখের বিষয় বছর না ঘুরিতেই এই চুক্তি বাতিল করা হইয়াছে। কিন্তু এই চুক্তি যে বিপুল আয়তনের চোরাচালান বিপুল শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে সংঘবদ্ধ হইবার সুযোগ করিয়া দিয়াছে তার কজা হইতে বাংলাদেশ আজও মুক্ত হইতে পারে নাই। আরও সুখের বিষয় এই যে এই বাণিজ্য চুক্তি বিশেষতঃ এর বর্ডার ট্রেডের অংশ, যে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী ভারত সরকারও তা মানিয়া লইয়াছেন। বর্তমান ভারত সরকার এবং কংগ্রেস নেতৃত্ব যে সত্য-সত্যই বাংলাদেশের হিতৈষী, আমাদের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা ও সার্বিক স্বকীয়তা স্বনির্ভরতা যে তাঁদের কাম্য, এ সম্বন্ধে সন্দেহ করার কোনও কারণ নাই। বিশাল ভারতে অসংখ্য দল ও মতের মধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য ও কৃষ্টিক স্বকীয়তা-বিরোধী কিছু লোক থাকা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তাঁদের কথাবার্তা ও কার্যকলাপে ভারত সরকারেরও কংগ্রেস পার্টির আন্তরিকতায় সন্দেহ করিবার কোনও কারণ নাই। এ বিষয়ে পরে আরও আলোচনা করিব।
৩২.০৮ সংবিধান রচনা
সংবিধান রচনা
উপাধ্যায় আট
১. আওয়ামী নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক চেতনা
শেখ মুজিব-নেতৃত্বের আওয়ামী লীগ পার্টির সর্বাপেক্ষা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ তড়িৎ গতিতে দেশের শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা। তড়িৎ গতিতে মানে বিনা বিচারে সাত তাড়াতাড়িতে নয়। এ তড়িৎ গতির অর্থ স্বাধীনতা হাসিলের অল্প কালের মধ্যে দেশের শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা। এটা বিশেষভাবে প্রশংসনীয় এই জন্য যে এই অঞ্চলের বিশেষতঃ আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক ঐতিহ্য এটা নয়। এখানকার ঐতিহ্য এই যে বিনা-সংবিধানে যতদিনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আকড়াইয়া থাকা যায়। পাকিস্তান আমাদের রাজনৈতিক পূর্বগামীরা শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনায় পাক্কা নয় বছর লাগাইয়া ছিলেন। অধিকতর গণতন্ত্র চেতন আমাদের প্রতিবেশী ভারতও তিন বছরের আগে সংবিধান রচনা সমাপ্তকরিতে পারেন নাই।
সেস্থলে আওয়ামী-নেতৃত্ব স্বাধীনতা লাভের সাড়ে তিন মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের ১১ই এপ্রিল গণপরিষদের বৈঠক ডাকেন। তাতে সংবিধান রচনা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির মুসাবিদা আলোচনার জন্য সেপ্টেম্বর মাসে গণ-পরিষদের বৈঠক দেওয়া হয়। গণ-পরিষদের দ্বারা সংবিধান গৃহীত হয়। মোট কথা স্বাধীনতা হাসিলের এক বছরের মধ্যে সংবিধান রচনা, গ্রহণ ও প্রবর্তন হয়। ১৬ই ডিসেম্বরে সংবিধান চালু হয়। অত তাড়াতাড়ি করিবার কোন তাকিদ ছিল না। সমসাময়িক নযিরও ছিল না। শেখ মুজিবের দেশে ফিরিবার পরদিনই ১১ই জানুয়ারি তারিখে একটি অস্থায়ী সংবিধান রচনা করিয়া বাংলাদেশের সরকারকে পার্লামেন্টারি সরকারে রূপান্তরিত করা হইয়াছিল। ১৪ই জানুয়ারী শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট পদ হইতে নামিয়া আসিয়া প্রধান মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। এ অবস্থায় শেখ মুজিব যদি শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনায় দুই-চার বছর বিলম্বেও করিতেন, তবু তাঁকে কেউ দোষ দিতে পারিতেন না। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে ছিন্নমূল দেশবাসীকে পুনর্বাসন, ঝড় বন্যা-দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশবাসীকে খাওয়ান-পরান ফেলিয়া সংবিধান রচনা করিলে তাঁকে কেউ কর্তব্য-ছতির এলমও দিতে পারিতেন না।
তবু শেখ মুজিবের নেতৃতে খুব সম্ভবতঃ তাঁর তাকিদে, আওয়ামী লীগ পার্টি শুধু সংবিধানই দিলেন না, তার বুনিয়াদে ১৯৭৩ সালের মার্চের মধ্যে একটা সাধারণ নির্বাচনও দিয়া ফেলিলেন। এত তাড়াতাড়ি নির্বাচন দিবারও কোন তাকিদ ছিল না। ১৯৭০-৭১ সালের নির্বাচনের বলে আওয়ামী লীগ বিনা-তর্কে ১৯৭৪-৭৫ সালতক মেম্বর থাকিতে পারিতেন। একই দিনের নির্বাচনে পশ্চিম-পাকিস্তানের (বর্তমান পাকিস্তান) মেম্বররা আজও মেম্বর আছেন।
আওয়ামী লীগ-নেতৃত্ব সংবিধান প্রবর্তনের পরে নির্বাচন দেওয়া তাঁদের গণতান্ত্রিক কর্তব্য মনে করিলেন। গণ-পরিষদের আওয়ামী লীগই ছিলেন একমাত্র পার্টি। অপযিশন বলিতে একজন মেম্বরও ছিলেন না। এমন এক দলীয় গণ-পরিষদ সংবিধান রচনার পর ঐ সংবিধানেই ‘অস্থায়ী বিধান হিসাবে লিপিবদ্ধ করিতে পারিতেনঃ ‘এই গণপরিষদই পার্লামেন্টে রূপান্তরিত ই’ তারপর সেই পার্লামেন্টের আয়ু কতদিন হইবে, কতদিন পরে পার্লামেন্টের নয়া নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে, এ সব ব্যাপারেই তাঁদের সুবিধা-মত বিধান করিয়া লইতে পারিতেন। আওয়ামী লীগ এসব কিছুই করেন নাই। বরঞ্চ অবিলম্বে নির্বাচন দিয়া পার্লামেন্টারি গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় আদর্শ নযির স্থাপন করিলেন। এই নির্বাচনের কথা পরে বলিতেছি। আগেশাসনতান্ত্রিক সংবিধানের কথাটাই আলোচনা করিয়া লই।
২. সংবিধানের ভাষিক ক্রটি
আওয়ামী লীগ-নেতৃত্ব কালহরণ না করিয়া শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনায় হাত দেওয়ায় আমি যেমন খুশী হইয়াছিলাম, সংবিধানের মুসাবিদা দেখিয়া তেমন খুশী হইতে পারিলাম না। আমার মনের ভাব আনন্দ বিষাদ মিশ্রিত হইল। একদিকে ভোটারের বয়স-সীমা ১৮ বছরে নামানোতে যেমন আনন্দিত ও গর্বিত হইলাম, মৌলিক অধিকার, শ্রমিকদের ধর্মঘটের অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা স্বীকৃতিতে কৃপণতা দেখিয়া তেমনি বিষণ্ণ ও লজ্জিত হইলাম। বাংলা মুসাবিদার পান্ডিত্য ও সাংস্কৃত্য দেখিয়া ঘাবড়াইলাম। খুব চিন্তিত হইলাম। প্রভাবশালী কয়েকজনের কাছে আমার মনের কথা বলিলামও। তাদের কেউ বোধ হয় শেখ মুজিবের কাছে কথাটা তুলিয়াছিলেন। কিছুদিন পরে কয়েকজন আসিয়া এক কপি মুসাবিদা সংবিধান দিয়া বলিয়া গেলেন, প্রধানমন্ত্রী বলিয়া দিয়াছেন : আপনি যা যা সংশোধনী দিবেন, সবই তিনি মানিয়া লইবেন। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের সময় আমার খাটুনির যে দশা হইয়াছিল, এবারও তাই হইল। আমি তাই সংবাদপত্রে নিজের কথা বলিয়া সংবিধান রচয়িতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার চেষ্টা করিলাম। বিশেষ করিয়া দৈনিক ইত্তেফাকে ধারাবাহিক অনেকগুলি প্রবন্ধ লিখিলাম। আমার এই বই যতজন পাঠক পড়িবেন, তার চেয়ে বহু গুণ বেশী পাঠক ইত্তেফাকে আমার ঐসব লেখা পড়িয়াছেন। কাজেই সে সব কথা বিস্তারিতভাবে এখানে আলোচনা করিলাম না। শুধু মূল ক্রুটিগুলির দিকেই পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিলাম।
