আমাদের সংবিধানের মূল ত্রুটি দুইটি এক, বিধানের ত্রুটি; দুই, ভাষার ক্রটি। ভাষার ক্রটির আলোচনাটা সহজ ও স্বল্প কাজেই সেই কথাটাই আগে আলোচনা করিতেছি। মাতৃভাষায় আধুনিক দেশের আধুনিক সংবিধান রচনার ইচ্ছা প্রশংসনীয় এবংউদ্যমসমর্থনযোগ্য। বাংলাদেশেরসংবিধান-রচয়িতারা এই কারণে আমার শ্রদ্ধার পাত্র। শাসনতান্ত্রিক সংবিধান একটা আইন। দেশের শ্রেষ্ঠ আইন। গণ-পরিষদের মেম্বরদের বিপুল মেজরিটি আইনবিদ ও আইন-ব্যবসায়ী। তাঁদের জন্য সংবিধান রচনা খুব কঠিন ছিল না। ইংরাজ আমলের দুইশ’ বছর ও পাকিস্তান আমলের পঁচিশ বছর ধরিয়া আদালতের সর্বোচ্চ স্তর বাদে আর সর্বত্র মোটামুটি বাংলাভাষা চালু থাকায় আমাদের দেশে একটা আইনের ভাষা ও সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছিল। কাজেই একটা সহজবোধ্য পরিভাষাও গড়িয়া উঠিয়াছিল। শুধু গণ-পরিষদের মেম্বররা তাঁদের আইন-আদালতের অভিজ্ঞতা লইয়া শাসনতান্ত্রিক আইন রচনা শেষ করিলে কোনও অসুবিধা বা জটিলতা সৃষ্টি হইত না। তাঁরা প্রচলিত সহজ ও পরিচিত শব্দই ব্যবহার করিতেন। কিন্তু তাঁরা দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ আইনের দলিলটিকে সাহিত্যে উন্নত করিবার ইচ্ছা করিলেন। ভাষা বিজ্ঞানীর সাহিতিকদের আশ্রয় লইলেন। ভাষার পন্ডিতেরা অভিধান ঘাটিয়া সংস্কৃত শব্দের দ্বারা ইংরাজি শব্দের বাংলা তর্জমা করিলেন।
এইখানে সংবিধান-রচয়িতারা শিশুসুলভ সাদা-মাটা একটা চালাকি করিলেন। তাঁরা বলিলেন, মুসাবিদাটি তাঁরা প্রথমে বাংলাভাষায় রচনা করিয়া উহার ইংরাজি তর্জমা করিয়াছেন। কথাটা বলার কোনও দরকার ছিল না। আমাদের দেশের। কনস্টিটিউশনের মুসাবিদা আগেই ইংরাজিতে রচিত হইয়া পরে বাংলায় তার তর্জমা হইয়াছিল, না আগে বাংলা হইয়া পরে ইংরাজিতে অনূদিত হইয়াছিল, এটা বলার বা জানার কোনও দরকার ছিল না। বলাটাও খুব সহজ, নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। কারণ দুনিয়ার বহু দেশেই ইংরাজিতে সংবিধান রচিত হইয়াছে। আমাদের গণ পরিষদের মেম্বারদের অনেকেই তার অনেকগুলি পড়িয়াছেন। পক্ষান্তরে ইতিপূর্বে আর কোনও দেশেই বাংলায় সংবিধান রচনার নযির নাই। অতএব আমাদের রচয়িতারা যদি বলিতেন, তাঁরা দুনিয়ার সব ভাল ভাল সংবিধানগুলি গভীর মনোযোগে পড়িয়া এবং ভাবনা করিয়া প্রথমেই ইংরাজিতে একটা মুসাবিদা খাড়া করিয়াছেন এবং তারপর সেই অনুমোদিত মুসাবিদার বাংলা তর্জমা করিয়া তাই বাংলা ভাষা-বিশারদগণকে দেখাইয়াছন, তবে তাতে আমাদের রচয়িতাদের কোনও অসম্মান হইত না। বাংলা ভাষায় রচিত খসড়া সংবিধানেরই ‘ইংরাজি অনুবাদ’ হওয়ার ফলেই সংবিধানের নং অনুচ্ছেদের শেষে লিখিতে হইয়াছে। বাংলা ও ইঞ্জাজি পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাইবে। এই একটিমাত্র কথা দ্বারা ভবিষ্যতের জন্য কত যে বিরোধের বীজ বপন করা হইয়াছে, তার হিসাব করা কঠিন। সংবিধানের যে কোনও অনুচ্ছেদের বাংলা ও ইংরাজি পাঠ মিলাইয়া পড়িলেই বোঝা যাইবে যে সুস্পষ্ট সুন্দর ও প্রাঞ্জল ইংরাজি পাঠটির অস্পষ্ট, দুর্বল ও দ্ব্যর্থবোধক অক্ষম, অনুবাদ করা হইয়াছে। সাধারণ আইন-আদালতে বা সাংবিধানিক আদালতে কোনও বিধানের ব্যাখ্যার উপর বিতর্ক বাধিলে সংবিধানের প্রকৃত মর্মার্থ ও আইন-রচয়িতার উদ্দেশ্য হৃদয়ংগম করিতে হইলে ইংরাজি-পাঠটির প্রাধান্য না দিয়া উপায় নাই। অথচ আমাদের সংবিধানে এই কাজটিই নিষিদ্ধ করা হইয়াছে।
এই ধরনের অনেক জটিলতা সৃষ্টি ছাড়াও অনেক সহজ কাজকে কঠিন করা হইয়াছে। আমরা স্মরণাতীত কাল হইতে সরকারের তিনটি মূল বিভাগঃ এক্সিকিউটিভ, লেজিসলেটিভ ও জুডিশিয়ারিকে যথাক্রমে শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ অভিহিত করিয়া আসিতেছি। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল শ্রেণীর জনগণের কাছেই এই নামে এরা সুপরিচিত। কিন্তু আমাদের সংবিধান-রচয়িতারা বোধ হয় ভাষা-বিজ্ঞানীদের পরামর্শে মৌলিকতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে শাসন বিভাগ না বলিয়া নির্বাহী বিভাগ বলিয়াছেন। অনুবাদের দ্বারা পরিভাষা সৃষ্টির চুলকানি হইতেই এটা করা হইয়াছে।
আমাদের পার্লামেন্টকে ঐনামে না ডাকিয়া জাতীয় সংসদ সংক্ষেপে সংসদ বলা হইয়াছে। জাতীয় সংসদের ইংরাজি ন্যাশনাল এসেম্লি। অথচ আমাদের সংবিধানের ইংরাজি পাঠে একে পার্লামেন্ট বলা হইয়াছে। পার্লামেন্টের সরেনটি ইংলণ্ডের পার্লামেন্টের সভারেনটির অসীম ব্যাপার দ্বারা সুনির্দিষ্ট। আর ন্যাশনাল এসেল্লি বা সংসদের নিজস্ব কোনও সরেনটি নাই; সংবিধান দ্বারা বর্ণিত ক্ষমতাতেই তা সীমাবদ্ধ। এখন ধরুন যদি বাংলাদেশের আদালতে সংসদের সভারেনটি লইয়া তর্ক উঠে, তবে একে কেউ পার্লামেন্টের অসীম সভারেনটির অধিকারী বলিয়া দাবি করিতে পারিবেন না। খোদসংসদ শব্দটারই কোন তাৎপর্যগত অৰ্থনাই।
ঠিক সেইরূপ পরিচিত ইংরাজিশব্দের পরিভাষা রূপে ‘অভিসংশন’, ‘অধিগ্রহণ’ ‘অধ্যাদেশ’ ‘প্রবিধান’ ‘ন্যায়পাল’ ইত্যাদি যেসব অপরিচিত নিরাকার শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে, সেগুলির বোধগম্য অৰ্থ হইতে পারে তাদের নিজ-নিজ ইংরাজি প্রতিশব্দের দ্বারা। হাইকোর্ট ও সুপ্রমিকোর্টের বেলাও উচ্চ-আদালত ও সর্বোচ্চ আদালত বলিয়াই রেহাই পাওয়া যাইবে না। ইংরাজি শব্দের ব্যবহারেই তাদের এলাকা সুস্পষ্ট হইবে। সংবিধানে এটাও নিষিদ্ধ করা হইয়াছে।
