আমি এ ঘোষণায় আহ্লাদিত হইলাম এবং শেখ মুজিবের কূটনৈতিক সাফল্যে গর্বিত হইলাম।
কার্যতঃ বাংলাদেশ হইতে সৈন্য অপসারণের কাজটা নির্ধারিত তারিখের অনেক আগেই সমাপ্ত হইল। ১২ই মার্চ তারিখে ভারতীয় সৈন্য ঢাকা ত্যাগ করিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান একটি প্রাণস্পর্শী সংক্ষিপ্ত ভাষণে তাদের বিদায় সম্ভাষণ জানাইলেন।
পাঁচ দিন পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ঢাকায় আসিলেন। ঢাকাবাসী তাঁকে সাড়ম্বরে প্রাণঢালা বিপুল সম্বর্ধনা জানাইল। সুহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই উদ্দেশ্যে নির্মিত সুউচ্চ মঞ্চেও উভয় প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা করিলেন। মিসেস গান্ধী তিনদিন ঢাকায় অবস্থান করিয়া বিভিন্ন সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। অবশেষে ১৯শে মার্চ তিনি ঢাকা ত্যাগ করিলেন। ঐ তারিখে উভয় প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা সম্পর্কে একটি যুক্ত ইশতাহার বাহির হইল।
৬. ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী-বাণিজ্য চুক্তি
মিসেস গান্ধীর তিনদিন স্থায়ী বাংলাদেশ সফরের ফলে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে দুইটি মূল্যবান সুদূরপ্রসারী চুক্তি স্বাক্ষরিত হইল। একটি ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি, অপরটি ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি। প্রথমটি স্বাক্ষরিত হয় যুক্ত ইশতেহার প্রকাশের তারিখেই ১৯শে মার্চ। দ্বিতীয়টি স্বাক্ষরিত হয় দশ দিন পরে ২৮শে মার্চ।
এই দুইটি চুক্তি লইয়াই বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিশেষতঃ রাজনৈতিক মহলে ভূল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল এবং ফলে প্রকাশ্যে তুমুল প্রতিবাদের ঝড় উঠিয়াছিল। মৈত্রী চুক্তির ফলে বাংলাদেশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হইয়াছে বলিয়া বিরোধী দলসমূহের নেতারা এই চুক্তির নিন্দা করিতে লাগিলেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কদের কৃতজ্ঞতা-বোধ ও দুর্বলতা ও অসহায় অবস্থার সুযোগ লাইয়া শক্তিমান ভারত এই অসম চুক্তি আদায় করিয়াছেন বলিয়া ভারত-বিরোধী একটা মনোব আপনি মাথা চাড়া দিয়া উঠিল।
ঐ অবস্থায় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় পরিবেশটা আরও তিক্ত হইয়া উঠিল। মৈত্রী চুক্তিকে যেমন ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্যের দলিল বলা হইতেছিল, বাণিজ্যচুক্তিকে তেমনি ভারতের অর্থনৈতিক আধিপত্যের দলিল বলা হইতে লাগিল।
কিন্তু আমার বিবেচনায় বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি করার অনেক কিছু থাকিলেও মৈত্রী চুক্তিতে আপত্তির বিশেষ কিছু নাই। ভারতের সহিত মৈত্রী ও সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একটা অমূল্য সম্পদ। পাকিস্তান আমলেও আমি বলিতাম ও বিশ্বাস করিতাম, পাক-ভারত মৈত্রী ও সহযোগিতা উভয় দেশের জন্য কল্যাণকর ও অপরিহার্য। বাংলাদেশের বেলা এটা আরও সত্য। ভারতের সহিত বন্ধুত্ব না রাখিয়া বাংলাদেশ কখনও নিরাপদ হইতে পারে না। এই দিক হইতে বিচার করিলে আলোচ্য মৈত্রী চুক্তিকে বাংলাদেশের স্বার্থেই অভিনন্দিত করিতে হয়। এই চুক্তির হায়াত ২৫ বছর হওয়াটাও সে কারণেই সমর্থনযোগ্য। এই চুক্তির সমালোচকরা ৯ ও ১০ দফা বিরোধিতা করেন যে কারণে আমার বিবেচনায় সে কারণটাও যুক্তিপূর্ণ নয়। চুক্তির দুই পক্ষের কেউই অপর পক্ষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতের কোন সাহায্য করিতে পারিবেন না, একপক্ষ তৃতীয়-পক্ষের দ্বারা আক্রান্ত হইলে অপর পক্ষ তার সাহায্যে আসিবেন, অথবা একপক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে তৃতীয় কোন পক্ষের সহিত চুক্তিবদ্ধ হইতে পারিবেন না, এর একটাও আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে নাই।
আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের বিচার এভাবে করা হয় না। চুক্তি মাত্রেই পক্ষগণের স্বাধীনতা খানিকটা ক্ষুণ্ণ হয়। আলোচ্য চুক্তিতে তার বেশী কিছু হয়। নাই। চুক্তির যে শর্তে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হইয়াছে, তাতে ভারতের সার্বভৌমত্বও সমভাবে ক্ষুণ্ণ হইয়াছে। তা না হইলে কোন চুক্তিই হইতে পারে না। কাজেই আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় মৈত্রী চুক্তির বিরুদ্ধে কিছুই বলিবার নাই।
কিন্তু বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে একথা বলা চলে না। এই চুক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবাদিক মহল যেভাবে প্রতিবাদমুখর হইয়া উঠিয়াছে, গোটা দেশবাসী যেভাবে চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে, তা মোটেই অযৌক্তিক নয়। বাংলাদেশের স্বার্থ এই চুক্তিতে সত্যই ঘোরতর ভাবে উপেক্ষিত হইয়াছে। বিশেষতঃ এই চুক্তির সীমান্ত বাণিজ্যের বিধানটা যেন বাংলাদেশের পক্ষ হইতে চোখ বুজিয়া সই করা হইয়াছে। বহু ত্রুটির মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ক্রটি দশ মাইল এলাকাকে সীমান্ত আখ্যা দেওয়া। বাংলাদেশের মত দীঘে-পাশে ক্ষুদ্রায়তন দেশের মোট আয়তনের এক চতুর্থাংশের বেশী এলাকাকে সীমান্ত বলার অর্থ কার্যত গোটা দেশটাকেই সীমান্ত বলিয়া স্বীকার করা। বাংলাদেশ ও ভারতের মোট চৌদ্দশ মাইল ব্যাপী সীমান্ত রেখার দশ মাইল এলাকাকে বর্ডার ট্রেডের জন্য মুক্ত করিয়া দেওয়ার পরিণাম কি, যে-কোন কান্ডজ্ঞানী লোকের চোখে তা ধরা পড়া উচিৎ ছিল। এর ফলে ভারত-বাংলাদেশের গোটা বর্ডার এলাকাই চোরাচালানের মুক্ত এলাকা হইয়া পড়ে। এটা বুঝিতে বাংলাদেশ সরকারেরও বেশি সময় লাগে নাই।
অথচ বাংলাদেশের (তৎকালে পূর্ব-পাকিস্তান) যে জিরাটিয়াদের স্বার্থ রক্ষাই গোড়ায় বর্ডার-ট্রেডের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, যে জিরাটিয়াদের বিশেষ সুবিধাই ছিল ১৯৫৭ সালে সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার সম্পাদিত পাক-ভারত বাণিজ্য-চুক্তির প্রধান শর্ত, ভারত বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির বর্ডার-টেড হইতে সেই জিরাতিয়াদেরেই বাদ দেওয়া হইয়াছে।
