এটাই ঘটিয়াছে বাংলাদেশের প্রশাসন-যন্ত্র। ১নং অর্ডার এই কাজটি করিয়াছে। এত কালের স্থায়ী প্রশাসনিক নির্বাহীদের চাকুরির স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নতি এক চোটে নির্বাচিত নির্বাহীদের মর্যির উপর নির্ভরশীল করা হইয়াছে। এতে প্রশাসনিক নির্বাহীদের যোগ্যতা ও কর্মতৎপরতা নৈতিক সততা ও প্রশাসনিক দক্ষতা হইতে এক লাফে বাণিজ্যিক লাভ-লোকসানের দাড়ি পাল্লায় চড়িয়া বসিয়াছে। বুদ্ধি-বিবেকমতে দায়িত্ব পালনের চেয়ে এখন হইতে কর্তাভজাই উন্নতির একমাত্র সোপান হইয়া গিয়াছে।
বাংলাদেশের সরকারী কর্মচারীদের বরাতে এমনটা ঘটার কোনও কারণ ছিল না-না এফিশিয়েনসির দিক হইতে, না দেশের প্রতি কর্তব্যবোধের দিক হইতে। স্বাধীনতার আগে এঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতায় কেউ সন্দেহ করেন নাই। এতদিন পাকিস্তান সরকারের চাকুরি করিয়াছেন বলিয়া স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারী কর্তব্য করিতে পারিবে না, এটা মনে করিবারও কোনও কারণ ছিল না। সরকারী কর্মচারীর প্রচলিত দায়িত্ব-বোধ ও মাথার উপর সামরিক শাসনের খড়গ লইয়াও যাঁরা ২রা মার্চ হইতে ২৫শা মার্চ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নির্দেশিত অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়া চাকুরি ও জান খোয়াইবার ঝুঁকি লইয়াছিলেন, তাঁদের বিপদ মুক্তি-যোদ্ধাদের বিপদের চেয়ে কম সাংঘাতিক ছিল না। যাঁদের নেতা চীফ সেক্রেটারী মিঃ শফিউল আযম এসোসিয়েশনের সভা করিয়া আওয়ামী লীগের দাবির সমর্থন করিয়াছিলেন, যে জুডিশিয়ারির নেতা চীফ জাস্টিস বদরুদ্দীন সিদ্দিকী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নব নিয়োজিত গভর্নর টিক্কা খানকে হলফ পড়াইতে অস্বীকার করিয়া চাকুরি ও জীবন উভয়টার বিপদের ঝুঁকি লইয়াছিলেন, সেই প্রশাসন-যন্ত্র ও বিচার বিভাগ বাংলাদেশ সরকারের হাতে এমন ব্যবহার পাইবেন, এটা কেই ভাবিতে পারেন নাই। তার ফলও রাষ্ট্রের জন্য ভাল হয় নাই। আমরা আজ তার সাজা ভোগ করিতেছি।
জনগণের আস্থা, প্রশাসনিক সততা ও আদালতের স্বাধীনতাই সকল রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি, এটা শুধু রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কথা নয়, আওয়ামী লীগেরও দীর্ঘকাল-পোষিত মুলনীতি। যতই সাময়িক বিচ্যুতি ঘটুক শেষ পর্যন্ত তার নীতির প্যাডিউলাম ঠিক জায়গায় আসিয়া স্থির হইবেই।
৫. প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর
আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব ৭ই ফেব্রুয়ারি কলিকাতা সফরে গেলেন। গড়ের মাঠে বিশাল জনসভায়, কলিকাতা কর্পোরেশনের নাগরিক সম্বর্ধনার জবাবে এবং কলিকাতা প্রেসক্লাবের সভায় ভারতের জনগণ, ভারত সরকার ও ভারতীয় সংবাদ পত্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাইয়া তাঁর স্বাভাবিক ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা করিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য মিসেস ইন্দিরা গান্ধী কলিকাতা আসিয়াছিলেন। তিনিও আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসায় গড়ের মাঠের জনসভায় বক্তৃতা করেন। গবর্নমেন্ট হাউসে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে তিনি এক নৈশভোজের আয়োজন করেন। ভোজ-শেষের বক্তৃতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সরকারের জন্য এগার শ মোটরগাড়ি, বাস, ট্রাক ইত্যাদি উপহার দেন।
৮ই ফেব্রুয়ারির রাতের খবরে টেলিভিশনে যখন এই খবর প্রচারিত ও প্রদর্শিত হয়, তখন আমি আমার পরিবারের এবং সমবেত বন্ধু-বান্ধবের কাছে ভারত-সরকারের বন্ধুত্ব ও উদারতার তারিফ করিবার সুযোগ পাইলাম ও করিলাম। সমবেত বন্ধু বান্ধবের মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারও উপস্থিত ছিলেন। আমার ইন্দিরা প্রশংসায় বাধা দিয়া বলিলেন : মাত্র ওয়ানফিফথ ফেরত পাইলাম, সার।
কৌতূহলে সবাই তাঁর পানে তাকাইলেন। আমিই প্রশ্ন করিলাম : এ কথার মানে?
তিনি জবাবে বিস্তারিত যা বলিলেন, তার সারমর্ম এই যে, ২৫শে মার্চের পর আমাদের দেওয়ানী, পুলিশ ও জংগী অফিসাররা এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষীয় লোকেরা বিভিন্ন জেলা-মহকুমা ট্রেজারি ও ব্যাংক হইতে হাজার হাজার কোটি টাকা ছাড়াও সাড়ে পাঁচ হাজার বিভিন্ন শ্রেণীর অটোমোবাইল নিয়া ভারতে আশ্রয় নিয়াছিলেন। আজ শ্রীমতি ইন্দিরা তার মাত্র এক-পঞ্চশাংশ ফেরত দিলেন।
সমবেত সবাই তাঁর কথা কৌতূহলের সাথে শুনিলেন। আমি ভদ্রলোকের অকৃতজ্ঞতা, নীচতা ও এমন ব্যাপারে বিচারের মাপকাঠির ক্ষুদ্রতায় চটিতে ছিলাম। তাঁর কথা শেষ হওয়া মাত্র আমি বিদ্রুপের ভাষার বলিলাম : আপনারা ঐসব মোটরগাড়ি ভারত-সরকারের কাছে জমা রাখিয়াছিলেন বুঝি?
ভদ্রলোক চুপ করিয়া রহিলেন। আমি আবার বলিলাম ঐ এগারশত গাড়িও যদি তাঁরা না দিতেন, তবে কি করিতেন আপনারা? একটু থামিয়া আবার বলিলাম : ঐ অবস্থায় ওসব আপনাদের হাতে পড়িলে একটাও ফেরত দিতেন না।
আমাদের মুক্তি-সংগ্রামে সহায়তা করিবার ভারতের এক শ একটা কারণ ছিল, আমি তা বুঝিতাম। তার মধ্যে ভারতের নিজস্ব স্বার্থও ছিল, তাও আমি জানিতাম। কিন্তু তাই বলিয়া ভারতের সাহায্যের মহৎ দিকটা এত তাড়াতাড়ি আমরা ভুলিয়া যাইব, এটা আমি কিছুতেই মার্জনা করিতে পারি নাই।
পরদিন উভয় প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা সম্পর্কে একটি সুন্দর যুক্ত-বিবৃতি প্রকাশিত হইল। তাতে উভয় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার কথা ছাড়াও বলা হইল যে, আগামী ২৫শে মার্চের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য অপসারণের কাজ সমাপ্ত হইবে।
