তবু এটাই এ আইনের চরম মারাত্মক রূপ নয়। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তোগান্তি ছাড়াও এ আইনের একটা জাতীয় মারাত্মক দিক আছে। এই আইন গোটা জাতিকে ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘দেশদ্রোহী’ এই দুই ভাগে বিভক্ত করিয়াছে। অথচ দেশবাসীর চরিত্র তা নয়। ১০ই জানুয়ারি শেখ মুজিব যখন দেশে ফিরেন, তখন তিনি কোনও দলের নেতা ছিলেন না। নেতা ছিলেন তিনি গোটা জাতির। তাঁর নেতৃত্বে অনুপ্রাণিত হইয়া মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের যে স্বাধীনতা আনিয়াছিলেন সেটা কোন দল বা শ্রেণীর স্বাধীনতা ছিল না। সে স্বাধীনতা ছিল দেশবাসীর সকলের ও প্রত্যেকের। এমন কি, যাঁরা স্বাধীনতার বিরোধিতা করিয়াছিলেন তাঁদেরও। সব দেশের স্বাধীনতা লাভের ফল ভাই। ভারতের স্বাধীনতা অনিয়াছিলেন কংগ্রেস অনেকেই তার বিরোধিতা করিয়াছিলেন। পাকিস্তানের স্বাধীনতা আনিয়াছিলেন মুসলিম লীগ। অনেকেই তার বিরোধিতা করিয়াছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর সবাই সে স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করিতেছেন। স্বাধীনতার বিরোধিতা করার অপরাধে কাউকে শাস্তি ভোগ করিতে হয় নাই। কোনও দেশেই তা হয় না। কারণ স্বাধীনতার আগে ওটা থাকে রাজনৈতিক মতভেদ। শুধু স্বাধীনতা লাভের পরেই হয় ওটা দেশপ্রেম ও দেশদ্রোহিতার প্রশ্ন। সব স্বাধীনতা সংগ্রামের বেলাই এটা সত্য। বাংলাদেশের ব্যাপারে এটা আরও বেশি সত্য। বাংলাদেশের সংগ্রাম শুরু হয় নিয়মতান্ত্রিক পন্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে। সে নির্বাচনে স্বাধীনতা নির্বাচনী ইশ্যু ছিল না। আওয়ামী লীগও অন্যান্য পার্টির মতই পাকিস্তান-ভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচীর ভিত্তিতে নির্বাচন লড়িয়াছিল। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক বিজয়ী হয়। পাকিস্তানের সামরিক সরকার সে নির্বাচন না মানিয়া তলওয়ারের জোরে পূর্ব-পাকিস্তানীদেরে শিখাইতে চায়। তখনই সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়। এ সংগ্রামের জন্য আওয়ামী লীগ প্রস্তুত ছিল না। অন্য সব দল ত নয়-ই। এই সশস্ত্র সংগ্রাম অন্যান্য দেশের মত দীর্ঘস্থায়ী হয় নাই। ন মাসেরও কম সময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। এটা সম্ভব হইয়াছিল শুধুমাত্র ভারতের সামরিক সহায়তায়। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম যদি দীর্ঘস্থায়ী হইত, তবে সংগ্রাম চলিতে থাকা অবস্থায় দলীয় স্তরেও আমাদের ঐক্য সাধিত হইয়া যাইত। মাত্র ন মাসের যুদ্ধেই আমাদের দেশবাসী জনগণের স্তরে ঐক্যবদ্ধ হইয়া গিয়াছিল, আমি ‘জন-যুদ্ধ’ অনুচ্ছেদে তা আগেই বলিয়াছি। জনগণের সে ঐক্য নেতৃস্তরেও প্রসারিত হইত, তাতে কোনও সন্দেহ নাই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ অল্পদিনেই শেষ হইয়া যাওয়ায় সকল দলের জাতীয় স্তরে সেটা দানা বাঁধতে পারে নাই। ৭০ সালের নির্বাচনের সময়ে যে নেতার বা পার্টির যে মতই থাকুক না কেন, ২৫শে মার্চের পরবর্তী নৃশংসতার পরে নিশ্চয়ই সে মত বলিয়াছিল। প্রমাণ, নির্বাচনের আগে পর্যন্তও যে-সব বড় বড় নেতা বরাবর আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করিয়াছেন, এবং যাঁদের অনেকেই দালালি আইনে আটক হইয়াছেন, তাঁদের বেশীর ভাগেরই পুত্র-নাতিসহ পরিবারের লোকেরা মুক্তি যোদ্ধাদের সহযোগিতা করিয়াছেন। মত ও মনের এই পরিবর্তন সর্বাত্মক ও সর্বজনীন হয় কালক্রমে। রাষ্ট্র নায়কের উচিৎ বিরোধীদেরে সে সময় দেওয়া।
১০ই জানুয়ারির বক্তৃতার জের টানিয়া শেখ মুজিব যদি বলিতেন : স্বাধীনতার আগে আপনাদের যাঁর যে মতই থাকুক না কেন, আজ স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার কাজে সবাই আমাকে সহায়তা করুন। এ স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব গোটা দেশবাসীর। কারণ এ স্বাধীনতা তাদের সকলের, তবে আমার জ্ঞান ও বিশ্বাস, সকল দলের নেতারা শেখ মুজিবের পিছনে আসিয়া দাঁড়াইতেন।
তা না করিয়া যে পদক্ষেপ নেওয়া হইল, তার ফল হইল বিরূপ। ১০ই জানুয়ারি যেখানে শেখ মুজিবের বিরোধী একজনও ছিলেন না, কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে চল্লিশ হাজার লোক তাঁর বিরোধী হইলেন। কয়েক মাস পরে চল্লিশ হাজার বাড়িয়া চল্লিশ লাখ হইল। তাঁদের বিরোধিতা সক্রিয় না হইলেও ক্রিয়াশীল হইল। নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থায় ফাটল ধরিল। আনাস্থা হইতে সন্দেহ, সন্দেহ হইতে অবিশ্বাস, অবিশ্বাস হইতে শত্রুতা পয়দা হইল। পল্লী গ্রামের স্বাভাবিক সামাজিক নেতৃত্ব যে আলেম সমাজ ও মাতর শ্রেণী, তাঁদের প্রভাব তছনছ হইয়া গেল। ছাত্র-তরুণদের উপর শিক্ষক-অধ্যাপকদের আধিপত্যের অবসান ঘটিল। সে সামগ্রিক সন্দেহ, দলাদলি ও অবিশ্বাসের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রত্যর্পণ ব্যাহত হইল। দেশের আইন শৃংখলার প্রতি কারো শ্রদ্ধা থাকিল না। স্বভাব-দুস্কৃতিকারীরা এর সুযোগ গ্রহণ করিল। সে সার্বজনীন অশান্তি ও বিশৃংখলা পুলিশ বাহিনীর আওতার বাহিরে চলিয়া গেল।
তারপর প্রায় দুই বছর পরে যখন সরকার তথাকথিত দালালদেরে ক্ষমা করিলেন, তখন সে ক্ষমায় মহত্ত্ব ত থাকিলই না, দুই বছরের তিক্ততায় তা রাষ্ট্রের কোনও কল্যাণেই লাগিল না। চাকা আর উল্টা দিকে ঘুরিল না।
এই একই প্রসেসে সরকারী চাকুরি আইন প্রশাসন-যন্ত্রের মেরুদন্ড ভাংগিয়া দিয়াছে। আজো তা আর জোড়া লাগে নাই। সকল রাষ্ট্র বিজ্ঞানীর মত হিসাবে গণতান্ত্রিক দুনিয়ার সর্বত্র এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য বলিয়া গৃহীত ইয়াছে যে প্রশাসনিক নির্বাহীদের চাকরির উপর নির্বাচিত নির্বাহীদের প্রভাব যত কম হইবে, রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য ততই মংগল। চাকুরির নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা না থাকিলে রাষ্ট্রের সমূহ ক্ষতি হয়। এক দিকে প্রশাসনিক নির্বাহীরা সততার সংগে নিজেদের কর্তব্য পালন করিতে পারে না। অপর দিকে দেশের প্রতিভাশালী উচ্চশিক্ষিত তরুণরা সরকারী চাকুরি গ্রহণে অনুৎসাহী হইয়া পড়েন। বহু কালের অভিজ্ঞতার ফলে তাই প্রশাসনিক নির্বাহী নিয়োগের কাজটা নিরপেক্ষ অরাজনৈতিক চাকুরি কমিশনের উপর দেওয়া হইয়াছে। প্রমোশন-ডিসমিযাল ও উন্নতি-অবনতির জন্যও তেমনি কড়া নিয়ম কানুনের একটা ঐতিহ্য গড়িয়া ভোলা হইয়াছে। পক্ষান্তরে যে দেশের যেখানেই এর ব্যতিক্রম হইয়াছে, সেখানেই দুর্নীতি প্রবেশ করিয়াছে। প্রশাসনিক কাঠামোতে ঘুণে ধরিয়াছে। রাষ্ট্রের ঘোরতর অকল্যাণ হইয়াছে।
