স্বাধীনতার দিন দশেক পরে সরকার ঢাকায় আসিয়া কোনও কাজ শুরু করিবার আগেই পনর দিনের মধ্যে শেখ মুজিব ঢাকায় আসেন বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসাবেই। এই সময়েই বাংলাদেশ সরকারের শাসনতান্ত্রিক চরিত্র নির্ধারণের সুযোগ আসে। শেখ মুজিব কালবিলম্ব না করিয়া দিন-পাঁচেকে মধ্যেই ১৪ই জানুয়ারী তারিখে নিজে প্রেসিডেন্ট পদ ত্যাগ করিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে আইনমাফিক প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করেন। গোটা দেশবাসী আনন্দে উল্লসিত হয়। পার্লামেন্টারি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যও, উভয় পদাধিকারীর ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও যোগ্যতার বিচারেও নয়া রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য দুই ব্যক্তির চেয়ে যোগ্যতর পদাধিকারী কল্পনা করা যাইত না। শেখ মুজিবের অভিপ্রায় অনুসারেই এটা ঘটিয়াছে, জনগণের মধ্যেও সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। আওয়ামী লীগ বরাবর পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সমর্থক, তার ছয় দফা মেনিফেস্টো অনুসারে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার গঠন করিতে শেখ মুজিব বাধ্য ছিলেন, এ সব যুক্তি দিয়া শেখ মুজিবের ঐ পদক্ষেপকে ছোট করার উপায় ছিল না। কারণ শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে একদল তরুণের মধ্যে এই অভিমত খুবই সোঙ্গার হইয়া উঠিয়াছিল যে, বাংলাদেশের এই সরকার বিপ্লবী সরকার। পাকিস্তানী আমলের নির্বাচনও সে নির্বাচনের মেনিফেস্টো বর্তমান সরকারের জন্য প্রাসংগিকও নয়, বাধ্যকরও নয়। এ ধরনের কথা যাঁরা বলিতেছিলেন তাঁরা অধিকাংশই তথাকথিত বামপন্থী। ৭০ সালের নির্বাচনে তাঁরা একটি আসনও দখল করিতে না পারায় একরূপ নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা-সংগ্রামে তাঁদের যথেষ্ট অবদান ছিল। মুক্তি বাহিনীতে তাঁদের জোর ছিল। কাজেই তাঁদের মনে আশা হইয়াছিল, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে যে নতুন সরকার গঠিত হইবে, তাতে অংশ পাইবার অধিকারও তাঁদের আছে। পাকিস্তানী আমলের নির্বাচনের অধ্যায়টা আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস হইতে মুছিয়া ফেলিতে পারিলেই এটা সম্ভব। এতে এক ঢিলে দুই পাখী মারা হইয়া যাইবে। এক, বামপন্থীরা সরকারের অংশীদার হইতে পারিবেন। দুই, পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সম্ভাবনারও অবসান হইবে। একমাত্র বিপ্লবী সরকারের স্লোগানের মাধ্যমেই এটা সম্ভব ছিল। কিন্তু যতই বিপ্লবী সরকার বলা হোক শেখ মুজিবের নেতৃত্ব ছাড়া কোন সরকার পরিচালনই সম্ভব ছিল না। কাজেই ঐ ‘বিপ্লবী’দের দাবি ছিল, শেখ মুজিবকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়া একটি বিপ্লবী সরকার গঠিত হউক।
সর্বময় ক্ষমতার লোভে অনেক রাজনৈতিক নেতারই মাথা ঠিক থাকে না। শেখ মুজিব যদি পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ট্রেনিং প্রাপ্ত নেতা না হইতেন, তিনি যদি পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে অগাধ বিশ্বাসী না হইতেন, তবে ঐ বিপ্লবীদের লোভনীয় প্রস্তাবের ফাঁদে পা দিতেন। কিন্তু শেখ মুজিব সে ফাঁদে পা দিলেন না। অথরিটারিয়ানিয়মের ক্ষমতা-লোভের সামনেও তিনি মাথা ঠিক রাখিলেন। বরঞ্চ সাবধান হইলেন। অতি ক্ষিপ্রতার সাথে তিনি বিচারপতি আবু সাঈদের মত একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজ্ঞ ও পন্ডিত ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট করিয়া নিজে প্রধান মন্ত্রিত্বে নামিয়া আসিয়া সহকর্মী বিপ্লবীদেরে, দেশবাসীকে এবং বিশ্ববাসীকে জানাইয়া দিলেন, তিনি বাংলাদেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রই প্রতিষ্ঠা করিতে চান, আর কোনও গণতন্ত্র নয়। আর নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরেও তিনি সত্যি-সত্যি সরেন পার্লামেন্ট রূপেই স্থাপিত করিতে চান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরে তা দেখাইবার জন্য সর্বাপেক্ষা অভিজ্ঞ শ্রদ্ধেয় ও আদর্শবাদী প্রবীণ নেতা শাহ আবদুল হামিদ সাহেবকে স্পিকার ও দীর্ঘদিনের সহকর্মী, নিষ্ঠাবান ও চরিত্রবান আওয়ামী লীগার মোহাম্মদ উল্লাকে ডিপুটি স্পিকার নিয়োগ করাইলেন। প্রতিভাবান উচ্চশিক্ষিত নির্বাচিত সহকর্মীদের লইয়া তিনি একটি মর্যাদাবান মন্ত্রিসভা গঠন করিলেন।
৪. চাঁদে কলংক
কিন্তু অকস্মাৎ ২৪ শে জানুয়ারি আমাদের রাজনৈতিক চাঁদে কলংক দেখা দিল। কলংক ত নয়, একেবারে রাহু। সে রাতে চাঁদ দ্বিখন্ডিত হইল। রাহু দুইটি। প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার নম্বর ৮ ও ৯ একটার নাম দালাল আইন। আরেকটার নাম সরকারী চাকুরি আইন। উভয়টাই সর্বগ্রাসী ও মারাত্মক। একটা গোটা জাতিকে, অপরটা গোটা প্রশাসনকে দ্বিখন্ডিত করিয়াছে। দুইটাই রাষ্ট্রের বিপুল ক্ষতি করিয়াছে। সে সবের প্রতিকার দুঃসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। অথচ এ দুইটা পদক্ষেপই ছিল সম্পূর্ণ অনাবশ্যক।
সব দমননীতি-মূলক আইনের মতই দালাল আইনের ফাঁক ছিল নির্বিচারে অপপ্রয়োগের। হইয়াও ছিল দেদার অপপ্রয়োগ। ফলে নির্যাতন চলিয়াছে বেএন্তেহা। যে আওয়ামী লীগ নীতিতঃই নিবর্তনমূলক আইনের বিরোধী, একজন লোককেও বিনা বিচারে একদিনও আটক না রাখিয়া দেশ শাসন যে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য, সেই আওয়ামী লীগেরই স্বাধীন আমলে অল্পদিনের মধ্যেই ত্রিশ-চল্লিশ হাজার নাগরিক গ্রেফতার হইয়াছেন এবং বিনা বিচারের প্রায় দুই বছর কাল আটক আছেন। বেশী না হইলেও প্রায় সমসংখ্যক লোক বাড়ি-ঘর ছাড়িয়া ভিন্ন-ভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করিয়া বেড়াইতেছেন। গ্রেফতারিত ব্যক্তিরা যামিনাদি ব্যাপারে আদালত সুবিধা পাইতেছে না। অতি অল্পসংখ্যক লোক ছাড়া কারো বিরুদ্ধে চার্জশীট হইতেছে না। এমনকি, তদন্তও শেষ হয় নাই। এই সবই সর্বাত্মক দমন আইনের উলংগ রূপ ও চরম অপপ্রয়োগ।
