২. মুজিবের উপস্থিতির আশু কল
যা হোক, শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তনের ফল ফলিতে লাগিল। প্রায় পাঁচ লাখ লোকের বিশাল জনতা সুহরাওয়ার্দী ময়দানে নেতার মুখের কথা শুনিবার জন্য আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছিল। শেখ মুজিব এয়ারপোর্ট হইতে সোজা সুহরাওয়ার্দী ময়দানে গিয়া জনসভায় বক্তৃতা করেন। বরাবরের ওজস্বী বাগ্মী শেখ মুজিব। সে হিসাবে ঐদিনকার বক্তৃতা তেমন ভাল হয় নাই। সেকথা তিনি নিজেই বুঝিয়াছিলেন। কিন্তু সদ্য-স্বাধীনতাপ্রাপ্ত নতুন রাষ্ট্রের পথনির্দেশক হিসাবে শেখ মুজিবের সেদিনকার বক্তৃতা অতিশয় মূল্যবান ও ঐতিহাসিক ছিল। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে, তাঁর স্থলবর্তী হইবার যোগ্য প্রবীণ নেতৃত্বের অবর্তমানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাৎপর্য আওয়ামী তরুণ নেতাদের কাছে সুস্পষ্ট ছিল না। ছয় দফা মেনিফেস্টোর ভিত্তিতে নির্বাচন বিজয়ী আওয়ামী নেতৃত্বের এই বিভ্রান্তিকর কারণ পরে যথাস্থানে আলোচনা করিব। এখানে শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে একটা বিভ্রান্তি সত্যই সৃষ্টি হইয়াছিল। সে বিভ্রান্তি পাকিস্তানের পরিণাম, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জাতীয় স্বকীয়তা, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি সকল ব্যাপারে পরিব্যাপ্ত ছিল। ফলে তাদের মধ্যে এমন ধারণাও সৃষ্টি ইয়াছিল যে, নিজেদের মুসলমান ও নিজেদের রাষ্ট্রকে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ বলিলে সাধারণভাবে হিন্দুরা বিশেষভাবে ভারত সরকার অসন্তুষ্ট হইবেন। এ ধারণা যে সত্য ছিল না, তা বুঝিতে যে রাজনৈতিক চেতনা ও অভিজ্ঞতা থাকা দরকার, তরুণ আওয়ামী নেতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেরই তা ছিল না। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জগজীবন রাম বাংলাদেশকে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়া যে সদিচ্ছা প্রণোদিত প্রশংসা করিয়াছিলেন, অতিউৎসাহী ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ একজন অফিসার সে প্রশংসা প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন এই হীনমন্যতা হইতেই। আমাদের রেডিও-টেলিভিশন হইতে কোরআন তেলাওয়াত আসোলামু আলায়কুম ও খোদা হাফেয বিতাড়িত হইয়াছিল এবং ও সবের স্থান দখল করিয়াছিল ‘সুপ্রভাত’ ‘শুভসন্ধা’ ও ‘শুভরাত্রি’ এই কারণেই। বাংলাদেশের জনসাধারণ আমাদের স্বাধীনতার এই রূপ দেখিয়া চমকিয়া উঠিয়াছিল এমন পরিবেশেই।
শেখ মুজিকে প্রত্যাবর্তন এক মুহূর্তে এই কুয়াশা দূর করিয়া দিয়াছিল। ১০ই জানুয়ারির ঐ একটি মাত্র বক্তৃতার তুফানে বাংলাদেশের আসমান হইতে ঐ বিভ্রান্তিকর কালমেঘ মিলাইয়া গিয়াছিল। শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং আম্রোজনীয় ঘোষণা করিয়াছিলেন : (১) আমি মুসলমান আমার বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র (২) আমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমি মিঃ ভূট্টার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু সে কৃতজ্ঞতার দরুন আমি দুই অঞ্চল মিলিয়া এক পাকিস্তান রাখিবার তার অনুরোধ রাখিতে পারিলাম না। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রই থাকিবে (৩) তাদের সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের জনগণের উপর যে অকথ্য যুলুম করিয়াছে, দুনিয়ার ইতিহাসে তার তুলনা নাই। তবু বাংগালী জাতি তাদের ক্ষমা করিয়া প্রমাণ করিবে, বাংগালী জাতি কত উদার। আমি মিঃ ভুট্টোর সাফল্য কামনা করি। তিনি আমাদের সাফল্য কামনা করুন। তাঁরা সুখে থাকুন, আমাদের সুখে থাকিতে দিন।
শেখ মুজিবের এই তিনটি ঘোষণাই জনগণের অন্তরের কথা ছিল। বিপুল হর্ষধ্বনি করিয়া সেই বিশাল জনতা শেখ মুজিবের উক্তি সমর্থন করিয়াছিল। উপ-নেতা ও কর্মচারীরা না জানিলেও নেতা জানিতেন ও জনগণ বুঝিতেন, বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র নয় বটে কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্র।
চিন্তার বিভ্রান্তি এইভাবে দূর হইবার অল্পদিনের মধ্যে কাজের বিভ্রান্তির অবসান করিলেন মুজিব নেতৃত্ব। রেডিও-টেলিভিশনে আবার কোরআন তেলাওয়াত, আস্সালামু আলায়কুম, খোদা হাফেয বহাল হইল। ধর্ম ও জীবন সম্পর্কে কোরআন-হাদিস-ভিত্তিক সাপ্তাহিক আলোচনা আবার শুরু হইল। সরকারী ফাংশনেও মিলাদ-মহফিল হইতে লাগিল। জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল।
শেখ মুজিবের দক্ষ সুনিপূণ ডিপ্লোমেটিক কৌশলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যেকার ভুল বুঝাবুঝির একটা মুনাসিব সুরাহা হইয়া গেল। এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন সমাপ্ত হইবার বহু আগেই দুই মাসের মধ্যে ১২ ই মার্চ তারিখে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের মাটি হইতে সরিয়া গেল। ভারত-বাংলাদেশ-মৈত্রীর বিরুদ্ধে প্রচারণার একটা আন্তর্জাতিক ফাঁড়া কাটিয়া গেল।
৩. পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা প্রবর্তন
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী ছিলেন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার এইভাবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ধারা মানিয়া চলাতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশ সরকারেরও প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার ক্যাবিনেট প্রথার না প্রেসিডেন্ট শিয়াল প্রথার সরকার ছিলেন, তা বুঝিবার উপায়ও ছিল না; দরকারও ছিল না। সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকিলেই তা যেমন ক্যাবিনেট সরকার হয় নাঃ আবার প্রেসিডেন্ট কোনও সরকারী আদেশ-নির্দেশ দিলেই তা প্রেসিডেশিয়াল হইয়া যায় না।বিশেষতঃ যুদ্ধ চলাকালে, যখন পার্লামেন্টে বসিবার সুযোগ-সুবিধা নাই, তখন সরকারের সাংবিধানিক চরিত্র লইয়া চিন্তা করিবার দরকার বা সুযোগ ছিল না।
