ওঁদের কথা আমার পসন্দ ইয়াছিল। তাই তাঁদের রিপোর্টে আমি বিশ্বাসও করিয়াছিলাম। তাঁরা এটাও বলিয়াছিলেন যে পলিটিক্যাল মোটিভেশন হিসাবে ‘মুজিববাদ’ কথাটারও জন্ম হইয়াছিল ওখান হইতেই।
মুজিব বাহিনীতে ত বটেই সাধারণ কমিশনড র্যাংকে রিক্রুটমেন্টের বেলাতেও ছাত্রলীগারদেরেই প্রাধান্য দেওয়া হইত। রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের উপর এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া ছিল। উল্লেখিত তরুণ বন্ধুরা অতিশয় সংকোচের সাথে আমাকে এ সংবাদটাও দেন যে এই কারণে আমার ছোট ছেলে মহফু আনাম (তিতু)র কমিশন পাওয়ায় অসুবিধা হইতেছে। মহফুয আনাম ছিল ছাত্র ইউনিয়নের লোক। সে ছাত্রলীগের ছিল না। এটা গোপন করার উপায় ছিল না। কারণ ছাত্র-সমাজে সে ছিল মশহুর। সে নিখিল পাকিস্তান ইউনির্ভাসিটি ডিবেটে পরপর তিন বছর চ্যাম্পিয়নরূপে ছিল সুপরিচিত। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি হিসাবে ছিল দাগী ইউনিয়নিস্ট। এই কারণেই সে শক্তিশালী বাধার সম্মুখীন হইতেছে।
বন্ধুদের কাছে খবরটা পাইয়া দুঃখিত হওয়ার বদলে খুশীই হইয়ামি। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উভয় কারণেই। এখানেই আগেকার কথা একটু প্রাসংগিক হইয়া পড়ে।
মহফুজ আনাম সম্পর্কে মাতাপিতার স্বাভাবিক দুর্বলতা ছাড়াও আমাদের একটা অভিজ্ঞতাভিত্তিক ধারণা ছিল, সে একেবারেই কোমলপ্রাণ দার্শনিক। বাড়িতে সে গরু-ছাগল ও দূত্রের কথা, একটা মুর্গি যবেহও সহ্য করিতে পারিত না। চাকর-বাকর, কুলি-রিকশাওয়ালাকেও ‘আপনি’ বলিত। একবার এক ছোকরা তার হাতঘড়ি চুরি করে। তাকে হাতে-নাতে ধরিয়া ফেলিয়া তার কঠোরতম ভাষায় তাকে বলিয়াছিল : ‘আপনি আমার ঘড়ি চুরি করিলেন কেন?’
এমন সদাশিব যখন মুক্তিফৌজে যোগ দিবার সংকল্পের কথা আমাদের জনাইল, তখন তার মা একমাত্র এই শর্তে রাযী হইলেনঃ ‘তুমি অন্ত্রের যুদ্ধে যাইবা না। শুধু লেখায় ও বক্তৃতায় প্রচার করিবা।‘ আমিও তাঁর সমর্থন করিলাম। আমাদের শর্তে রাজী হইয়া সে ভারতে চলিয়া গেল। আমার অনুরোধে নূরুর রহমান সাহেব মুক্তিবাহিনীর কর্তৃপক্ষের কাছে এ মর্মে একটি পত্রও পাঠাইলেন।
যথাসমন্ত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হইতে মহফুষ আনামের ইংরেজী বক্তৃতা শুনিলাম। আমরা নিশ্চিত হইলাম। প্রথম প্রথম সে ছদ্মনামে বক্তৃতা করিত। কিন্তু আমরা তার গলা চিনিতাম। তারপর প্রায় মাস খানেক কলিকাতা, মাদ্রাজ, বেই, দিল্পি, আলীগড়, এলাহাবাদ ইত্যাদি ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের যুক্তি-যুক্ততা ও ন্যায়-নৈতিকতার উপর বক্তৃতা করিয়া খুব নাম করে। বিভিন্ন রাজ্যের সংবাদ পত্রে তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা হয়। তার কিছু-কিছু আমাদের হাতে ও আসে।
এই অবস্থায় পুরুষ নিশ্চিন্ততার মধ্যে যখন আমরা খবর পাইলাম যে তিতু কমিশন পাইবার চেষ্টা করিতেছে, তখন নিশ্চয়ই ভাবনায় পড়িলাম। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে সে বাধা পাইতেছে শুনিয়া খুশী হইলাম। পরে অবশ্য তিতু কমিশন পাইয়াছিল। কিন্তু এর কোনও কথাই আমার স্ত্রীকে জানাইলাম না। আমার খুশী হওয়ার ব্যক্তিগত কারণ ছিল এটা। কিন্তু বিজয়ী সশস্ত্র বাহিনীর হাতে গণতন্ত্র বিপন্ন না হয়, সে বিষয়ে ভারত সরকার ছিদ্রহীন সাবধানতা অবলম্বন করিতেছে, আমার আদর্শগত আনন্দের কারণও এটাই।
এই অভিজ্ঞতার দরুনই আমি দেশে-বিদেশে ভারতীয় মতলব সম্বন্ধে বিরুদ্ধ প্রচারের দ্বারা প্রভাবিত হই নাই। তবু সত্য কথা এই যে শেখমুজিবের অবর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী নেতৃবৃন্দ যে মেরুদন্ডহীনতার ও অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়াছিলেন, তারই কুফলে ভারত বাংলাদেশ-মৈত্রীর গাথুনিতে ফাটল ধারাইবার মত কিছু শিকড়ের বীজ ছাড়াইয়া পড়িয়াছিল। এর কুফলের হাত হইতে ভারত বাংলাদেশ মৈত্রীকে বাঁচাইবার জন্য পরবর্তীকালে শেখ মুজিবের অনেক চেষ্টা চরিত্র করিতে হইয়াছে।
৩২.০৭ নৌকার হাইলে মুজিব
নৌকার হাইলে মুজিব
উপাধ্যায় সাত
১. শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তন
আমাদের স্বাধীনতা হাসিলের ঠিক পঁচিশ দিন পরে আমাদের নেতা শেখ মুজিব ১০ই জানুয়ারি দেশে ফিরেন। বিপুল জনতা তাঁকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা দেয়। গোটা দেশ আনন্দ-উল্লাসে ফাটিয়া পড়ে।
যদিও বিগত এক সপ্তাহ ধরিয়াই আমরা শেখ মুজিবের মুক্তির খবর শুনিবার আশায় প্রবল আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছিলাম,কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মুক্তির খবরটা। একেবারে দুশ্চিন্তামুক্ত ছিল না। মুজিবের মুক্তির খবরটা কতকটা রহস্যাবৃত হইয়া উঠিল। আমরা খবর পাইলাম, প্রত্যাশিত মুক্তি-দিবসের আগের দিন ভারত সরকার মুজিবকে আনিবার জন্য রেডক্রসের একটি বিমান তাড়া করিয়া পিভি এয়ারপোর্টে হাযির রাখিয়াছেন। অথচ শেখ মুজিব ৮ই জানুয়ারি সে বিমানে না চড়িয়া পি, আই, এ.-এর একটি বিশেষ বিমানে চড়িয়া নিরুদ্দেশ হইয়াছেন। তিনি কোথায় গিয়াছেন কেউ জানেন না। রেডিও পাকিস্তানের খবরানুসারে প্রেসিডেন্ট ভুট্টোও মুজিবের গন্তব্যস্থান সম্বন্ধে কিছু বলেন নাই। তিনি নিজে এয়ারপোর্টে উপস্থিত থাকিয়া পি, আই. এ. বিমানে মুজিবকে তুলিয়া দিয়াছেন। অথচ শেখ মুজিবকে কোথায় নেওয়া হইতেছে, তা তিনি বলেন নাই। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি রসিকতা করিয়া বলিয়াছেন : পিঞ্জরার পাখী উড়িয়া গিয়াছে। সাংবাদিকদের পীড়াপীড়িতে অবশেষে মিঃ ভূট্টো বলিলেন : শেখ মুজিবের অনুরোধেই তাঁর গন্তব্যস্থান গোপন রাখা হইতেছে। গন্তব্যস্থানে পৌঁছিয়া তিনি নিজেই সে কথা বলিবেন। মিঃ ভুট্টোর এ ঘোষণায় ঢাকায় আমরা কোনও তসল্লি পাইলাম না। ভুট্টোর বিরুদ্ধে আমাদের আক্রোশ তখনও একেবারে তাজা। আমাদের দুঃখ-দুর্দশার জন্য ইয়াহিয়ার চেয়ে ভুট্টোর অপরাধ এক রত্তি কম নয়, এ কথা আমরা তখনও ভুলি নাই। অতএব সেই ভুট্টো আমাদের নেতার জীবন লইয়া আবার কোন খেলা শুরু করিয়াছেন, তা ভাবিয়া আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হইলাম। মাত্র এক রাত্রি আমাদের দুশ্চিন্তায় কাটিল। ৯ই জানুয়ারি আমরা বিভিন্ন রেডিও মারফত জানিলাম শেখ মুজিব পি. আই. এ. বিমানে চড়িয়া লন্ডনে পৌঁছিয়াছেন। এ সংবাদে আমরা মুজিবের মুক্তি ও নিরাপত্তা সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হইলাম বটে, কিন্তু আরেকটা চিন্তা আমাদেরে ভাবনায় ফেলিল। ভারতের ভাড়া-কা রেডক্রস বিমানে না চড়িয়া এবং সোজা ঢাকায় না আসিয়া পি, আই. এ. বিমানে চড়িয়া লন্ডন গেলেন কেন? ভারতের সংগে মন-কষাকষি ও ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এটা মিঃ ভুট্টোর একটা চাল বলিয়া আমাদের সন্দেহ হইল। শেষ পর্যন্ত আমাদের সে সন্দেহও দূর হইল। শেখ মুজিব বৃটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের বিমানে চড়িয়া দিল্লি হইয়া ১০ই জানুয়ারি ঢাকা পৌঁছিলেন। দিল্লিতে ভারত সরকার তাঁর বিপুল অভ্যর্থনার আয়োজন করেন। আমাদের আশংকা তখনকার মত দূর হয়। পরে জালিয়াছিলাম, আমাদের আশংকা নিতান্ত ভিত্তিহীন ছিল না। এ ধরনের কিছুটা চেষ্টা হইয়াছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের, বিশেষতঃ তৎকালীন রাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আবদুস সামাদ আযাদের চেষ্টায় সবই ভালয়-ভালয় সমাধা হইয়া যায়।
