এ সব খবরই মুজিব নগরী বাংলাদেশের সরকারের কানে যাইতেছিল। মুজিবের আশু মুক্তির আশা করা, সুতরাং তাঁদের পক্ষে অবাস্তব আশা ছিল না। স্বাধীনতা লাভের আনন্দের দিনে একাএকা দেশে ফিরার থনে নেতাকে সাথে লইয়া ফিরার আশায় দু’চার দিন দেরি করা নিশ্চয়ই দোষের নয়।
এবার প্রথম কারণটার আলোচনা করা যাউক। এ কারণ ঢাকায় প্রবাসী সরকারের নিরাপত্তা-বোধের অনিশ্চয়তা। একটা অঘোষিত স্বাধীনতার সংগ্রাম যখন ইচ্ছায় অনিচ্ছায় সশস্ত্র সংগ্রামে পরিণত হয়, এবং নেতাদের অনুপস্থিতিতে যখন সে সংগ্রাম জন-যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়, তখন সংগ্রামের নেতৃত্বের অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা করা খুব সহজ নয়। স্বাধীনতা-সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী হইলে সে নেতৃত্ব সংগ্রাম চলিত থাকা অবস্থায় দানা বাঁধে এবং সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করিয়া স্থির বিন্দুতে অবস্থান করে। আলজিরিয়া ও ভিয়েতনামে এটা ঘটিয়াছিল কালক্রমে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এটা ঘটিতে পারে নাই। প্রথমতঃ নেতা শত্রুর হাতে বন্দী থাকায় এবং দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে পূর্ব-সংগঠিত ঐক্য না থাকায় প্রাথমিক অস্পষ্টতা কাটিতে সময় লাগিতেছিল। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক কারণে ভারতের বিপুল শক্তিশালী দেশরক্ষা বাহিনী আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সাহায্য করায় কল্পনাতীত দ্রুততার সংগে আমাদের স্বাধীনতা হাসিল হইয়া যায়। এ অবস্থায় ভারতীয় বাহিনীকে বাদ দিলে তৎকালে রাষ্ট্রক্ষমতা যাদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তাঁরা ছিলেন বেংগল রেজিমেন্টের নেতৃত্বে পূর্ব-পাকিস্তানের ই. পি. আর.ও পুলিশ বাহিনী। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের ঐতিহ্য পাক-বাহিনীর ও পাক ব্যুরোক্র্যাসির মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরিয়া গড়িয়া উঠিয়াছিল। এ সব কথা মুক্তি-সংগ্রামের রাজনৈতিক নেতাদের ভূলিয়া যাওয়ার কথা নয়। ভারতীয় নেতারা এ বিষয়ে আরও বেশী সচেতন ছিলেন।
৫. মুজিব বাহিনী
কথাটা যখন উঠিলই, তখন কিছুকাল আগের কথাটাও বলিয়া রাখা ভাল। বাংলাদেশ সরকারের দেশে ফিরার বিলম্ব উপলক্ষ করিয়া যখন বিদেশে এবং জাতিসংঘ সার্কেলে নানা কুকথা উঠিতেছিল এবং সে সব কথা ভিত্তি করিয়া ঢাকা নগরীতে সন্দেহ-অবিশ্বাস দানা বাঁধিতেছিল, তখনও আমি সে সব সন্দেহে অবিশ্বাসে বিচলিত হই নাই। ভারত সরকারের সদিচ্ছায় তখনও আমার আস্থা অটল ছিল। তার ভিত্তি ছিল আমার একটা পূর্ব অভিজ্ঞতা। মাত্র ছয় মাস আগে এক ব্যাপারে আমি নিজেই ভারত সরকারের মতলব সম্পর্কে সন্দিহান হইয়া পড়িয়াছিলাম। অল্প দিন পরেই আমার সে সন্দেহ দূর হইয়াছিল। আমি উপলব্ধি করিয়াছিলাম, যে কাজটাকে আমাদের অনিষ্টকর ভাবিয়াছিলাম, সেটা ছিল আসলে আমাদের হিতকর। ব্যাপারটা এই জুলাই-আগস্টের দিকে আকাশবাণীর কলিকাতা কেন্দ্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হইতে পর পর কয়েকটা সংবাদে আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হইলাম। সংবাদ কয়টি ছিল এইরূপঃ মুক্তিফৌজের বদলে মুক্তিবাহিনী করা হইয়াছে। কয়েকদিন পরে শুনলাম, আলাদা করিয়া মুজিব-বাহিনী গঠন করা হইয়াছে। এ সব পদক্ষেপকে আমি অশুভ ইংগিত মনে করিলাম। ধরিয়া নিলাম, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভক্তি ও দলাদলি সৃষ্টি করা হইতেছে। যদি ভারত সরকারের উদ্যোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হইয়া থাকে, তবে নিশ্চয়ই তাঁদের মতলব ভাল হইতে পারে না।
মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে আমার সাথে দেখা করিতেন। প্রথম দিকে আমি তাঁদেরে সন্দেহ করিতাম। বন্ধুবর নূরুর রহমানের মধ্যস্ততায় আমার সন্দেহ দূর হয়। তখন তাঁদের সাথে আলাপ করিতাম। সশস্ত্র সংগ্রাম বা গেরিলা যুদ্ধের আমি কিছুই জানিতাম না। কাজেই আমাদের আলোচনা মোটামুটি থিওরিটিক্যাল ও প্রপাগান্ডা বিষয়-বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিত।
এঁদেরই দুই-একজনের সংগে মুজিব-বাহিনী গঠনের কথাটা পাড়িলাম। তাঁদের
• মধ্যে একজন নিজেই মুজিব-বাহিনীর পোক বলিয়া দাবি করায় আমার আলোচনার সুবিধা হইল। তাঁদের রিক্রুটমেন্ট, ট্রেনিং, অধ্যয়ন ইত্যাদি খুঁটিনাটি বিষয় তিনি আমাকে জানাইলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই অপর যে একজন তাঁর বর্ণনা সমর্থন করিলেন তিনি ছিলেন একজন এম, এস, সি, এবং এক কলেজের লেকচারার। উভয়ের কথায় মিল হওয়ায় আমি নিঃসন্দেহ হইলাম। তাঁদের কথা হইতে আমি এই বুঝিলাম যে, নির্বাচিত প্রতিনিধি আওয়ামী লীগের মাধ্যমে পার্লামেন্টারি পদ্ধতি বাঁচাইয়া রাখিবার মহৎ উদ্দেশ্যেই ভারতীয় নেতৃত্ব মুজিব-বাহিনী গঠন করার প্রয়োজন বোধ করিয়াছিলেন। সশস্ত্র সংগ্রামে দেশের স্বাধীনতা আসিলে দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা সশস্ত্র বাহিনীর হাতে যাইতে বাধ্য, ভারতীয় নেতারা তা বুঝিতেন। সশস্ত্র লড়াই করিয়া এত-এত প্রাণ বিসর্জন দিয়া স্বাধীনতা লাভের পর রাষ্ট্রক্ষমতা আর্মড-চেয়ার’ পলিটিশিয়ানদের হাতে তুলিয়া দিবেন, পাকিস্তানী আইউবী ঐতিহ্যবাহী বেংগল রেজিমেন্ট বাহিনীর কাছে এমন আশা করা একরূপ দুরাশা। তার উপর আট-দশ হাজার ট্রেনিংপ্রাপ্ত সৈন্যের সংগে আরও আশি-নব্বই হাজার মুক্তি ফৌজ যোগ দিয়াছেন। এদের অধিকাংশই ছাত্র। ছাত্রদের মেজরিটি আবার ছাত্র ইউনিয়নের লোক। ছাত্রলীগাররা সেখানে মাইনরিটি। রাজনীতিতে শুধু ছাত্রলীগাররাই আওয়ামী লীগের সমর্থক। ছাত্র ইউনিয়নীরা প্রায় সবাই ন্যাপ। ন্যাপ মানেই কমিউনিস্ট। কারণ কমিউনিস্ট পার্টি আমাদের দেশে বরাবর নিষিদ্ধ ছিল। ছাত্র ইউনিয়নীদের বিপুল মেজরিটি বিপ্লবে বিশ্বাস করেন। পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রকে তারা বুর্জোয়া গণ বলেন। কাজেই এই বামপন্থী ছাত্রদের দ্বারা-গঠিত মুক্তিবাহিনী স্বাধীনতা লাভের পর সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতা দখলই সমর্থন করিবেনা আওয়ামী লীগকে করিবেন না। এটা ভারতীয় নেতৃত্বের বাঞ্ছনীয় হইতে পারে না। গোটা পাকিস্তানে সামরিক শাসন পাক-ভারত শান্তি ও মৈত্রীর পক্ষে প্রতিবন্ধকতা করিয়াছে। স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন কায়েম হউক, এ সম্ভাবনাকে ঠেকাইয়া রাখা ভারত সরকার নিজেদের কর্তব্য বিবেচনা করিয়া ঠিক কাজই করিয়াছেন। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগ সেকিউলার গণন্ত্রী দল, এ বিশ্বাস কংগ্রেস নেতৃত্বের বরাবরই ছিল। তাই স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ মুজিব-নেতৃত্বের আওয়ামী লীগের দ্বারা পরিচালিত হউক, এটাই ছিল ভারতীয় নেতৃত্বের কাম্য। তাই তাঁরা সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষিতে সাবধানতা হিসাবেই রাজনৈতিক মতাদর্শে অনুপ্রাণিত ডেমোক্র্যাটিক পলিটিক্স ওরিয়েন্টেড মুজিব বাহিনী গঠন করিয়াছিলেন এবং স্বভাবে তাঁদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করিয়াছিলেন।
