৩. অহেতুক ভুল বুঝাবুঝি
এই সব কারণে বাংলাদেশের জনগণের মনে ভারত সরকারের অভিপ্রায় সম্বন্ধে সন্দেহ সৃষ্টি হইতে লাগিল। এই ধরনের সন্দেহ সৃষ্টির সুযোগ দিলেন বাংলাদেশ সরকার ও নেতৃবৃন্দ নিজেরাই। স্বাধীনতা লাভের পরেও দশ-দশটা দিন তাঁরা ভারতে অবস্থান করিলেন। পাকিস্তান ও তার বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের জন্য এটা ছিল মস্তবড় সুযোগ ও অকাট্য প্রমাণ। তাঁরা বলিতে লাগিলেন : ভারত যে পূর্ব-পাকিস্তান দখল করিয়াছে, তা এবার প্রমাণিত হইয়া গেল। নইলে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় যান না কেন? আসলে ভারত সরকারই যাইতে দিতেছেন না।
এ সব সন্দেহ ও অভিযোগ খন্ডনের কোনও প্রমাণ আমার হাতে নাই। পাকিস্তানী-বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংগে-সংগেই যে কতিপয় উল্লেখযোগ্য নেতা ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করিয়া আমাদের সাথে দেখা করিয়াছিলেন, তাঁরা মন্ত্রী-স্তরের লোক ছিলেন না। তবু তাঁরা সবই প্রভাবশালী নেতা। খবরাখবরও তাঁরা রাখিতেন বলিয়াই আমার বিশ্বাস। তাঁদের সহিত বিস্তারিত খুটিনাটি আলোচনা করিয়া আমার এই ধারণা হইয়া ছিল যে, ভারত সরকারের ইচ্ছায় নয়, বাংলাদেশ সরকারের নিজেদের ইচ্ছামতই তাঁদের ঢাকায় আসায় বিলম্ব ঘটিতেছে।
বাংলাদেশ সরকারের এমন ইচ্ছাটাও আমার বিবেচনায় অহেতুক বা অযৌক্তিক ছিল না। সহজ কথায়, এ বিলম্বের সংগত কারণ ছিল। ঘটনার দুই বছর পরে এখন অবশ্য তৎকালীন মন্ত্রীরা বা তাঁদের সহকর্মীরা এ ব্যাপারে প্রকৃত ব্যাপার নাও প্রকাশ করিতে পারেন। কথাটা যুক্তি সংগত বা উচিৎ বিবেচিত নাও হইতে পারে। আবার বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন উক্তিও করিতে পারেন। এক রকমের কথা বলার একমাত্র উপায় এ বিষয়ে সরকারী বিবরণ দেওয়া; সে কাজটা আজও হয় নাই। হইবে কি না, হইলে কবে হইবে; তারও কোন নিশ্চয়তা নাই। শোনা যায়, সরকারের প্রচার দফতর হইতে স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস রচনার চিন্তা ভাবনা হইতেছে। তাতে অবশ্যই বেশ সময় লাগিবে। কয়েক বছর লাগিয়া যাইতে পারে। ততদিনে অবস্থার পরিবর্তনও হইতে পারে। সে পরিবর্তিত পরিবেশে আমাদের সরকারের মনোভাবেরও পরিবর্তন হওয়াটা বিচিত্র নয়। তা ছাড়া, অনেকদিন পরে ভারতের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা-বোধটাও কিছুটা পুরাতন হইয়া যাইবে। তেমন অবস্থায় আমাদের সরকারের ঢাকা ফিরার বিলটার কারণ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই রকমে বলা হইতে পারে। ভারতের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব বর্তমানের মত গাঢ় থাকিলে এক ধরনের কৈফিয়ত দেওয়া হইবে। আর সে বন্ধুত্বে কিছুটা ফাটল ধরিলে অন্যরূপ কৈফিয়ত দেওয়া হইবে। ধরুন, বন্ধুত্বটা ঘাঢ় থাকিবে। সে অবস্থায় সরকারী বিবরণে বলা হইতে পারে : ভারত সরকারের মেহমানদারির পীড়াপীড়িতেই আমাদের বাড়ি ফিরিতে দেরি হইয়াছে। এটা বিশ্বাসযোগ্য কথাও। হিন্দু ও মুসলমান আমরা উভয় সম্প্রদায়ই অতিশয় অতিথিপরায়ণ। গিরস্থরা মেহমানকে সহজে ছাড়িতে চান না। আমাদের উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই বাপ-দাদার আমল হইতে প্রবাদ বাক্য চালু আছে : গিরস্থরা মেহমানদের বলিয়া থাকেন : আসিয়াছেন আপনার ইচ্ছায়, যাইবেন আমার ইচ্ছায়। এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী ভারতের হিন্দু গৃহস্বামী যদি বাংলাদেশের মুসলমান মেহমানদেরে বলিয়া থাকেন : আসিয়াছেন আপনাদের ইচ্ছায়, যাইবেন আমাদের ইচ্ছায়, তবে ঐ একই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী মুসলমান মেহমানরা স্বভাবতঃই তা মানিয়া চলিতে বাধ্য ছিলেন।
আর যদি কোনও কারণে বর্তমানের বন্ধুত্বের চির ধরে, তবে সে চিরের কারণে অথবা সেই বিদ্যাসাগরী ‘উপকারীর মাথায় লাঠির’ সনাতন নীতি অনুসারে আমাদের সরকার বলিতে পারেন : ‘ভারত সরকার আমাদের পায়ে বেড়ি দিয়া আটকাইয়া রাখিয়া ছিলেন।‘ উদ্দেশ্য? আমাদের সম্পদ বিশেষতঃ পাক-বাহিনীর পরিত্যক্ত যুদ্ধ-সরঞ্জাম নিজেরা একা কুক্ষিগত করিবার লোভে।
স্পষ্টতঃই এ দুইটার একটাও নির্ভেজাল সত্য হইবে না। ঘটনা পুরান হইবার আগেই তা লিপিবদ্ধ করাই সত্য রক্ষার একমাত্র উপায়। নিরপেক্ষ দর্শক হিসাবে এটা করা আমার উচিৎও। আমার পক্ষে সম্ভবও। কিন্তু অসুবিধা এই যে, আমার কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নাই। যা কিছু সবই শোনা কথা। আর সে সব শোনা কথার উপর নির্ভরশীল অনুমান। অগত্যা তাই লিখিতেছি।
৪. বিলম্বের হেতু
সদ্য-প্রত্যাগত বন্ধু-বান্ধবের সাথে আলোচনা করিয়া যা বুঝিয়াছিলাম, তাতে আমার এই বিশ্বাস জন্মিয়াছিল যে, পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের সাথে সাথে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার প্রধানতঃ দুইটি কারণে ঢাকা ফিরাটা বিলম্বিত করিতে চাহিতেছিলেন। একতখনও তাঁরা ঢাকায় আসা নিরাপদ মনে করিতেছিলেন না। দুই, কিছুদিন দেরি করিলে শেখ মুজিবকে নিয়াই তাঁরা ঢাকায় ফিরিতে পারিবেন। প্রথম। কারণটি বর্ণনায় কিছু বেশী কথা বলিতে হইবে। তাই সেটা পরে বলিতেছি। দ্বিতীয় কারণটিই আগে আলোচনাকরিতেছি।
মুজিবের নিরাপত্তা, তাঁর মুক্তির আশা ও সম্ভাবনার কথা যুদ্ধ চলিতে থাকা অবস্থাতেও দেশ-বিদেশের বেতারে ও খবরের কাগজে এবং শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘেও উঠিতেছিল। বাংলাদেশে পাকিস্তান-বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরদিনই পশ্চিম সীমান্তে ভারত একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করায় এবং পাকিস্তান সরকার খপ্ করিয়া তা গ্রহণ করায় মুজিবের মুক্তির সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হইয়াছিল। তারপর ১৯শে ডিসেম্বর ইয়াহিয়ার বদলে ভুট্টোর প্রেসিডেন্ট হওয়ার খবরটা অন্যান্য দেশসহ ভারতেও ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। এটাকে অনেকে মুজিবের মুক্তির পূর্ব লক্ষণ বলিয়া মনে করিলেন। কারণ ভুট্টো প্রেসিডেন্ট হইয়াই শেখ মুজিবকে জেলখানা হইতে প্রেসিডেন্ট হাউসের নিকটবর্তী এক বাড়িতে গৃহবন্দী রূপে আনাইয়াছেন, এমন খবরও বিভিন্ন বেতারে প্রচারিত হইয়াছিল। পরদিন হইতেই ভুট্টো বলিতে শুরু করিলেন, যদি দেশবাসী চায়, তবে তিনি শেখ মুজিবকে মুক্তি দিবেন। সংগে সংগে তিনি জনমত যাচাইয়ের জন্য জনসভায় ভোট নিতে লাগিলেন। প্রত্যেক সভায় বিপুল জনতা রায় দিলঃ শেখ মুজিবের মুক্তি চাই। এর সাথে যোগ হইল লাহোর করাচি ইসলামাবাদ ও পেশোয়ারের সমস্ত দৈনিক পত্রে মুজিবের মুক্তির দাবিতে সম্পাদকীয় লেখা হইতে লাগিল।
