ঢাকায় তখন আরও সপ্তাহখানেক কোনও সক্রিয় সরকার বা তাঁদের শান্তি-রক্ষক বা আইন-কানুন প্রয়োগকারী শাখা-প্রশাখা ছিল না। মনে হয়, তার দরকারও ছিল না। জনতা ও নাগরিকদের সবাই যেন ঐ কয় দিনের জন্য ফেরেশতা হইয়া গিয়াছিল। চোর-ডাকাত, পকেটমার-দাংগাকারীরা সবাই যেন নিজেদের উপর চুয়াল্লিশ ধারা জারি করিয়াছিল।
ক্ষণিকের জন্য মনে হইল কার্ল মার্কস এ অবস্থাকেই বোধ হয় স্টেটলেস সোসাইটি বলিয়াছেন।
হঠাৎ মনে পড়িল : ওভার অল কমান্ডে ত ভারতীয় বাহিনী আছে।
৩২.০৬ মুজিবহীন বাংলাদেশ
মুজিবহীন বাংলাদেশ
উপাধ্যায় ছয়
১. অতিদ্রুত স্বাধীনতা
এটা স্বীকার করিতেই হইবে, ভারতের সহায়তায় আমরা বড় তাড়াতাড়ি স্বাধীনতা পাইয়া ফেলিয়াছিলাম। বস্তুতঃ নয় মাস সংগ্রামে স্বাধীনতা আর কোনও জাতি পায় নাই। ভারত সক্রিয় সহায়তা না করিলে আমরাও পাইতাম না পাকিস্তান সরকার ভুল করিলে ভারত সরকার তেমন সাহায্য করিবেনই, এটাও একরূপ জানা কথাই ছিল। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা এবারই প্রথম এমন ভুল করিয়াছিলেন। ফলে আমাদের স্বাধীনতা যে কল্পনাতীত অল্প সময়ে আসিতেছে, এটা ৩রা ডিসেম্বর তারিখে আমার মত অ-বুদ্ধি লোকের কাছেও স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল।
স্বাধীনতার পদধ্বনিতে লোকের আনন্দিত হইবার কথা। কিন্তু আমি উল্টা ঘাবড়াইতে ছিলাম। মুজিব-বিহীন আওয়ামী নেতৃত্ব কি ভাবে দেশ চালাইবেন, তা আমি ভাবিয়া পাইতাম না। তাই স্বাধীনতা যতই আগাইয়া আসিতেছিল, আমার ভাবনা ততই বাড়িতেছিল। মুজিবের মুক্তি ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য আমি ততই সর্বান্তঃকরণে প্রার্থনা করিতেছিলাম। ততদিনে ইয়াহিয়া ঘোষণা করিয়াছেন যে মুজিব বাঁচিয়া আছেন ও ভাল আছেন।
কিন্তু আমার মোনাজাত কবুল হইল না। যদিও আমার মোনাজাত ছিল স্বাধীনতা ও মুজিব একসংগে আসুক, কিন্তু মুজিবকে পিছে ফেলিয়া স্বাধীনতা আগেই আসিয়া পড়িল। মুজিবের অনুপস্থিতিতে যে সব অশুভ ঘটনা ঘটিতে পারে বলিয়া আমার আন্দাষ ছিল, আসলে তার চেয়ে অনেক বেশী অশুভ ঘটনা ঘটিতে লাগিল। এ সব ঘটিতে লাগিল চিন্তায় ও কাজে উভয়তঃই। এটা শুরু হইল প্রবাসী সরকার দেশে ফিরিবার আগেহইতেই।
প্রথম ঘটনাটা ঘটিল স্বাধীনতার প্রায় শুরুতেই-১৮ই ডিসেম্বরে। ঐ দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা উদযাপনের জন্য দিল্লির রামলীলা ময়দানে এক বিরাট জন সভা হইল। সে সভায় ভারতের দেশরক্ষা মন্ত্রী শ্রী জগজীবনরাম বক্তৃতায় বলিলেন : এতদিন পাকিস্তানের গর্বের বিষয় ছিল, সে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। গত পরশু হইতে সে গৌরব বর্তাইয়াছে বাংলাদেশের উপর। বাংলাদেশই এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। আকাশবাণীর খবর অনুসারে মিঃ রামের এই উক্তি সেই বিরাট জনসভায় বিপুলভাবে অভিনন্দিত হইয়াছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সদ্য-দীক্ষিত একজন অফিসার মিঃ রামের ঐ উক্তির তীব্র প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন : মিঃ রামের স্মরণ রাখা উচিৎ ছিল বাংলাদেশ একটি সেকিউলার রাষ্ট্র, মুসলিম রাষ্ট্র নয়। আমি বুঝিলাম এটা যদি বাংলাদেশ সরকারের সরকারী অভিমত হয়, তবে বিপদের কথা। বাংলাদেশের পরিচালন-ভার এমন সব ‘অতি-প্রগতিবাদী’ লোকের হাতে পড়িতেছে যাঁরা ইসলামী রাষ্ট্র ও মুসলিম রাষ্ট্রের পার্থক্য বুঝে না বা বুঝিতে চাহেন না।
২. অতি প্রগতিবাদী নেতৃত্ব
প্রবাসী সরকার ঢাকায় ফিরার সংগে সংগে প্রমাণিত হইল যে এটা সরকারী অভিমত। দেশে ফিরিয়াই তাঁরা যা দেখাইলেন, তাতে রেডিও-টেলিভিশনে কোরান তেলাওয়াত, খোদা হাফেয, সালামালেকুম বন্ধ হইয়া গেল। তার বদলে ‘সুপ্রভাত, ‘শুভ সন্ধ্যা’, ‘শুভরাত্রি’ ইত্যাদি সমোধন প্রথা চালু হইল।
মুসলমানদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হইল। গুজব রটিতে লাগিল, আযান নিষিদ্ধ হইয়া যাইবে। কেউ বলিলেন : অমুক জায়গায় জনসভায় বক্তৃতা চলিবার সময় নিকটস্থ মসজিদ হইতে আযান দিতে গিয়া মুয়াযিন সাহেব বাধাপ্রাপ্ত হইয়াছেন। যথাসম্ভব নেতৃস্থানীয় লোকজনকে ব্যাপারটা জানাইলাম। তাঁরা আযানের ব্যাপারটা ভিত্তিহীন জানাইলেন। কিন্তু রেডিও টেলিভিশনের ব্যাপারটায় তর্ক জুড়িলেন। আমাদের আশংকা দৃঢ় হইল। দুশ্চিন্তা বাড়িল।
এই সংগে যোগ দিল পাকিস্তান ও চীনের উদ্যোগে উথাপিত জাতিসংঘে বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর অবস্থান সম্বন্ধে প্রতিবাদ ও তদুত্তরে ভারত সরকারের তরফের উক্তিসমূহের বিভ্রান্তিকর পরিণাম। ভারত সরকারের প্রতিনিধি জাতিসংঘে বলিলেন : প্রয়োজনের এক দিন বেশীও ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে থাকবে না। এই প্রয়োজনের মেয়াদটার আভাস পাওয়া গেল দিল্লি হইতে ভারত সরকারের মুখপাত্রের কথায়। তাঁরা বলিলেন : শরণার্থীদের নিজ নিজ বাড়ি-ঘরে পুনর্বাসন করিতে যেটুকু সময় লাগিবে, ততদিনই ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর বাংলাদেশে মোতায়েন থাকা দরকার হইবে।
এই সময়ে ভারতের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মানিকশাহবাংলাদেশে আসিলেন। তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নয়রুল ইসলামের মেহমান হইলেন। দুইজন একত্রে টেলিভিশন ক্যামেরাও ও সংবাদপত্র রিপোর্টারদের সামনে দাঁড়াইলেন। আমাদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করিলেনঃ ‘ভারতীয় সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের মাটিতে আছে আমার অনুরোধে, আমাদের সহায়তার জন্য। জাতিসংঘে ভারতীয় প্রতিনিধি আমাদের রাষ্ট্রপতির ঘোষণার পুনরুক্তি করিলেন।
